বাংলাদেশী গ্রাহকদের প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বা ১১ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছিল ভার্চুয়াল মুদ্রা প্লাটফর্ম মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ বা এমটিএফই। আত্মসাৎকৃত এ অর্থ রূপান্তর করা হয়েছিল ক্রিপ্টোকারেন্সিতে।
ক্রিপ্টোকারেন্সি হিসেবে পাচার হওয়া এ অর্থের একাংশ জব্দ হওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সংস্থাটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় ৩ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার মূল্যমানের ইউএসডিটি (ব্লকচেইন প্রযুক্তির স্থির মুদ্রা) জব্দ করেছে ভার্চুয়াল মুদ্রা রূপান্তর ও বিনিময়ের প্লাটফর্ম ওকেএক্স। বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশের অনুকূলে ক্রিপ্টোকারেন্সি জব্দের এটিই প্রথম ঘটনা বলে দাবি করছে সিআইডি। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ অর্থ দেশে ফেরত আনতে হলে আইনি মীমাংসার মাধ্যমে আনতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে এ-সংক্রান্ত আইন না থাকায় ফেরত আনার প্রক্রিয়া কী হবে তা নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন তারা।
তাদের দাবি, জব্দ হওয়া এ ভার্চুয়াল মুদ্রা মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ বা এমটিএফই প্লাটফর্মের মাধ্যমে দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের একটি অংশ। পরিমাণে কম হলেও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সি হিসেবে পাচার হওয়া অর্থ জব্দের এটিই প্রথম ঘটনা। এ অর্থ সফলভাবে ফেরত আনতে পারলে তা বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার একটি নজির হয়ে থাকবে।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এমটিএফইর বিরুদ্ধে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালের আগস্টে প্রতারণার মাধ্যমে দেশ থেকে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ ওঠে এমটিএফইর বিরুদ্ধে। এরপর ভুক্তভোগীদের মামলা ও অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত শুরু করে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি), ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), সাইবার ক্রাইম ইউনিট ও কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটসহ (সিটিটিসি) পুলিশের কয়েকটি ইউনিট। এর পরিপ্রেক্ষিতে ক্রিপ্টোকারেন্সিকে কাগজি মুদ্রায় রূপান্তরকারী মার্কিন প্রতিষ্ঠান ওকেএক্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে এমটিএফইর ক্রিপ্টোকারেন্সির বিষয়ে জানতে পারে সিপিসি। এরপর বাংলাদেশের আদালতের অনুমোদন নিয়ে ওকেএক্সের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণের মাধ্যমে এ অর্থ জব্দের আবেদন করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি ওকেএক্সে থাকা এমটিএফইর ভার্চুয়াল মুদ্রা জব্দ করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করেছে ঢাকায় স্থাপিত মার্কিন দূতাবাস।
সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) উপপরিদর্শক আতিকুর রহমান এ ভার্চুয়াল কারেন্সি জব্দের তথ্য নিশ্চিত করে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ক্রিপ্টোকারেন্সির বিষয়ে আইন না থাকলেও দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর স্বার্থে আমরা তৎপর ছিলাম। যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন করে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের সহযোগিতায় ওকেএক্স প্লাটফর্মে আবেদনের পর প্রায় ৩ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার জব্দ করতে পেরেছি। এক্ষেত্রে মূলত প্রতারণার মাধ্যমে গ্রাহকের টাকা নিয়ে তা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করেছিল এমটিএফই। আইনি মীমাংসা হলেই এ অর্থ ফেরত আসতে পারে দেশে।’
এর আগে ২০২৩ সালের আগস্টে আনুমানিক ১ বিলিয়ন ডলার বা তৎকালীন বিনিময় হারে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা নিয়ে গায়েব হয় এমটিএফই। বাংলাদেশ থেকে প্রতিষ্ঠানটিতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিনিয়োগকারী ছিলেন। এ ১ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থই বাংলাদেশী বিনিয়োগকারীদের। দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি মূলত মালটিলেভেল মার্কেটিং বা এমএলএম পনজি মডেলে ব্যবসা করত। বলা হয়েছিল, কিছু টাকা বিনিয়োগ করলেই প্রতিষ্ঠানের সিইও হওয়া যাবে। প্রতিদিন মিলবে দ্বিগুণ, তিন গুণ মুনাফা। এজন্য ট্রেডিং করতে হবে বিদেশী অ্যাপে। সে আশায় এখানে বিপুল পরিমাণ অর্থ লগ্নি করে অনেক মানুষ। এমটিএফইর প্রতিষ্ঠাতা মাসুদ আল ইসলাম এখন বিদেশে পলাতক রয়েছেন।
বড় এ আর্থিক প্রতারণার ঘটনায় ওই বছরের ২৩ জুলাই রাজশাহীর রাজপাড়া থানায় একটি মামলা করা হয়। রাজশাহীর সাইবার ট্রাইব্যুনাল ঘটনাটিকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি), পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) যৌথ দল গঠন করে তদন্ত করতে নির্দেশ দেন। পরে এ ঘটনায় তারা তদন্তে নেমে পাঁচজনকে গ্রেফতার করেন। দীর্ঘ সময়েও এ মামলার কোনো অগ্রগতির কথা জানাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট তিন ইউনিটের কর্মকর্তারা।
মামলাটি এখনো তদন্তাধীন বলে জানিয়েছেন রাজশাহীর রাজপাড়া থানার এসআই শাহ আলম।
দ্রুত অধিক লাভের ফাঁদে পড়ে এমটিএফইতে বিনিয়োগ করেছিলেন রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার মো. মারুফ রহমান মাহিম। বিদেশে পলাতক এমটিএফইর অ্যাম্বাসেডর মুবাশসিরুল ইবাদের সঙ্গে পারিবারিকভাবে পরিচয় ছিল তার। তিনি বলেন, ‘মুবাশসিরুল ইবাদের মাধ্যমে এমটিএফইতে আমি ও পরিবারের সদস্যরা প্রায় ১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে প্রতারিত হই। এ ঘটনায় খিলগাঁও থানায় মামলা করি। এরপর মামলাটির তদন্ত সিআইডিতে যায়। তবে এখনো টাকা উদ্ধারের বিষয়ে কিছু জানায়নি তারা।’
এমটিএফই কানাডায় নিবন্ধিত সংস্থা বলে দাবি কর্তৃপক্ষের। এর কার্যক্রম শ্রীলংকা, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান ও ভারতেও ছড়িয়েছিল। এসব দেশের ব্যবহারকারীদেরও একই পরিণতি হয়েছে। ক্রিপ্টো, বৈদেশিক মুদ্রা, পণ্য, এমনকি বিদেশী স্টক পর্যন্ত নিজের ছায়া প্লাটফর্মে ট্রেড করার সুযোগ দিয়ে এ অ্যাপ সম্প্রতি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। ট্রেডিং থেকে উপার্জন ও অর্থ পরিশোধের কথা বলে এমটিএফই তাদের অ্যাপ ব্যবহারকারীদের সহজ পথে অর্থ আয়ের আমন্ত্রণ জানায়।
বাংলাদেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী এমএলএম ব্যবসা পরিচালনা এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিতে লেনদেন অবৈধ ও নিষিদ্ধ। এর পরও কমপক্ষে ৫০০ ডলার বিনিয়োগ করলে দিন শেষে ৫ হাজার টাকা লাভ হবে এমন চটকদার প্রলোভনে গ্রাহকরা বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। অনেকে গহনা ও মূল্যবান সামগ্রী বন্ধক রেখেও বিনিয়োগ করেছিলেন। অ্যাপের মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিং বা বাইন্যান্সের মাধ্যমে টাকা নিত এমটিএফই। পরে স্থানীয় এজেন্টরা সে অর্থ বাইরে পাচার করত।
বেশ কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুরুতে অ্যাপটিতে কেউ ৫০০ ডলার বিনিয়োগ করলে প্রতিদিন তাকে লাভ দেয়া হতো প্রায় ১৩ ডলার। বিনিয়োগ যত বেশি হতো সে সময় লাভের পরিমাণও তত বেশি দেয়া হতো। বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য মাঝেমধ্যে লোকসানও দেখানো হতো। এজন্য ৫ হাজার, ১০ হাজার, এমনকি ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছেন অনেক গ্রাহক। বিনিয়োগের ওপর সব মিলিয়ে মাসে ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত লাভ পাওয়া যেত। কেউ ৫০১ ডলার বা ৫৮ হাজার টাকা (প্রতি ডলার ১১৬ টাকা ধরে) বিনিয়োগ করলে তার প্রতিদিন লাভ আসত প্রায় ১৩ ডলার বা ১ হাজার ৫০০ টাকা। বিনিয়োগ ৯০১ ডলার বা ১ লাখ ৫ হাজার টাকা হলে প্রতিদিন লাভ পাওয়া যেত প্রায় ৩ হাজার টাকার সমান। কেউ ৫ হাজার ডলার অর্থাৎ ৬ লাখ টাকার মতো বিনিয়োগ করলে প্রতিদিন লাভ আসত প্রায় ৩২ হাজার টাকার সমপরিমাণ। এ লাভ আবার মাঝেমধ্যে দ্বিগুণও করে দেয়া হতো। শুধু বিনিয়োগের ওপর লাভই নয়, কোনো গ্রাহক নতুন কাউকে দিয়ে বিনিয়োগ করাতে পারলে তাকে লাভের ওপর ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশনও দেয়া হতো। এভাবে কারো মাধ্যমে ১০০ গ্রাহক বিনিয়োগ করলে ওই ব্যক্তিকে সিইও পদবিও দেয়া হতো।
রাশেদ নামে এক বিনিয়োগকারী জানান, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় কয়েকশ সিইও পদবিধারী ব্যক্তি ছিলেন কোম্পানিটিতে। তাদের প্রত্যেকের অধীনে ছিলেন আরো কয়েকশ বিনিয়োগকারী। এ পদে এলে আবার তাদের জন্য অফিস নেয়ার বাধ্যবাধকতাও ছিল। অর্থাৎ মূল হোতাদের কোনো অফিস না থাকলেও পদবিধারী সিইওদের দিয়ে তারা অফিস নেয়ার কাজটি করত। রাজধানীসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে এমন কয়েকশ অফিস গড়ে ওঠার তথ্য পাওয়া যায়।
ডিজিটাল পেমেন্ট সুবিধা নিয়ে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশে অ্যাপের মাধ্যমে অবৈধ এমএলএম ব্যবসা পরিচালনা করে এমটিএফই। ২০২৩ সালের আগস্টে এমটিএফই লাপাত্তা হওয়ার দুই সপ্তাহ আগে বিষয়টি আলোচনায় আসে। ততক্ষণে প্রায় ৭০ হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে ১১ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে দাবি ক্ষতিগ্রস্তদের।
আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমএলএমের মাধ্যমে ডেসটিনি-ইউনিপেসহ আরো অনেকেই প্রতারণা করেছে। তবে সে সময় ডিজিটাল পেমেন্টের সুবিধা না থাকায় সরাসরি গিয়ে টাকা জমা দিতে হতো। এক জেলা থেকে অন্য জেলা বা এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে এ ধরনের লেনদেনের ক্ষেত্রে বেশ সময়ের ব্যাপার ছিল। কিন্তু ডিজিটাল পেমেন্টের যুগে টাকা বহন করে নেয়া বা অতিরিক্ত সময় কোনোটিরই প্রয়োজন হচ্ছে না। এ সুযোগই এমটিএফইর অর্থ আত্মসাতের পথ ত্বরান্বিত করেছে। পাশাপাশি এ ধরনের আর্থিক অপরাধের ক্ষেত্রে আগাম শনাক্তকরণ ব্যবস্থা গড়ে না ওঠাকেও এ ধরনের অপরাধ বিস্তারের কারণ হিসেবে মনে করছেন তারা।