রাজধানীর সড়ক, ফুটপাত, ভবন, গণপরিবহন, শৌচাগারসহ নগরজীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচল ও প্রবেশের প্রয়োজনীয় সুবিধা নেই বললেই চলে। কোথাও হুইলচেয়ারের জন্য র্যাম্প নেই, কোথাও থাকলেও তা ভাঙা, দখল করা বা যানবাহনে আটকে থাকে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য স্থাপিত ট্যাকটাইল পথও অনেক জায়গায় বৈদ্যুতিক খুঁটি, ম্যানহোল, ব্যারিকেড ও দোকানের মালপত্রে বাধাগ্রস্ত। সরকারি-বেসরকারি ভবন ও গণপরিবহনেও প্রয়োজনীয় সুবিধা সীমিত। ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও সরকারি সেবা নিতে গিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়মিতই অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আইন ও ভবন বিধিমালায় প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতের নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুবই সীমিত।
রাজধানীর শ্যামলী, মোহাম্মদপুর, আদাবর, ধানমন্ডি, শাহবাগ, নিউমার্কেট, ফার্মগেট, মিরপুর, মহাখালী, বনানী, গুলশান, বাড্ডা, রামপুরা, সেগুনবাগিচা, পোস্তগোলা ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা সরজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, অনেক জায়গায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য ট্যাকটাইল বা স্পর্শনির্ভর পথ নেই। কোথাও থাকলেও তা ভাঙা, বিচ্ছিন্ন বা নানা প্রতিবন্ধকে আটকে আছে। এসব পথের ওপর বৈদ্যুতিক খুঁটি, ম্যানহোল, ধাতব ব্যারিকেড ও দোকানের মালপত্রও দেখা গেছে। হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের চলাচলেও ফুটপাতের উচ্চতা, ভাঙা টাইলস, খোলা ম্যানহোল, নালা ও দখল বড় বাধা হয়ে আছে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শারীরিক প্রতিবন্ধী তুষার আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পোস্তগোলা এলাকায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা খুবই সীমিত। বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকেই নানা বাধার মুখে পড়তে হয়। কোথাও ফুটপাত ভাঙা, কোথাও দখল করা, আবার কোথাও যানবাহন রাখা থাকে। শুধু সড়ক বা ফুটপাত নয়, সরকারি-বেসরকারি ভবনে প্রবেশ, গণপরিবহনে ওঠানামা ও ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার পাওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। কোনো একটি জায়গায় প্রবেশের ব্যবস্থা থাকলেও পরবর্তী গন্তব্যে যাওয়ার পথ প্রতিবন্ধীবান্ধব না হওয়ায় পুরো যাত্রাই কঠিন হয়ে পড়ে। কর্মজীবী হিসেবে প্রতিদিনই এসব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।’
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জাতীয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জরিপ ২০২১-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ২ দশমিক ৮ শতাংশই প্রতিবন্ধী। কার্যক্ষমতার সমস্যাভিত্তিক বিস্তৃত সংজ্ঞা ব্যবহার করলে এ হার ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নগর অবকাঠামো সহজপ্রবেশ্য করার বিষয়ে আইন ও বিধিমালায়ও নির্দেশনা রয়েছে। ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩’-এর ৩৪ ধারায় গণস্থাপনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি ভবন, পার্ক, স্টেশন, টার্মিনাল ও সড়কও এর আওতাভুক্ত। জাতীয় ভবন নির্মাণ বিধিমালা ২০২০-এও ভবনকে সহজপ্রবেশ্য করার বিভিন্ন বিধান রয়েছে।
