শুধু জ্বালানি নিরাপত্তা নয়, সার্বিক শক্তি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিতে হবে

—ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী

উপ-উপাচার্য, বুয়েট

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু এলএনজি-নির্ভরতা বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দিলে চলবে না; বরং সার্বিক শক্তি ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ দিতে হবে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে বিশ্ব যেদিকে এগোচ্ছে, আমাদেরও সেদিকে যেতে হবে। শুধু নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভর করে দেশের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। দেশে প্রায় ১৮ কোটি মানুষ, অথচ জমির পরিমাণ সীমিত। বাংলাদেশের রূপান্তরের সঙ্গে এ দুই সম্পদের রূপান্তরও জড়িত। তাই আমাদের মনোযোগ মানুষ ও জমির সর্বোত্তম ব্যবহারের দিকে দিতে হবে। কৃষির উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, দেশের শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশের বেশি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এর অর্থ এই নয় যে তারা সবাই সার্বক্ষণিক কৃষক; তবে তাদের জীবিকার প্রধান ভিত্তি কৃষি। অথচ জিডিপিতে কৃষির অবদান মাত্র ১২-১৩ শতাংশ। অর্থাৎ শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ কৃষির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও অর্থনীতিতে তাদের অবদান তুলনামূলক কম। এ থেকেই বোঝা যায়, এ খাতে বড় ধরনের দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে।

এখন দেশের শক্তি খাতের দিকে তাকালে দেখা যায়, মোট গ্যাস সরবরাহের ৩৫ শতাংশই এলএনজি-নির্ভর। আবার এ গ্যাস ব্যবহার করে গ্রিড ও ক্যাপটিভ খাতে প্রায় ৬০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। অর্থাৎ দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা অনেকাংশেই এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে আমাদের বিদ্যুৎ খাত ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশে মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহার বছরে প্রায় ৬৫০ কিলোওয়াট-ঘণ্টা। এ হার ভিয়েতনামের তুলনায় মাত্র ২৫ শতাংশ এবং থাইল্যান্ডের তুলনায় ২০ শতাংশ। এসব দেশের পর্যায়ে যেতে হলে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহার কতটা বাড়াতে হবে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

এক্ষেত্রে চারটি খাত—কৃষি, শিক্ষা, শক্তি এবং পরিবহন ও লজিস্টিকসে মনোযোগ দিতে হবে। এ খাতগুলোকে কেন্দ্র করে সমগ্র শক্তি ব্যবস্থাপনাকে সাজাতে হবে। শুধু জ্বালানি নয়, পুরো শক্তি ব্যবস্থাপনা। অর্থাৎ শক্তি নিরাপত্তাকে এ প্রধান খাতগুলোর প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা করতে হবে। এক্ষেত্রে শক্তি নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় তিনটি সমস্যা বা হুমকি হচ্ছে দুর্নীতি, অদক্ষতা ও নীতিগত পরিকল্পনার ঘাটতি। দুর্নীতি এনার্জি সেক্টর কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, সেটা জাতীয় রিভিউ কমিটিতে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন চুক্তি পর্যালোচনা করার সময় দেখেছি। দুর্নীতির কারণেই আমরা বহু ধরনের ভোগান্তির মধ্যে আছি। অদক্ষতার উদাহরণ হিসেবে কৃষিতে উৎপাদন-পরবর্তী বিপুল অপচয়ের কথা বলা যায়। এর পাশাপাশি মানবসম্পদ ও আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায়ও অদক্ষতা রয়েছে। আমদানি করা ব্যয়বহুল এলএনজিও আমরা দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারছি না। তাই এর বিকল্প ও অধিক কার্যকর ব্যবহারের উপায় নিয়ে ভাবতে হবে।

যেমন ব্যাটারি চার্জিংয়ের জন্য দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার বিকল্প হতে পারে। আমাদের রেলস্টেশন, মেট্রোরেলের ছাদ—এসব জায়গাকে চার্জিং পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। এছাড়া নীতিগত পরিকল্পনার ক্ষেত্রে গত ডিসেম্বর ও এবারের গ্রীষ্মে পাওয়ার গ্রিডের ২৪ ঘণ্টার লোড তুলনা করলে দেখা যায়, অন্যান্য বিষয় অপরিবর্তিত ধরে শুধু শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের জন্যই প্রায় ছয় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে। এ বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে এলএনজি ব্যবহার করে শুধু ঘর শীতল না করে শিল্প উৎপাদন, ফসল সংরক্ষণ কিংবা অন্য কোনো উৎপাদনশীল কাজে কাজে লাগানো যেত। এ সিদ্ধান্তটাই নীতিগত পরিকল্পনার অংশ। তাই বাংলাদেশের ট্রান্সফরমেশনের সঙ্গে এনার্জি সিকিউরিটিকে যুক্ত করে আমাদের পরিকল্পনা করতে হবে। এখন আমরা চাইলে গ্রিডে ইচ্ছেমতো ৮ হাজার বা ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করতে পারব না। গ্রিডেরও সীমাবদ্ধতা আছে। এ সীমাবদ্ধতাগুলো বিবেচনা করে বর্তমানে যে পাওয়ার প্লান্টগুলো রয়েছে, সেগুলোর সক্ষমতা হিসাব করে দেখতে হবে—গ্রিড আসলে কতটুকু সৌরবিদ্যুৎ গ্রহণ করতে পারবে। সেই হিসাব করেই পরিকল্পনা করতে হবে।

আরও