মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা এবং ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের শঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ইরানের হরমুজ প্রণালী বন্ধের খবরে রাজধানীর জ্বালানি তেলের বাজারে দেখা দিয়েছে চরম অস্থিরতা। সরবরাহ সংকটের অজুহাতে মিরপুর, গাবতলী ও আসাদগেট এলাকার অনেক পাম্প তেল বিক্রি বন্ধ রেখেছে, আবার কোথাও দেয়া হচ্ছে চাহিদার তুলনায় যৎসামান্য। ফলে শুক্রবার ছুটির দিনেও পাম্পগুলোতে যানবাহন ও মানুষের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। তেলের জন্য গ্রাহকদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
মিরপুর-১ নম্বরের স্যাম অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড-এ গিয়ে দেখা যায়, তেলশূন্য পাম্পের চিত্র। ফিলিং স্টেশনের সামনে সারি সারি বাইক আর প্রাইভেটকার। অনেকেই দুই থেকে তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছেন তেল নেয়ার আশায়।
মেঘনা পেট্রোলিয়ামের এ ডিলারশিপ স্টেশনের ক্যাশ ইনচার্জ আরাফাত জানান, আমাদের স্টকে কোনো তেল নেই। একটি গাড়ি আসবে তেল নিয়ে, এ কারণে আমরা যানবাহনের চালকদের অপেক্ষা করতে বলেছি। তেলের গাড়ি এলেই আমরা গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করতে পারব। গত রাতে যা ছিল সব বিক্রি হয়ে গেছে। ডিপোর কাছে তেল চেয়েও কোনো সাড়া পাচ্ছি না। তারা বলছে, আপাতত তেল দিতে পারবে না।
সেখানকার কর্মী কামরুল জানান, গত দুই-তিনদিন ধরে অস্বাভাবিক ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ট্যাংক ফুল লোড করছে। সকালে তেল নিয়ে যাওয়া গাড়িগুলো বিকালেই আবার লাইনে দাঁড়াচ্ছে।
দীর্ঘ তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মোস্তাফিজুর নামের এক রাইড শেয়ারিং চালক আক্ষেপ করে বলেন, ঈদের সময় বাড়তি আয়ের আশায় শুক্রবার বের হয়েছিলাম, এখন তিন ঘণ্টা ধরে তেলের গাড়ির অপেক্ষায় বসে আছি।
মিরপুর-২ নম্বর থেকে আসা প্রাইভেটকার চালক মনির হোসেন জানান, বাজারে তেল পাওয়া যাবে না—এমন গুঞ্জনে শুক্রবারের মালিক তাকে গাড়ি নিয়ে পাঠিয়েছেন। কিন্তু পাম্প থেকে ফুল ট্যাংকির বদলে তাকে মাত্র ৫০০ টাকার তেল দেয়া হয়েছে। অনেক বাইকার অভিযোগ করেছেন, তারা ১০০ টাকার বেশি তেল পাচ্ছেন না।
মিরপুর টেকনিক্যাল মোড়ের মোহনা পেট্রোল পাম্পে মালিক মাজহারুল ইসলাম খোকন নিজেই দাঁড়িয়ে তদারকি করছেন। পাম্পটিতে বাইকে ১০০-২০০ টাকা এবং প্রাইভেটকারে ৫০০-১০০০ টাকার বেশি তেল দেয়া হচ্ছে না। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়িগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কিছুটা বেশি তেল দেয়া হচ্ছে। মালিক খোকন বলেন, যতটুকু স্টক আছে, তা দিয়ে সবাইকে একটু একটু করে সেবা দেয়ার চেষ্টা করছি।
মাজার রোডে অবস্থিত সোহাগ গ্রুপের এসপি ফিলিং স্টেশনে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। এখানে গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী তেল দেয়া হলেও লাইন ছিল অত্যন্ত দীর্ঘ। বেসরকারি চাকরিজীবী শরিফুল ইসলাম প্রায় দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল পেয়েছেন। তিনি বলেন, গুজব শুনছি আগামী সপ্তাহে তেল পাওয়া যাবে না, তাই ছুটির দিনেও লাইনে দাঁড়িয়েছি। এছাড়া টেকনিক্যালের পূর্বাচল গ্যাস ফিলিং এবং কল্যাণপুরের সোহরাব ফিলিং স্টেশনে দূরপাল্লার বাস ও অন্যান্য গাড়িতে তেল নিতে দেখা গেছে।
রাজধানীর আসাদগেটে অবস্থিত তালুকদার ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড সার্ভিসিং সেন্টারে গিয়ে দেখা যায় যানবাহনের বিশাল সারি, যা জিয়া উদ্যানের রাস্তা পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে। সেখানে রাস্তায় অপেক্ষারত এক বাইকার জানান, তেলের দাম বৃদ্ধি ও সংকটের আশঙ্কায় তিনি দুই ঘণ্টা ধরে লাইনে আছেন। অফিস যাতায়াতের জন্য তেল অপরিহার্য হওয়ায় কোনো ঝুঁকি না নিয়েই শুক্রবারে চলে এসেছি তেল নিতে।
এ পাম্পে বাইকে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা এবং প্রাইভেটকারে ২০০০ টাকার তেল বরাদ্দ করা হয়েছে। ক্যাশ কাউন্টারের কর্মী বণিক বার্তাকে বলেন, ডিপো থেকে নিয়মিত সরবরাহ হয়। কিন্তু শুক্র ও শনিবার ডিপো থেকে তেল সরবরাহ করা হয়না। এ কারণে আজ সরবরাহ গাড়ি না আসায় আমরা আগের স্টক দিয়ে সীমিত আকারে যানবাহনগুলোতে তেল বিক্রি করছি। সংকটের কারণ একটাই শুক্রবার ছুটির দিনে ডিপো থেকে গাড়ি আসেনি। যেহেতু শুক্র ও শনিবার ডিপো বন্ধ থাকে, তাই রোববারের আগে নতুন তেল আসার সম্ভাবনা নেই। স্টক শেষ হয়ে গেলে আমাদেরও পাম্প বন্ধ করে দিতে হবে।