টেকনাফের ইউপি সদস্য নুরুল হুদার সাড়ে ৩ বছরের কারাদণ্ড, ৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা জরিমানা

নুরুল হুদা ২৮টি মামলার আসামি। এর মধ্যে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ২ কোটি ৭১ লাখ ২৫ হাজার ৩৩৭ টাকার সম্পদ অর্জন ও ভোগদখল এবং সম্পদ বিবরণী দাখিল না করার মামলায় তাকে এ কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে

টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল হুদাকে সাড়ে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। একই সঙ্গে তাকে ৫ কোটি ৩৬ লাখ ৮২ হাজার ৫৩৭ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

নুরুল হুদা ২৮টি মামলার আসামি। এর মধ্যে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ২ কোটি ৭১ লাখ ২৫ হাজার ৩৩৭ টাকার সম্পদ অর্জন ও ভোগদখল এবং সম্পদ বিবরণী দাখিল না করার মামলায় তাকে এ কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

মামলাটিতে ১১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ মিজানুর রহমান গতকাল এ রায় দেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পিপি মোকাররম হোসাইন বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

নুরুল হুদা টেকনাফ উপজেলার দক্ষিণ হ্নীলার লেদা পশ্চিম পাড়ার বাসিন্দা। তিনি হ্নীলা ইউনিয়নের ইউপি সদস্য।

মামলার নথি অনুযায়ী, নুরুল হুদাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার মাধ্যমে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পেয়ে দুদক অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধানে তার নিজ নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ থাকার তথ্য পাওয়ার পর সম্পদ বিবরণী দাখিলের জন্য আদেশ দেয়া হয়।

দুদক ২০১৯ সালের ২৪ এপ্রিল নুরুল হুদার নামে সম্পদ বিবরণী দাখিলের আদেশ দেয়। পরে ৯ মে নিরপেক্ষ সাক্ষীদের উপস্থিতিতে তিনি সম্পদ বিবরণী ফরম গ্রহণ করেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পদ বিবরণী দাখিলের জন্য তিনি ১৬ মে সময় বাড়ানোর আবেদন করেন। পরে তাকে আরো সাত কার্যদিবস সময় দেয়া হয়। এর পরও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি সম্পদ বিবরণী দাখিল করেননি বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানে নুরুল হুদার নামে মোট ২ কোটি ৯০ লাখ ৩৫ হাজার ৩৩৭ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ২ কোটি ৬৬ লাখ ৪২ হাজার ৩৩৩ টাকা এবং অস্থাবর সম্পদ ২৩ লাখ ৯৩ হাজার ৪ টাকা। এসব সম্পদের বিপরীতে তার বৈধ বা জ্ঞাত আয়ের উৎস পাওয়া যায় ১৯ লাখ ১০ হাজার টাকা। ফলে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ কোটি ৭১ লাখ ২৫ হাজার ৩৩৭ টাকা।

অনুসন্ধান নথিতে বলা হয়, টেকনাফ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বিভিন্ন দলিলের মাধ্যমে ২০১১-১৮ সাল পর্যন্ত নুরুল হুদার নামে একাধিক স্থাবর সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া যায়। এসব সম্পদের মধ্যে বিভিন্ন জমি কেনার পাশাপাশি একটি দুইতলা বাড়ি নির্মাণে আনুমানিক ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্য রয়েছে। এসব সম্পদের মূল্যসহ স্থাবর সম্পদের মোট হিসাব ২ কোটি ৬৬ লাখ ৪২ হাজার ৩৩৩ টাকা নির্ধারণ করে দুদক।

দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, সম্পদ বিবরণী দাখিলের আদেশ গ্রহণের পরও নির্ধারিত সময়ে বিবরণী জমা না দেয়ায় দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ধারায় এবং জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ২ কোটি ৭১ লাখ ২৫ হাজার ৩৩৭ টাকার সম্পদ অর্জন ও ভোগদখলে রাখায় একই আইনের ২৭(১) ধারায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।

পরে দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে তার বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমোদন দেয়া হয়। মামলার বিচার শেষে ২০২৫ সালের ২২ জুন নুরুল হুদার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত। অভিযোগে বলা হয়, তিনি নির্ধারিত সময়ে সম্পদ বিবরণী দাখিল না করে এবং ২ কোটি ৭১ লাখ ২৫ হাজার ৩৩৭ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করে ভোগদখলে রেখে দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। অভিযোগ পড়ে শোনানোর পর নুরুল হুদা নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বিচার প্রার্থনা করেন।

জানা গেছে, নুরুল হুদার বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক ও অপহরণসহ ২৮টি মামলা রয়েছে। ২০২৫ সালের ১৪ নভেম্বর কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তিনি হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার ও একই ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও হ্নীলা ইউনিয়ন কমিটির অর্থ সম্পাদক ছিলেন বলেও জানা গেছে। এ ছাড়া তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মাদক পাচারকারী ছিলেন বলে জানা গেছে।

টেকনাফে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণকারী ১০২ জন মাদক পাচারকারীর মধ্যে নুরুল হুদাও ছিলেন। তার বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় ১৬টি মাদক, একটি অপহরণ, তিনটি অস্ত্র, একটি বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার চারটিসহ মোট ২৮টি মামলা রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন বলেও পুলিশ জানিয়েছে।

আরও