দেশের জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রতিষ্ঠার মাত্র ২০ বছরে নানাবিধ গবেষণা করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল সার্ক আবহাওয়া গবেষণা কেন্দ্র (এসএমআরসি)। ১৯৯৫ সালের ২ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ৬১টি বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন ও ৭৬টি আন্তর্জাতিক মানের প্রবন্ধ প্রকাশ করে, যা সে সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। গবেষণায় বিশেষ অবদানের জন্য ‘দ্য সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ সম্মানেও ভূষিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, শিলাবৃষ্টি, বজ্রবৃষ্টি, এভিয়েশন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, কৃষি, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখেন এর বিজ্ঞানীরা। যদিও এক দশক আগে হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যায় গুরুত্বপূর্ণ এ গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক বছরে সার্ক ক্রমেই গুরুত্ব হারিয়েছে। এর পরিবর্তে বিমসটেকের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে ভারত ও বাংলাদেশের। এরই ধারাবাহিকতায় এক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিবেচনায়ও এসএমআরসি চালু রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি।
ওয়ার্ল্ড ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের একটি বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের এমন ঝুঁকিতে থাকার পরও গুটিয়ে নেয়া হয় দক্ষিণ এশিয়ার আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষণায় গঠিত এসএমআরসি। ব্যয় নির্বাহ করতে না পারা এবং বিমসটেকে আবহাওয়ার গবেষণার যুক্তি দিয়ে ভারত, বাংলাদেশ, ভুটান ও মালদ্বীপের চারটি কেন্দ্রকে একীভূত করে ভারতের নয়াদিল্লিতে একক একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়। পরে যার বিরূপ প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষণায়। জলবায়ু গবেষণার আর কোনো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান দেশে না থাকায় অনেকটা বন্ধ হয়ে আছে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণা। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষক ব্যক্তিগতভাবে গবেষণা করলেও তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেন না।
এক দশক আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া এসএমআরসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সার্কের অর্থায়নে কার্যক্রম পরিচালনা করত। তবে এটির তদারকির দায়িত্ব ছিল আবহাওয়া অধিদপ্তর তথা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের হাতে। ২০১৫ সালে সার্ক থেকে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধের ঘোষণা দিলে তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব বরাবর চিঠি দেন তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী হাবিবুল আউয়াল। চিঠিতে সার্ক আবহাওয়া গবেষণা কেন্দ্রটি ভারতে একীভূত না করে জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশে রাখার বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। তবে তৎকালীন সরকার সেভাবে তৎপরতা না দেখানোয় সে বছরের ৩১ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকার হয়ে পড়েন এর দেশী-বিদেশী ১৪ বিজ্ঞানীসহ ২৬ কর্মকর্তা-কর্মচারী। সে সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বরাবর আবেদন করেও ফল মেলেনি। উল্টো বছরে মাত্র দুই মাসের বেতনের হিসাব ধরে সর্বোচ্চ ৩৬ মাসের ক্ষতিপূরণ দিয়ে তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়। এতে সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা পান শীর্ষ কর্মকর্তারা। কর্মচারীরা নামমাত্র ক্ষতিপূরণ নিয়ে এসএমআরসি ছাড়েন।
