বিপুল জনবল, উৎপাদনে নেই ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র

ঋণের দায় ও বোঝা টানছে বিপিডিবি

ঘোড়াশালসহ বিপিডিবির বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে না থাকা কিংবা বছরের বেশির ভাগ সময় বসে থাকায় সামগ্রিকভাবে সংস্থাটির বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সংস্থার নিজস্ব কেন্দ্রের বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি উৎপাদন ব্যয় ছিল গড়ে ৮ টাকা ৪৭ পয়সা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ টাকা ২৬ পয়সায়।

নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় ২১০ একর জমির ওপর অবস্থিত ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। ১ হাজার ৩১৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার এ কেন্দ্রে ইউনিট আছে সাতটি। গ্যাস সংকট, ইউনিট সংস্কার এবং কার্যক্ষমতা বিবেচনায় ঘোড়াশাল কেন্দ্রের পুরোটাই মাসের পর মাস বসে থাকছে। পেট্রোবাংলার গতকালের গ্যাস সরবরাহ প্রতিবেদনেও কেন্দ্রটিতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কেন্দ্রভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে সঞ্চালন সংস্থা পাওয়ার গ্রিডের তথ্যেও দেখা যায় গত ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঘোড়াশালের কোনো ইউনিট উৎপাদনে ছিল না। এর পেছনে গ্যাস সংকটের বিষয়টি উল্লেখ করেছে পাওয়ার গ্রিড।

কেন্দ্রে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও সেটি পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি) বিপুলসংখ্যক জনবল টানতে হচ্ছে। বর্তমানে ঘোড়াশাল কেন্দ্রে বিপিডিবির জনবল ৭৫০ জন। এর বাইরে আউটসোর্সিং, বিভিন্ন ইউনিটের সাইটে কর্মরত লোকবল, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট ও আনুষঙ্গিক কাজে জড়িতদের যোগ করলে জনবল সব মিলিয়ে প্রায় আড়াই হাজার হয়। যাদের বেশির ভাগের ব্যয় বিপিডিবির আর্থিক খাত থেকে মেটাতে হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

দেশের বিদ্যুৎ খাতে বিপিডিবি লোকসানি প্রতিষ্ঠান। প্রতি বছর সরকারের কাছ থেকে বড় ভর্তুকি নিয়ে সংস্থাটি পরিচালিত হচ্ছে। বিপিডিবির প্রায় সাড়ে ছয় হাজার মেগাওয়াট নিজস্ব বিদ্যুৎ কেন্দ্র থাকলেও গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ১৩ শতাংশ। স্বল্প বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সংস্থার এত জনবল বসিয়ে রেখে বেতন-ভাতা দেয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনায় আর্থিকভাবে দুর্বল বিপিডিবিকে ব্যয় সাশ্রয়ী পথ বেছে নেয়া উচিত বলে মনে করেন জ্বালানি খাত বিশেষজ্ঞরা। সংস্থাটির কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে কীভাবে জনবল কমানো যায়, সেই উদ্যোগ নেয়ার কথা বলছেন তারা। ঘোড়াশালের মতো একটি বৃহৎ কেন্দ্রে, যেখানে কোনো উৎপাদন নেই, কেন এত জনবল বিপিডিবিকে টানতে হবে—এমন প্রশ্ন তাদের। বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বিপিডিবির আরো দক্ষ হওয়া দরকার।

বেসরকারি উদ্যোক্তা ও বৃহৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্র মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্যাসভিত্তিক ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালাতে প্রকৌশলী, ব্যবস্থাপক, তত্ত্বাবধায়ক, আবাসিক ও নিরাপত্তা কর্মী মিলিয়ে ৩০০ লোকবল প্রয়োজন। যেখানে ২০০ জন বিদ্যুৎ কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট, বাকিরা নিরাপত্তায় নিযুক্ত। সে হিসাবে ঘোড়াশালে জনবল নিয়োজিত রয়েছে আট গুণের বেশি। এ বিপুলসংখ্যক কর্মীর বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন ব্যয় দিনশেষে বিপিডিবিকে বহন করতে হয়।

