নগরায়ণের প্রবল চাপে রাজধানী ঢাকার সীমানা প্রতিনিয়ত বিস্তৃত হচ্ছে। মোহাম্মদপুর এলাকার সীমানাও আর সেই পুরনো মানচিত্রে আটকে নেই। বুড়িগঙ্গার প্লাবনভূমি ছাড়িয়ে বিস্তৃত হয়েছে তুরাগ নদ পর্যন্ত। একসময় যেখানে নদী, খাল আর ধানখেত ছিল, এখন সেখানে সুউচ্চ ভবন আর হাউজিং প্রকল্পের ভিড়। নদী ও খালের অস্তিত্ব বিলীনে ভূমির চরিত্র বদলে গেছে। এ অবস্থায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ভাবছে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা এসব অবৈধ স্থাপনাকে নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় এনে আংশিক বৈধতা দেয়ার কথা। যদিও নদী, খাল ও সরকারি জমি দখলকারীদের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থানেই থাকবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর বসিলার উত্তরপাড়ার বাসিন্দা সত্তরোর্ধ্ব জেয়ারত আলী। বছর পাঁচেক আগেও নদীর ধার ঘেঁষা জমিতে ধান চাষের কাজ করেছিলেন। এখন সেখানে আবাসন প্রকল্পের ভবন। তিনি নিজেও পৈত্রিক ভিটা বিক্রি করে দিয়েছেন আবাসন কোম্পানির কাছে। এখন বসিলায় নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।
গতকাল দুপুরে বসিলা ঘাটে কথা হয় জেয়ারত আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ঘাটের এ জায়গা থেকে দুটো খাল ছিল। একটিকে বলতাম বান্দা খাল। অন্যটি ছিল মাছপুরা খাল। এ দুটো খাল দিয়েই নৌকাযোগে সাতমসজিদ ঘাটে গিয়ে নামতাম। গত ১০-১২ বছরে চোখের সামনে সবকিছু ভরাট হয়ে যায়। বড় বড় ভবন আর আবাসন কোম্পানি এসব ভরাট করেছে।’
তুরাগ নদের পাশঘেঁষে বসিলা ঘাট থেকে একটু সামনে গেলেই দেখা মেলে বান্দা খালের। এ খালই আরেকটু সামনে গিয়ে দুই ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। দুটি ধারাই বেশ পথ ঘুরে একসময় মিলেছিল সাতমসজিদে গিয়ে। বর্তমানে বেড়িবাঁধ পর্যন্ত এসে খালগুলোর অস্তিত্ব হারিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে দেখা যায়, ঢাকার চারশ বছরের ইতিহাসের সঙ্গেই জড়িত মোহাম্মদপুরের ইতিহাস। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির সাবেক সভাপতি ও নগর গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, আজকের মোহাম্মদপুরের শেষ সীমা ছিল সাতমসজিদ পর্যন্ত। এরপর পুরোটা ছিল নদী আর নদী। বিষয়টি ফুটে উঠেছে ব্রিটিশ ফটোগ্রাফার রজার গুইনের তোলা ছবিতেও। ষাটের দশকে তিনি মোহাম্মদপুরের একটি ছবি তুলেছিলেন। সেখানে দেখা যায়, মোগল আমলে নির্মিত সাত গম্বুজ মসজিদ বা সাতমসজিদের পরই শুরু হয়েছে বুড়িগঙ্গা নদী। আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টসের ফেলো (এআইএ) স্থপতি ল্যারি স্পেকের তোলা ছবিতে আশির দশকেও সাতমসজিদের পরে নদীর প্রমাণ পাওয়া যায়। ওই ছবিতেও দেখা যায় সাতমসজিদের পর পুরোটাই নদী।
অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘পাকিস্তান আমলেও সাতমসজিদের পরের জায়গায় ধান চাষ হয়েছে। আমরা ধানমন্ডি থেকে মোহাম্মদপুরে নদী দেখতে যেতাম। তখন মোহাম্মদপুর ছিল পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা। পাকিস্তান সরকারের পরিকল্পনায় মোহাম্মদপুরকে আবাসিক এলাকার পাশাপাশি বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবেও ডিজাইন করা হয়। এটা খুবই দারুণ ব্যাপার ছিল। মিরপুরকে তখন বলা হতো স্যাটেলাইট এলাকা। ধানমন্ডি থেকে অনেক দূরে থাকার কারণে এটা বলা হতো। ধানমন্ডি আর মিরপুরের মধ্যে ছিল মোহাম্মদপুর এলাকা।’
মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদের সামনে বড় বড় নৌকা ভিড়তে দেখেছেন নদী ও নগর গবেষক মোহাম্মদ এজাজ। বর্তমানে তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন। মোহাম্মদপুরের বিস্তৃতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শিয়া মসজিদ ও জাপান গার্ডেনের পরে যতটুকু আছে পুরোটাই নদী ছিল। বর্ষা মৌসুম শেষ হয়ে গেলে শুকনো জায়গায় ধান চাষ হতেও দেখেছি। এটা ’৯২-৯৩ সালের ঘটনা। তারপর যখন শহর রক্ষা বাঁধ হলো দ্রুত নদীর জায়গা দখল হতে থাকল। এখন যেসব হাউজিং আছে মোহাম্মদিয়া হাউজিং, চাঁন মিয়া হাউজিংসহ সবাই এগুলো দখল করা শুরু করল। এখন তো এখানে অনেক খাল ও নদীর অংশ দখল হয়ে নগর তৈরি হয়ে গেছে। এখানে রাজউক প্ল্যান না দিলেও বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগ দেয়া হয়েছে। ফলে রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই এখানে বসতি গড়ে ওঠে।’
অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে এসব এলাকায় নাগরিক সেবা দেয়া বেশ দুরূহ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অপরিকল্পিত ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নাগরিক সেবা দেয়া অনেক চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পার্ক ও মাঠ নিশ্চিত করা, জলাবদ্ধতা মোকাবেলা, ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি দিতে গিয়ে নগর কর্তৃপক্ষ অনেক অসুবিধার মধ্যে পড়ে। মোহাম্মদপুরে অনেক খালই ভরাট হয়ে বিলীন হয়ে গিয়েছে। বিদ্যমান খালগুলোর সঙ্গে নদীর সংযোগ নেই বললেই চলে। তার পরও আমরা গিয়ে খাল পরিষ্কার করে এসেছি। কিন্তু স্থানীয়রা সে খাল অল্প কদিনের মধ্যেই আবার নোংরা করে ফেলে। এসবই আসলে অতিরিক্ত মানুষের চাপের ফসল।’
২০১০ সালের ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) মোহাম্মদপুরের বসিলা অংশটুকু প্লাবনভূমি হিসেবে দেখানো হয়েছিল। রাজধানীকে জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা করতে এবং কৃষি সুরক্ষা বিবেচনায় পুরো বসিলা এলাকায় কোনো ধরনের স্থাপনার অনুমোদন না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় রাজউক। তবে ২০২২ সালের ড্যাপে প্লাবনভূমি পরিবর্তনকে নন-কনফার্মিটি এবং বাঁধের ভেতরে ও বাইরে উঁচু ভিটাকে ওভার-লে হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে শর্ত থাকে যে এখানের কোনো উন্নয়ন কার্যক্রমের কারণে খালের চরিত্র বিঘ্নিত বা পরিবেশ ধ্বংস করা যাবে না।
২০১০ ও ২০২২ সালের ড্যাপ রিভিউ কমিটির সদস্য ছিলেন স্থপতি ইকবাল হাবিব। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সিএস ম্যাপে সাতমসজিদের পরে পুরোটাই প্লাবনভূমি হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্লাবনভূমি কিন্তু নদীরই অংশ। ’৮৮ সালের বন্যার পর এরশাদ সরকার ঢাকা রক্ষা বাঁধের উদ্যোগ নেয়। এটা বাস্তবায়ন হয় ’৯৭-৯৮ সালে। তখন আমরা এর প্রতিবাদ করে বলেছিলাম এভাবে নদীর গতিপথ বদলে যাবে। বাস্তবেও তাই হয়েছে। বুড়িগঙ্গা নদী আরো পশ্চিমে সরে গেছে। এখন সেখানে টিকে আছে তুরাগ নদ।’
মোহাম্মদপুর এলাকার বিস্তৃতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘৮৮ সালের বেড়িবাঁধ ছিল ভুল পদক্ষেপ। বেড়িবাঁধ দেয়া হয়েছে সরলরেখার মতো। কিন্তু নদী তো সরল না। নদীর চরিত্রই হলো এঁকেবেঁকে চলে। ঢাকা উদ্যান, চাঁদ উদ্যান, নূর হাসপাতাল, শিকদার হাসপাতালসহ যত আবাসিক এলাকা আছে—সেখানে বৈধ ও অবৈধ সব ধরনের বসতিই আছে। এটা হয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ব্যর্থতায়। রাজউক যদি বলত বেড়িবাঁধের বাইরে আর কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না, তাহলে কিন্তু অবস্থা এমন হতো না। রাজউক চুপ করেছিল। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। কিন্তু এভাবে একটা নগরী চলতে পারে না। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি একটা নীতিমালার মাধ্যমে অবৈধ ভবন মালিকদের বৈধতায় নিয়ে আসার ব্যাপারে। বিষয়টি প্রায় চূড়ান্তের কাছাকাছি রয়েছে।’
রাজউক সূত্রে জানা গিয়েছে, মোহাম্মদপুর এলাকার অবৈধ ভবন ও ভূমি মালিকদের নিয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। নীতিমালাটি রাজউক থেকে মন্ত্রণালয় গিয়েছে। খসড়ায় কোন প্রক্রিয়ায় বৈধতা দেয়া হবে তার বিস্তারিত বলা হয়েছে। তবে যারা নদী, খাল, পুকুর ও সরকারি জমি দখল করেছে তাদের ভবন ভাঙতেই হবে। এতে কোনো ছাড় দেয়া হবে না।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ড্যাপে বসিলার বড় অংশকে প্লাবনভূমি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সরকারি উদ্যোগে সেখানে বিদ্যুৎ, গ্যাস, সড়ক সব ব্যবস্থা দেয়ার কারণে রাজউক কোনো অনুমোদন না দিলেও সেখানে আবাসন গড়ে ওঠে। এখন আমরা একটা নীতিমালা চূড়ান্ত করেছি যে কীভাবে এদের বৈধতা দেয়া যায়? সবাই তো একই ক্যাটাগরিতে অবৈধ হয়নি? যার যতটুকু ব্যত্যয় হয়েছে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে তারপর তাকে বৈধতা দেয়া হবে। জরিমানা আদায় করার সুযোগ থাকলে জরিমানা করা হবে। অথবা ভাঙার প্রয়োজন হলে ভাঙা হবে।’