গাজীপুর ও টঙ্গী পৌরসভাসহ ৩২৯ দশমিক ৯০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে ২০১৩ সালের ১৬ জানুয়ারি গঠিত হয় গাজীপুর সিটি করপোরেশন (জিসিসি)। আয়তনের দিক থেকে এটি দেশের বৃহত্তম সিটি করপোরেশন। স্থানীয় সরকারের এ প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য সে সময় বিভিন্ন পদে ১ হাজার ৫৫৪ জন লোকবলের প্রস্তাব করা হয়। তবে জনবল নিয়োগ বিধিমালা অনুমোদন না হওয়ায় সাবেক দুই পৌরসভার ২৬১ জন দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম। প্রস্তাবিত জনবলের ৮৩ শতাংশ এখনো শূন্যই রয়েছে। প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, সচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ নয়টিসহ অনেক পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি রয়েছে। এ অবস্থায় কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে সিটি করপোরেশনের সেবা কার্যক্রম।
সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, শূন্যপদে জনবল পদায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে। নিয়োগ বিধি অনুমোদন না হওয়ায় নতুন করে জনবল নিয়োগ দেয়া যাচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ খান (যুগ্ম সচিব) বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন হলেও আমরা এখনো পৌরসভার জনবল দিয়েই কাজ চালাচ্ছি। এখানে জনবল সংকট রয়েছে। এ কারণে অনেক সময় নাগরিকদের সেবা দিতে পারছি না। শূন্যপদ পূরণ ও নতুন জনবল নিয়োগ হলে সংকট কাটবে, সেবার মানও বাড়বে।’
সূত্রে জানা গেছে, সিটি করপোরেশন গঠনের ১০ বছর পর ২০২২ সালে জনবল কাঠামো অনুমোদন করা হয়। তিন বছর পেরিয়ে গেলেও জনবল নিয়োগ বিধিমালা অনুমোদন হয়নি। ফলে নতুন করে কোনো জনবল নিয়োগ বা পদোন্নতি দেয়া যাচ্ছে না। এ কারণে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হলেও ১২ বছরের অধিক বেশি সময় ধরে দুই পৌরসভার জনবল দিয়েই চলছে সেবার কাজ। অস্থায়ীভাবে ১ হাজার ২০০ জনকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
নগরবাসী বলছেন, নির্বাচিত মেয়র না থাকায় নেতৃত্ব শূন্যতায় ধুঁকছে দেশের বৃহত্তম এ সিটি করপোরেশনটি। শিল্প-কারখানা সমৃদ্ধ গাজীপুর সিটি কার্যত অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জনবল সংকট। এসব কারণে ১২ বছরে প্রতিষ্ঠানটি নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণে সফল হতে পারেনি। সিটি করপোরেশনকে জনবান্ধব ও সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে হলে দ্রুত শূন্যপদে দক্ষ জনবল নিয়োগ, পদোন্নতি ও নতুন লোক নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন।
এ ব্যাপারে গাজীপুর নাগরিক ফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশন শুধু নামেই হয়েছে। মহানগরীর কোথাও নাগরিক সুবিধার ছিটেফোটাও দেখা যায় না। সিটি করপোরেশন হওয়ার জন্য যেসব নাগরিক সুবিধা থাকা দরকার, তার কিছুই এখানে নেই। মেয়র না থাকা, দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারী না থাকায় সেবার মান একটুও বাড়েনি। বরং বেড়েছে জনদুর্ভোগ।’
তিনি বলেন, ‘গত এক যুগেও গাজীপুরে নাগরিক সেবা না বাড়ায় আমরা হতাশ। বিগত তিনটি নির্বাচনে আমরা অনেক আশা নিয়ে মেয়র নির্বাচিত করেছিলাম। কিন্তু একজনও তাদের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। উন্নত নাগরিক সেবা আমাদের দিবাস্বপ্ন। বারবার অভিভাবকহীন সিটি করপোরেশন স্থবির হয়ে পড়েছে। গতিশীলতা দেখছি না। অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, নেতৃত্ব ও জনবল সংকট নগরীকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। সেবার জন্য নগর ভবনে গেলেই শোনা যায়, লোক নেই। যদি প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ বা পদায়ন করা না হয়, তাহলে এত বড় সিটি করপোরেশন গঠন করে নগরবাসীকে বাড়তি করের বোঝা ও হয়রানিতে ফেলার দরকার ছিল?’
সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, নগর উন্নয়ন, সংস্কার, রাস্তাঘাট, ব্রিজ ইত্যাদি নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করে প্রকৌশল বিভাগ। সেখানেই দীর্ঘদিন ধরে প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী নেই। সিটির আটটি অঞ্চলের প্রকৌশল বিভাগে দুজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, আটজন নির্বাহী প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন পদে কর্মরত অধিকাংশ প্রকৌশলী চলতি দায়িত্ব বা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া সচিব, প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, প্রোগ্রামার, ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তাসহ গুরুত্বপূর্ণ নয়টি পদ শূন্য রয়েছে। এসব পদে কোনো কর্মকর্তা না থাকায় কাজকর্মে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে কমিশনার ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শরফ উদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দায়িত্ব নেয়ার পর গাজীপুর সিটি করপোরেশনকে নাগরিকবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো পূরণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে। নতুন লোক নিয়োগ ও পদোন্নতির জন্য নিয়োগ বিধিমালা প্রয়োজন। এটি এখনো অনুমোদন না হওয়ায় নিয়োগ বা পদোন্নতি দেয়া যাচ্ছে না। বিষয়গুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। দ্রুতই এসব সমস্যা সমাধান হবে।’