ঘোড়াশালের মোট সাতটি ইউনিটের কোনোটিই এখন বিপিডিবির উৎপাদন তালিকায় নেই। কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানায় গ্যাস দেয়া হলে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালানোর কোনো সুযোগ নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের মোট সক্ষমতা ১১০ মেগাওয়াট (৫৫ মেগাওয়াট করে)। এ দুটি ইউনিট এখন অবসরে। তৃতীয় ইউনিট (২৬০ মেগাওয়াট) রিপাওয়ারিং বা রক্ষণাবেক্ষণে রয়েছে। এ ইউনিটের বিপরীতে চীনের এইচএসবিসি ব্যাংকের কাছ থেকে ৯৭ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার ঋণের বিপরীতে গ্যারান্টি রয়েছে বিপিডিবির। মূলত এ ঋণের বিনিময়ে তৃতীয় ইউনিটের ২১০ মেগাওয়াট কার্যক্ষমতা ৪০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছে বিপিডিবি। এছাড়া চতুর্থ ইউনিটও (২১০ মেগাওয়াট) রিপাওয়ারিং করা হচ্ছে। চতুর্থ ও পঞ্চম ইউনিট মাঝে মাঝে গ্যাস পেলে চালানো হয়, ষষ্ঠ ইউনিটের কোনো উৎপাদন কার্যক্রম নেই। আর সপ্তম ইউনিটটি গত কয়েক মাস আগে গ্যাস পাওয়া সাপেক্ষে চালানো হয়েছিল।

বিপিডিবির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব থেকে জানা গেছে, ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তৃতীয় ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণ চলমান থাকায় ইউনিটটি থেকে কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়নি। চতুর্থ ইউনিট থেকে মাত্র ১৬৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। পঞ্চম ইউনিট (২১০ মেগাওয়াট) থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১৩ মেগাওয়াট আর সপ্তম ইউনিট (৩৬৫ মেগাওয়াট) থেকে ৭৮ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সংস্থাটির তথ্যমতেই গত অর্থবছরে ঘোড়াশাল কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়নি বললেই চলে।

ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান ফটক ছবি: কামরুল ইসলাম কামাল

বিপিডিবির নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতায় যতগুলো কেন্দ্র আছে তার মধ্যে অন্যতম পুরনো বিদ্যুৎ কেন্দ্র ঘোড়াশাল। সাড়ে পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে উৎপাদনে থাকা কেন্দ্রটি বর্তমানে গ্যাস সংকট, কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া এবং কারিগরি দুর্বলতায় উৎপাদনে নেই। কিন্তু বিপিডিবিকে বড় জনবলের ব্যয়ভার বহন করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারের সদিচ্ছা ও সংস্থাটির কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন সংস্থাটির সাবেক কর্মকর্তারা।

ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দীর্ঘ ২৬ বছর কাজ করেছেন বিপিডিবির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মানজুর-উল-আলম। কেন্দ্রটির প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে ২০১৮ সালে অবসরে যান এ কর্মকর্তা। ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ কেন্দ্রে প্রথমত, গ্যাস সংকট; দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রটির ইফিশিয়েন্সি (দক্ষতা) লেভেলে ঘাটতি রয়েছে। তৃতীয়ত, নানা সময় কেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সংস্কার করা হয়। এসব পরিস্থিতির কারণে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালাতে নানা সময় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। সে কারণে বড় সংখ্যক জনবলও বসে থাকতে হচ্ছে। এখন বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালাতে হলে সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটির বর্তমান পরিস্থিতি সরজমিনে দেখতে গতকাল সেখানে গিয়েছিলেন বণিক বার্তার নরসিংদী প্রতিনিধি। পরিচয় দিয়ে প্রবেশ করতে চাইলে নিরাপত্তা কর্মীদের কাছ থেকে অনুমতি পাওয়া যায়নি। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর মোহা. এনামুল হকের কাছে ভেতরে প্রবেশের অনুমতির জন্য একাধিকবার মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আশপাশের মানুষের কাছে জানতে চাওয়া হলে তারা নিশ্চিত করেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন উৎপাদনে নেই।

