অবৈধ বসবাসে শীর্ষ দশে বাংলাদেশ

কানাডা থেকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় প্রায় ১ হাজার বাংলাদেশী

অবৈধভাবে বসবাস, বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জড়িত বিদেশী নাগরিকদের দেশে ফেরত পাঠাতে তৎপরতা জোরদার করেছে কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি (সিবিএসএ)।

সংস্থাটির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কানাডা থেকে অবিলম্বে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এমন নাগরিকদের তালিকায় শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম। দেশটি থেকে বর্তমানে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় রয়েছেন প্রায় এক হাজার বাংলাদেশী নাগরিক।

জানা যায়, কানাডা সরকার অভিবাসন নীতি বাস্তবায়নে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশটিতে আশ্রয়প্রার্থী বিদেশী নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর সংখ্যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। অন্যদিকে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী কানাডায় আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে বসবাসের চেষ্টা করছেন। শুধু কানাডা নয়, সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের অনেক দেশও বাংলাদেশী আশ্রয়প্রার্থীদের দেশে ফেরত পাঠাতে কঠোর হচ্ছে।

কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির (সিবিএসএ) ‘রিমুভালস ইন প্রোগ্রেস’ তালিকার তথ্য (৩০ জুন পর্যন্ত) অনুযায়ী, ৯৬৮ জন বাংলাদেশী নাগরিককে দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ফেরত পাঠানো নিশ্চিত হয়েছে এমন বিদেশী নাগরিকদের এ তালিকায় দশম স্থানে অবস্থান করছে বাংলাদেশ।

২০২০ সালে ৩০৮ জন বাংলাদেশীকে কানাডা থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল বলে জানিয়েছে সিবিএসএ। এরপরের কয়েক বছরে সে সংখ্যা কিছুটা কমে এলেও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ২২৭ জন বাংলাদেশী নাগরিককে কানাডা থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

ইমিগ্রেশন, রিফিউজিস অ্যান্ড সিটিজেনশিপ কানাডার (আইআরসিসি) তথ্য মতে, ফিফা বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে আসার পর কানাডায় আশ্রয় আবেদনকারীদের তালিকায় বাংলাদেশীরাও রয়েছেন। ভিজিটর ভিসায় কানাডায় আসা বিদেশীদের মধ্যে যে ১৭৫ জন পরে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন, তাদের মধ্যে ১০ জন বাংলাদেশী নাগরিক রয়েছেন।

কানাডা থেকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াধীন বাংলাদেশীসহ বিভিন্ন দেশের ৪০ হাজার ৮২৭ জনের মধ্যে ৩৬ হাজার ৬২২ জনই রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী।

কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণারত একজন বাংলাদেশী নাম প্রকাশ না করে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের পর কানাডায় বিচারাধীন বাংলাদেশী শরণার্থী আবেদনগুলোর ক্ষেত্রে দুই ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। যারা আগে আওয়ামী লীগ সরকারের হাতে নিপীড়নের আশঙ্কায় আশ্রয় চেয়েছিলেন, তাদের ঝুঁকি মূল্যায়ন নতুন প্রেক্ষাপটে পুনর্বিবেচনা; আবার যারা এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টতার কারণে বাংলাদেশে ফিরলে ঝুঁকিতে পড়তে পারেন, তাদের নতুন আবেদন প্রক্রিয়ার বিবেচনা এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এই দুই প্রেক্ষাপটকে অনেকেই স্থায়ীভাবে কানাডায় বসবাসের জন্য টুলস হিসেবে ব্যবহার করছেন। তবে দেশটি এখন অভিবাসন নীতির ক্ষেত্রে আগের ঢিলেঢালা অবস্থান থেকে সরে এসে এখন কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে।’