পরে চাকরি হারানো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘উদ্বৃত্ত সরকারি কর্মচারী আত্তীকরণ আইন ২০১৬’ অনুসারে বিলুপ্ত এসএমআরসির চাকরি থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আত্তীকরণের বিষয়ে ২০১৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আবেদনপত্রটি পুনরায় পাঠানো হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। এছাড়া আইনের ৫(১) অনুসারে একজন উদ্বৃত্ত সরকারি কর্মচারীকে যত দ্রুত সম্ভব সমস্কেলভুক্ত পদে আত্তীকরণের কথা বলা হয়েছে। এ নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ২০টির অধিক চিঠি দিয়েও কোনো উত্তর পায়নি তারা।
এ বিষয়ে এসএমআরসির সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শুরু থেকে প্রতিষ্ঠানটি রক্ষায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে আমরা চিঠি দিই। পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগেও চিঠি দেয়া হয়। কিন্তু আইনে উদ্বৃত্ত সরকারি কর্মচারীদের আত্তীকরণের বিষয়টি লিখিত আকারে থাকলেও তা গুরুত্ব পায়নি। আমরা যারা বিজ্ঞানী ছিলাম, তারা কোনো না কোনো প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হতে পেরেছি। কিন্তু কর্মচারীরা এখনো মানবেতর জীবনযাপন করছে।’
২০১৫ সালে বন্ধ হওয়ার সময় মোট ১৪ জন বিজ্ঞানী কর্মরত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছয়জন বিদেশী বিজ্ঞানী নিজ দেশে ফেরে যান। দেশী আটজন বিজ্ঞানী দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হন। আর কর্মচারীরা এখন গ্রামে কৃষিকাজ করে, ভ্যানগাড়ি চালিয়ে, চায়ের বা মুদি দোকান দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাদের একজন কুমিল্লার কামাল হোসেন ভূঁইয়া। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চাকরি যাওয়ার পরে আমি গ্রামে ফিরে আসি। এখন কৃষিকাজ করি। চাকরি যাওয়ার পরে সংসার, বউ-বাচ্চা নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি। ২০১৫ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আমাদের আত্তীকরণের বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিবকে মৌখিক নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু লিখিত কোনো নির্দেশনা না দেয়ায় সচিবও সেটাকে আর গুরুত্ব দিয়ে দেখেননি। এরপরে একাধিকবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোনো না কোনো অজুহাতে আমাদের সঙ্গে আর দেখা করেননি তিনি। আমরা মামলা করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের ভাতিজা পরিচয়দাতা এক আইনজীবী আমাদের থেকে টাকা খেয়ে আর তা করতে দেননি। এসএমআরসির প্রতি শেখ হাসিনার গুরুত্ব না দেয়ার আরেকটা কারণ হচ্ছে সার্কের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের নাম জড়িত। তাছাড়া এসএমআরসি উদ্বোধন করেন খালেদা জিয়া। ড. ইউনূস দায়িত্ব নেয়ার পর সার্ককে কার্যকর করার কথা বলেছেন। সেজন্য আমরা আবার আশায় ছিলাম। তার সঙ্গে দেখা করার জন্য যোগাযোগ করেছি। কিন্তু তিনি সময় দিতে পারছেন না।’
ন্যাশনাল ওশানোগ্রাফিক অ্যান্ড মেরিটাইম ইনস্টিটিউটের (নোয়ামি) নির্বাহী পরিচালক ও এসএমআরসির সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহন কুমার দাশ বলেন, ‘ড. ইউনূস আসার পর ভেবেছিলাম সার্কের বিষয়ে উদ্যোগ নেবেন। কিন্তু কিছু তো দেখছি না।’
এসএমআরসি বন্ধ হওয়ার পর কয়েক বছর পরিত্যক্ত ভবন হিসেবে থাকলেও ২০২১ সালে এর দায়িত্ব নেয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। সেখানে সংস্কার করে নতুন করে ভবনটি সম্প্রসারণ করে তারা। এসএমআরসি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উন্নত মানের গাণিতিক মডেলে থ্রিডি-ভার্চুয়াল তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে রাডার, স্যাটেলাইট, জিটিএস, এডব্লিউএস, উন্নত মানের কম্পিউটার, গাড়ি, বই, প্রকাশনাসহ প্রায় ১০ কোটি টাকার সম্পদ অকেজো হয়ে পড়েছে।