আশপাশ ঘুরে দেখা গেছে, শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির ভেতরে নান্দনিক স্থাপনা, বিদেশী ও স্থানীয় অতিথিদের জন্য রিসোর্ট রয়েছে। প্রধান প্রবেশদ্বারের সামনে গেলে দেখা যায় ভেতরে প্রচুর মানুষের আনাগোনা। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভেতরে স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দিরসহ বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে। তবে কেন্দ্রটির সুনসান নীরবতায় বাইরে থেকে বোঝা যায় সেখানে উৎপাদন বন্ধ।

ঘোড়াশালসহ বিপিডিবির বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে না থাকা কিংবা বছরের বেশির ভাগ সময় বসে থাকায় সামগ্রিকভাবে সংস্থাটির বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সংস্থার নিজস্ব কেন্দ্রের বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি উৎপাদন ব্যয় ছিল গড়ে ৮ টাকা ৪৭ পয়সা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ টাকা ২৬ পয়সায়।

ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ হয় ১৯৬৭ সালে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রটির দক্ষতা যেমন বৃদ্ধি করা যায়নি, তেমনি গ্যাস সংকটের কারণে এখন প্রায় সারা বছরই বন্ধ থাকছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঘোড়াশাল পাওয়ার প্লান্ট বিপিডিবির বহু পুরনো কেন্দ্র। সেখানে যদি বিপুল জনবল বসে থাকে, তাহলে বিপিডিবির উচিত, নতুন নিয়োগে না গিয়ে অন্য বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে কীভাবে এ লোকবল সরিয়ে নেয়া যায় সেটা বিবেচনা করা। তাছাড়া জনবলের আধিক্য নিয়ে প্রশ্ন উঠলে একই সক্ষমতার বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের লোকবলের সঙ্গে তুলনা করলেই বোঝা যায়, কত জনবল থাকা উচিত। এক সময় সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বেশি লোকবল নিয়োগের রীতি ছিল। বিপিডিবি আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এখন তাদের উচিত দক্ষতার মাধ্যমে ব্যয় কমানো।’

ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু না থাকলেও সেখানকার বিপুল জনবলের পেছনে বিপিডিবির ব্যয় বাড়ছে। এ ব্যয় বিপিডিবি কীভাবে টানছে জানতে চাইলে সংস্থাটির শীর্ষ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে না থাকায় সেখানকার অনেক লোকবল সরিয়ে নেয়া হয়েছে। আরো কিছু সরানোর প্রক্রিয়ায় রয়েছে বিপিডিবি। তবে একেবারে সরানোর সুযোগ নেই। কারণ সেখানকার সেটআপ দেখভাল ও চালু রাখার জন্য জনবলের প্রয়োজন রয়েছে।’

ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র দ্রুত উৎপাদনে আনার বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ এবং বিপুল পরিমাণ লোকবল কমানোর বিষয়ে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন বিপিডিবির শীর্ষ নির্বাহীরা।

বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে না থাকার প্রধান কারণ সেখানকার সার কারখানা। সারে গ্যাস দেয়া হলে বিদ্যমান পাইপলাইনে বিদ্যুৎ কেন্দ্র চলবে না। এজন্য মনোহরদী-ঘোড়াশাল একটি ডেডিকেটেড পাইপলাইন নির্মাণ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জিটিসিএল এ পাইপলাইন করবে। এরই মধ্যে ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ শেষ পর্যায়ে। তবে সেই পাইপলাইন প্রস্তুত হতে বছরখানেকের বেশি সময় লেগে যাবে।’

আরও