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশীদের অবস্থান ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশী আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য পরিস্থিতি আগের চেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে। ইউরোপের দেশগুলো এরই মধ্যে আশ্রয় দেয়া কমিয়ে দিয়েছে। সাগরপথে অবৈধভাবে ইউরোপ যাত্রা ও মানব পাচারের মতো ইস্যু বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশীদের ভিসা পাওয়া কঠিন করে তুলছে।

কানাডায় বেআইনিভাবে থাকা ব্যক্তিদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ভারত। ভারতের ৭ হাজার ৬৬৯ জন নাগরিককে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এ তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মেক্সিকো, দেশটির ৬ হাজার ৫৬১ জন নাগরিককে ফেরত পাঠানোর কাজ চলছে। অন্যান্য দেশের মধ্যে তালিকায় রয়েছে যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের ২ হাজার ১৭৯ জন, চীনের ১ হাজার ৮৯২ জন, নাইজেরিয়ার ১ হাজার ৬৪৭ জন, কলম্বিয়ার ১ হাজার ২৩৭ জন, পাকিস্তানের ১ হাজার ১৩৯ জন, ব্রাজিলের ১ হাজার ১১৮ জন এবং চিলির ১ হাজার ৩০ জন নাগরিক।

সিবিএসএর তথ্য মতে, চলতি বছর জুন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের ১০ হাজার ৬০৭ জনকে কানাডা থেকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

অন্যদিকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের (ইইউএএ) ‘লেটেস্ট অ্যাসাইলাম ট্রেন্ডস ২০২৫’ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ইইউতে আশ্রয় নেয়া আবেদনকারীদের মধ্যে বাংলাদেশ চতুর্থ বৃহত্তম উৎস দেশ।

এ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপের দেশগুলোয় ২০২৫ সালে বাংলাদেশী নাগরিকদের ৩৬ হাজার ৯০১টি আশ্রয় আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ৩৫ হাজার ২৪৫টি ছিল প্রথমবারের আবেদন। একই সময়ে বাংলাদেশীদের ৪৩ হাজার ৫২৩টি আবেদনের ওপর প্রথম ধাপের সিদ্ধান্ত দেয়া হয়। তবে বছরের শেষে ৪১ হাজার ৬৯২টি আবেদন বিভিন্ন সদস্যদেশে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল। একই বছরে ১ হাজার ১৭০টি আবেদন প্রত্যাহার করা হয়। বাংলাদেশীদের আশ্রয় আবেদনের প্রথম ধাপের স্বীকৃতির হার ছিল মাত্র ৩ শতাংশ।

ইইউএএর প্রতিবেদনে বাংলাদেশবিষয়ক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির বিষয় অনেক বাংলাদেশীর আশ্রয় আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে আশ্রয় আবেদন আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ কমলেও বাংলাদেশ এখনো ইইউতে আশ্রয়প্রার্থীদের অন্যতম বড় উৎস দেশ। ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় রুট দিয়ে অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশকারীদের মধ্যেও বাংলাদেশীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।

বিদেশে শরণার্থী হিসেবে আবেদন হার বৃদ্ধি বহির্বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করছে বলে মনে করেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শেখ হাসিনার সময় দেশে একটি স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ছিল। তখন রাজনৈতিক মামলা-হামলা কিংবা গুমের মতো ঘটনা ঘটত। তবে এখন বাংলাদেশে সেই পরিস্থিতি বা রাজনৈতিক অস্থিরতা নেই। তা সত্ত্বেও দেখা যায়, ইউরোপসহ উন্নত দেশগুলোতে অনেকে অবৈধভাবে প্রবেশ করেন কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন। অনেকেই মূলত স্থায়ীভাবে থাকার উদ্দেশ্যে এসব করে থাকেন। অ্যাসাইলামসংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশের সরাসরি কোনো ভূমিকা রাখা বা সুপারিশ করার সুযোগ নেই; পুরো প্রক্রিয়াটি সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার ও কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভর করে। তবে এ প্রক্রিয়ায় অ্যাসাইলাম আবেদনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য একটি নেতিবাচক বিষয়।’

আরও