গতকাল প্রতিষ্ঠানটিতে গিয়ে দেখা যায়, এসএমআরসি কার্যালয় দেখভালে করছেন কয়েকজন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য। পরিত্যক্ত ভবন হওয়ায় ভেতরে প্রবেশের অনুমতি নেই। ভবনটির সামনে পড়ে আছে পুরনো চেয়ার, টেবিলসহ পুরনো সরঞ্জাম। প্রতিষ্ঠানটির সামনের দোকানিরা বলেন, ‘এখানে কেউ সেভাবে আসে না। আগে মাঝেমধ্যে সচিবরা এলেও এখন কেউ আসে না।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব (ডি-৪ শাখা) লুবনা শারমীন বলেন, ‘এ ধরনের প্রতিষ্ঠান তো অবশ্যই দরকার। আবহাওয়া অধিদপ্তর আমাদের মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত। তবে এটির বিষয়ে আমি এখনই বলতে পারছি না।’
এসএমআরসির সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহন কুমার দাশ বলেন, ‘দেশের অন্যতম এ গবেষণা প্রতিষ্ঠান বন্ধের পেছনে ভৌগোলিক রাজনীতি, কূটনৈতিক ইস্যু ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের দুর্বল অবস্থা দায়ী। এ প্রতিষ্ঠান থেকে আমরা যে গবেষণা প্রবন্ধ করেছি সেটা অনেকে পারেনি। বিদেশে অনেক গবেষক এখানে কাজ করেছেন। আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষণায় দেশে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ক্ষেত্র নেই। সেখানে আমরা কম লোকবল নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের কিছু আর্টিকেল প্রকাশ করতে পেরেছিলাম। তখন ভারত বিমসটেকে মনোযোগ দেয়ার দোহাই দিয়ে এটি বন্ধ করে দিয়েছিল। সে সময় যদি সরকার শক্ত ভূমিকা রাখতে পারত তাহলে প্রতিষ্ঠানটি টিকে থাকত।’
এ বিষয়ে এসএমআরসির তৎকালীন পরিচালক মো. শাহ আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সার্ক ব্যয় বহন করতে পারছে না বলে সে সময় প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দিয়েছিল। ভারত বলেছিল বিমসটেক যেহেতু আবহাওয়া নিয়ে কাজ করে, তাই এটির দরকার নেই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছিলেন সার্কের সিদ্ধান্ত বাতিল করে প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখতে। কিন্তু সার্ক কর্তৃপক্ষ সেটা মানেনি। বাংলাদেশ ছাড়াও অন্য দুটি দেশের অফিসও গুটিয়ে নেয়া হয় তখন। তবে আমি বলব এ ধরনের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের জন্য খুবই প্রয়োজন।’
এসএমআরসির মতো আবহাওয়া গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনে প্রতিরোধের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ুর ঝুঁকিতে থাকা একটি দেশের শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান না থাকায় ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা কঠিন বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। বিশ্বব্যাংকের কনসালট্যান্ট ড. মিজানুর রহমান ও এসএমআরসির সাবেক বিজ্ঞানী মাজাজুল আলম সরকার বলেন, ‘বাংলাদেশের আবহাওয়াবিষয়ক ৯৫ শতাংশ কাজ করত এসএমআরসি। অথচ ২০১৫ সালের পর থেকে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো গবেষণা হয়নি। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গবেষণা হচ্ছে। আবহাওয়া নিয়ে গবেষণা না থাকার প্রভাব কিন্তু দেশের জলবায়ুতে পড়ছে। অসময়ে তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। এ বছর কুমিল্লা অঞ্চলে বন্যা হলো, ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে এসব প্রতিরোধে গবেষণা লাগবে। জনস্বাস্থ্যের ওপর কিন্তু এর প্রভাব পড়ে। এটি দেশের জন্য দীর্ঘ সময়ের একটি ক্ষতি। এ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চেয়ে দেশের বড় ক্ষতি হয়েছে।’
ড. মোহন কুমার দাশ বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের জন্য পাঁচ-সাতটা আবহাওয়া গবেষণা কেন্দ্র দরকার। সেখানে একটি ছিল। তাও বন্ধ হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জলবায়ু কোন অবস্থায় পৌঁছবে সেটি সময় বলে দেবে। কিন্তু এসএমআরসির মতো একটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া দেশের জন্য খুব ক্ষতিকর, যার নেতিবাচক প্রভাব কয়েক বছরের মধ্যে দেখতে পাবে দেশ।’