সরজমিনে দেখা গেছে, এসব নির্দেশনার সঙ্গে নগর অবকাঠামোর বাস্তব চিত্রের বড় ফারাক রয়েছে। কোথাও র্যাম্প থাকলেও পরের অংশে ফুটপাতের উচ্চতা বদলে গেছে, কোথাও পথ ভাঙা বা দখল হয়ে আছে। ফলে পুরো যাত্রাপথ ব্যবহারযোগ্য থাকছে না। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য ফুটপাতে স্থাপন করা স্পর্শনির্ভর পথের অবস্থাও এলাকাভেদে ভিন্ন। শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নীলক্ষেতের কয়েকটি এলাকায় এ ধরনের পথ থাকলেও শাহবাগ থেকে কাটাবন হয়ে সায়েন্স ল্যাব পর্যন্ত বিভিন্ন অংশে এর ধারাবাহিকতা নেই। কোথাও এ পথ তৈরি করা হয়নি, কোথাও আবার তা ভাঙা বা বিভিন্ন প্রতিবন্ধকে আটকে আছে।
কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট ও মিরপুর-১০ করিডোরের কিছু অংশে উন্নয়নকাজের পর নতুন স্পর্শনির্ভর পথ তৈরি করা হয়েছে। তবে ফার্মগেটে এ পথের ওপরই ধাতব খুঁটি বসানো দেখা গেছে। মোটরসাইকেল চলাচল ঠেকাতে এসব খুঁটি স্থাপন করা হলেও এতে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের চলাচলও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মহাখালী, বনানী ও গুলশানের বিভিন্ন ফুটপাতেও বৈদ্যুতিক খুঁটি, ল্যাম্পপোস্ট, ম্যানহোল ও অসমতল কংক্রিটের কারণে স্পর্শনির্ভর পথের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘ঢাকায় সাধারণ মানুষের চলাচলেই নানা বাধা রয়েছে, সেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য তো পরিস্থিতি আরো কঠিন। অনেক এলাকায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের চলাচলের জন্য ট্যাকটাইল পেভিং স্থাপন করা হলেও এর সঙ্গে ফুটপাতের অন্যান্য অবকাঠামোর সমন্বয় নেই। কোথাও দখল, কোথাও বিভিন্ন স্থাপনা বা প্রতিবন্ধকতার কারণে এসব পথের ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না, সেগুলোর ব্যবহারযোগ্যতা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও নিশ্চিত করতে হবে।’
হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের চলাচলে ফুটপাতের র্যাম্প গুরুত্বপূর্ণ হলেও অনেক জায়গায় তা ব্যবহারযোগ্য নয়। সরজমিনে দেখা গেছে, কারওয়ান বাজার মেট্রোরেলের নিচে থাকা র্যাম্পের মুখে গাড়ি ও মোটরসাইকেল রাখা হচ্ছে। আবার বাংলামোটর মোড়ের আগে ফুটপাত ও সড়কের উচ্চতার পার্থক্যের কারণে র্যাম্প থাকলেও হুইলচেয়ার নিয়ে তা ব্যবহার করা কঠিন। ভবনগুলোর ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। অনেক ভবনের প্রবেশমুখে র্যাম্প থাকলেও দরজার প্রস্থ, লিফট, করিডোর, শৌচাগার ও জরুরি বহির্গমনের ব্যবস্থা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ব্যবহারের উপযোগী নয়।
শারীরিকভাবে হাঁটতে অক্ষম সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের বেশির ভাগ সরকারি-বেসরকারি ভবন ও স্থাপনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য উপযুক্ত র্যাম্প বা এলিভেটর সুবিধা নেই। ফলে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ও চলাচলে অক্ষম ব্যক্তিদের ভবনে প্রবেশ ও ভেতরে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়ে। সরকার পরিবহনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ছাড় ও সুবিধা ঘোষণা করলেও বাস্তবে সেসব সুবিধা পাওয়া যায় না। অনলাইনে ট্রেনের টিকিট কেনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণেও নানা বাধার মুখোমুখি হতে হয়। হাসপাতাল ও সমাজসেবা দপ্তরগুলোতে আলাদা লাইন বা অগ্রাধিকার না থাকায় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক খাতেও প্রতিবন্ধীবান্ধব সুবিধার ঘাটতি রয়েছে।’
গণপরিবহনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আসন সংরক্ষণের বিধান থাকলেও বাসে ওঠানামা ও চলাচলের ক্ষেত্রে রয়েছে সীমাবদ্ধতা। অনেক বাসে দরজা, ভেতরের জায়গা এবং ওঠানামার ব্যবস্থা প্রতিবন্ধী ব্যবহারকারীদের উপযোগী নয়। আবার অনেক বাসস্টপে ফুটপাত থেকে বাসে ওঠার প্রয়োজনীয় সংযোগও নেই। ফলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর ফুটপাত পার হলেও গণপরিবহনে ওঠা বেশ কঠিন। মেট্রোরেল স্টেশনগুলোতে লিফট, ব্রেইল বোতাম, স্পর্শনির্ভর পথ ও বিশেষ শৌচাগারের মতো কিছু সুবিধা রয়েছে। তবে স্টেশনে পৌঁছানো এবং স্টেশন থেকে বের হয়ে গন্তব্যে যাওয়ার পথ সব জায়গায় প্রতিবন্ধীবান্ধব নয়।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কাজ করে ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (পিডিএফ)। সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মোহাম্মদ ইয়াসন আলম রবি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনেক ভবনে র্যাম্প বা লিফট থাকলেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সেগুলো সবসময় ব্যবহার করতে পারেন না। আমার এক হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী বন্ধুকে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হয়েছিল। সেখানে র্যাম্প বা লিফট না থাকায় কয়েকজন মিলে তাকে ধরে ভবনে তুলতে হয়েছিল। এ ধরনের অভিজ্ঞতা অনেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে চাকরির সাক্ষাৎকার বা অন্য প্রয়োজনেও বাইরে যেতে নিরুৎসাহিত করে। হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী বা চলাচলে অন্য ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের জন্য লিফট থাকলেও অনেক সময় ভিড়ের কারণে তারা প্রয়োজনীয় অগ্রাধিকার পান না। অর্থাৎ আইন ও অবকাঠামো থাকলেও বাস্তব প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে। মানুষের সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ ছাড়া শুধু আইন ও অবকাঠামোর মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।’
দেশে প্রতিবন্ধীবান্ধব শৌচাগারের ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত নয়। ইউনিসেফের ২০২৫ সালের মূল্যায়নে ২৫ জেলার ২১১টি প্রতিষ্ঠান পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রতিবন্ধীবান্ধব শৌচাগার থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাত্র ৩০ শতাংশে শৌচাগারের ভেতরে বা সেখানে যাওয়ার পথে র্যাম্প ছিল। ৫৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে হুইলচেয়ার ঘোরানোর মতো পর্যাপ্ত জায়গা পাওয়া গেছে।
পুরনো অনেক সরকারি অফিস, হাসপাতাল, বাজার ও অন্যান্য গণস্থাপনাতেও এসব সুবিধার ঘাটতি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। গত ২৭ জুলাই সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়, বিদ্যমান আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী গণস্থাপনায় প্রতিবন্ধীবান্ধব টয়লেটসহ প্রয়োজনীয় প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা আবশ্যক। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য র্যাম্পের ব্যবস্থা ছাড়াই ভবন ও স্থাপনা, গণপরিবহন, মার্কেট, স্টেশন, বন্দর ও সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে বিদ্যমান গণস্থাপনাগুলোতেও যত দ্রুত সম্ভব প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশের উপযোগী করার অনুরোধ জানানো হয়।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ আগস্ট গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠি পাঠায়। এতে ভবন ও স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।
এ বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নতুন সরকারি ভবনগুলোতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলের সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ঢালু পথসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামোয় এখনো ব্যাপকভাবে এ সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব না হলেও ন্যূনতম প্রয়োজনীয় মান বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে সরকার ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।’