সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশ

এনবিআর কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব জমা দিতে হবে

বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, এনবিআরের কর-সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব ও সম্পদ বিবরণী ঘোষণার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের উদ্যোগ নিতে হবে।

সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের বিবরণী জমা দেয়ার বিধান রয়েছে। তবে বিধান থাকলেও অনিশ্চয়তা রয়েছে তা নিয়মিতভাবে জমা এবং দাখিল করা তথ্যের যথার্থতা যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব ও বিবরণী জমা দেয়ার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার সুপারিশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী, পাঁচ বছর পরপর সম্পদের বিবরণী জমা দেয়ার বিধান রয়েছে। তবে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীদের সম্পদের হিসাব জমা দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল।

এমন প্রেক্ষাপটে এনবিআরের কর-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব ও বিবরণী জমা দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার সুপারিশ করেছে বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব দেয়ার নিয়ম নতুন কিছু নয়। এ বিষয়ে সরকারের পুরনো সার্কুলার ও বিধান রয়েছে এবং সরকারি কর্মকর্তারা নিয়ম অনুযায়ী সম্পদের বিবরণী দিয়ে থাকেন। মিটিংয়ে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসায় আমরা বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী প্রতিবেদন চেয়েছি। এনবিআরও সে অনুযায়ী প্রতিবেদন দিয়েছে।’

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব দেয়ার নিয়ম নতুন কিছু নয়। এ বিষয়ে সরকারের পুরনো সার্কুলার ও বিধান রয়েছে। সরকারি কর্মচারীরা নিয়ম অনুযায়ী সম্পদের বিবরণী দিয়ে থাকেন। মিটিংয়ে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসায় আমরা বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী প্রতিবেদন চেয়েছি। এনবিআরও সে অনুযায়ী প্রতিবেদন দিয়েছে —মুশফিকুর রহমান এমপি । সভাপতি, অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি

এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নিয়মিত জমা দেয়ার পাশাপাশি তা যাচাইয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, রাজস্ব আহরণকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ কর প্রশাসনে অনিয়ম-দুর্নীতি শুধু সরকারি রাজস্ব আহরণকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, করদাতাদের মধ্যে অনাস্থা ও কর পরিশোধে অনাগ্রহ তৈরি করতে পারে। এনবিআরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে ওঠা দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সংসদীয় কমিটির সুপারিশকে আরো গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। সম্প্রতি একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা হয়েছে। সংস্থাটির নিজস্ব তদন্তেও অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার তথ্য রয়েছে।

যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহার করে এনবিআরের সহকারী কমিশনার মো. আইয়ুবের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ভারত, চীন, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ায় ভ্রমণের অভিযোগ উঠেছে। রয়েছে অর্থ পাচারের অভিযোগ। এসব অভিযোগ তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনবিআর। এর অংশ হিসেবে গত ১৩ সেপ্টেম্বর অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকার (দক্ষিণ) রাজস্ব কর্মকর্তা মো. সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে কর্মক্ষেত্রে দুর্নীতিসংক্রান্ত কার্যক্রমের প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি এবং শিষ্টাচারবহির্ভূত কথাবার্তার অভিযোগ রয়েছে। বিভাগীয় কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গত ৪ জুন অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে এনবিআরে সংযুক্ত করা হয়।

এনবিআরের নিজস্ব তদন্তেও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার ঘটনা রয়েছে। ফরিদপুর কর অঞ্চলের অতিরিক্ত সহকারী কর কমিশনার মোহাম্মদ মাসুদুর রহমানের বিরুদ্ধে ২০২১-২২ করবর্ষে ট্রাইব্যুনালের আদেশ নিষ্পত্তির সময় আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতিসংক্রান্ত কাজে সহযোগিতার অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এ বিষয়ে অভিযোগ, উভয় পক্ষের বক্তব্য, নথিপত্র ও তথ্যপ্রমাণ পর্যালোচনার পর সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও দুর্নীতিপরায়ণতার অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ১ মার্চ জারি করা প্রজ্ঞাপনে তার বেতন গ্রেড চার ধাপ অবনমিত করার দণ্ড দেয়া হয়। তবে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও লঘুদণ্ড দেয়ার বিষয়টি দুর্নীতি দমনে নেয়া ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এনবিআরের সাবেক সদস্য মতিউর রহমানের বিরুদ্ধেও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে মামলা করেছে দুদক। ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর দায়ের করা মামলায় তার বিরুদ্ধে ৫ কোটি ২৮ লাখ ৭৫ হাজার ৯৩৯ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ১ কোটি ২৭ লাখ ৬৬ হাজার ২১৬ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়। তদন্ত শেষে ২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি দাখিল করা হয় অভিযোগপত্র। একই বছরের ৩ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ আদালতে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে মামলাটির বিচার শুরু হয়। ২০২৪ সালের জুনে তার ছেলের ১৫ লাখ টাকায় ছাগল কেনার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসার পর মতিউর ও তার পরিবারের সম্পদের অনুসন্ধান শুরু হয়।

এনবিআরের অতিরিক্ত কমিশনার কাজী আবু মাহমুদ ফয়সলসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ১৭ কোটি ২১ লাখ ৯৪ হাজার ৩১৮ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে মামলা করেছে দুদক। ২০২৪ সালের জুনে আদালত ফয়সল, তার স্ত্রী ও স্বজনদের ৮৭টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ এবং তাদের নামে-বেনামে থাকা স্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দেন। ওই সময় ফয়সল এনবিআরের প্রথম সচিব ছিলেন।

এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) সাবেক কমিশনার ওয়াহিদা রহমান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ১১ জুন মামলা করে দুদক। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি ও এয়ারটেলের ১৬টি নথিতে মোট ১৫২ কোটি ৮৯ হাজার ৩৯০ টাকার অপরিশোধিত সুদ মওকুফ করেছিলেন। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানায় দুদক। মামলার পর আদালত তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন।

২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে এনবিআরের সদস্য মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুদক মামলা করে। দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, তার সম্পদ বিবরণীতে ৮ কোটি ৮৩ লাখ ১১ হাজার ১৬৬ টাকার সম্পদ দেখানো হলেও যাচাইয়ে ১৩ কোটি ৪৩ লাখ ৩০ হাজার ৮৭৯ টাকার সম্পদ পাওয়া যায়। এতে ৪ কোটি ৬০ লাখ ১৯ হাজার ৭১৩ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন এবং ৪ কোটি ৯৭ লাখ ৫১ হাজার ৩৯৬ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। মামলার পর ২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর তাকে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিল ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট পদে পদায়ন করা হয়। পরদিনই তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়।

এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ঘুস গ্রহণ, কর ফাঁকিতে সহায়তা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নতুন নয়। এসব অনিয়মের ব্যাপকতা উঠে এসেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায়। সংস্থাটির জরিপে অংশ নেয়া কোম্পানিগুলোর প্রায় ৪৫ শতাংশ জানিয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে কর-সংক্রান্ত সেবা নিতে গিয়ে তারা কর কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ঘুসের দাবি পেয়েছে। একই জরিপে ৭৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান কর কর্মকর্তাদের জবাবদিহির ঘাটতিকে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ৭২ শতাংশের মতে, কর প্রশাসনে দুর্নীতি ব্যাপক। এছাড়া ৬৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান কর কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রদেয় করের পরিমাণ নির্ধারণ নিয়ে নিয়মিত বিরোধের কথা জানিয়েছে।

সিপিডির মতে, এসব অনিয়ম ও জবাবদিহির ঘাটতি কর প্রশাসনে স্বচ্ছতার সংকট তৈরি করছে এবং ব্যবসায় করের বাইরে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

এ অবস্থায় এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের বিবরণী নিয়মিত জমা দেয়ার পাশাপাশি তা যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সম্পদের হিসাব দেয়ার বিষয়টিকে আমি ইতিবাচকভাবেই দেখছি। নিয়মিতভাবে সম্পদের হিসাব জমা দেয়া এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ভালো উদ্যোগ। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ কমবে এবং তারা নিজেদের স্বচ্ছতাও তুলে ধরতে পারবেন। তবে শুধু হিসাব জমা দেয়া শেষ কথা নয়। প্রথম ধাপ হচ্ছে নিয়মিতভাবে সম্পদের বিবরণী জমা দেয়া। এরপর অন্য করদাতাদের ক্ষেত্রে যেমন দৈবচয়নের ভিত্তিতে সম্পদের হিসাব নিরীক্ষাসহ বিভিন্ন ধরনের যাচাই হয়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের নিয়ম প্রযোজ্য হলে মানুষের আস্থা আরো বাড়বে। এতে কারা সঠিকভাবে সম্পদের হিসাব দিচ্ছেন এবং কারো হিসাবে অসংগতি আছে কিনা, সেটিও বোঝা যাবে।’

এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নিয়ে সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় গত ২৩ আগস্ট। বৈঠকে কমিটির সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য মো. সাইফুল আলম এনবিআরের কর-সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা-কর্মচারী, এনবিআর চেয়ারম্যান এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব ও সম্পদ বিবরণী ঘোষণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। কর ফাঁকি রোধ এবং কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বিষয়টি নীতিগতভাবে বিবেচনার প্রস্তাব দেন তিনি।

বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, এনবিআরের কর-সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব ও সম্পদ বিবরণী ঘোষণার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের উদ্যোগ নিতে হবে।

পরবর্তী সময়ে গত ৫ সেপ্টেম্বর স্থায়ী কমিটির তৃতীয় সভায় আগের সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে প্রতিবেদন দেয় এনবিআর। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী এনবিআরের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা সম্পদের বিবরণী দাখিল করেছেন। সরকারের পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী বছরগুলোতেও কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পরিবারের সদস্যদের সম্পদের বিবরণী দাখিলের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বৈঠকে এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিব ও সদস্য মো. আজিজুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানতে বণিক বার্তার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে এনবিআরের মোট জনবল ছিল ১৬ হাজার ৩৫৯ জন। এর বাইরে ট্যাকসেস আপিলাত ট্রাইব্যুনালে ৭৪ জন এবং কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালে ৪৭ জন জনবল রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে এনবিআরের পুঞ্জীভূত বিভাগীয় মামলার সংখ্যা ছিল ১১৯। ওই সময়ে ৪ জনকে চাকরিচ্যুত, তিনজনকে অব্যাহতি এবং ৩৯ জনকে অন্যান্য দণ্ডসহ মোট ৪৬টি মামলা নিষ্পত্তি করা হয়।

এনবিআর-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের তথ্য যাচাইয়ের বিষয়টি একসময় মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে তদারক করা হতো। তবে এনবিআরের আপত্তির কারণে একপর্যায়ে তা বন্ধ হয়ে যায়। সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী পাঁচ বছর পরপর সম্পদের হিসাব দেয়ার বিধান থাকলেও ২০২৪ সালের আগস্টে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতি বছর সম্পদের বিবরণী জমা দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়। তখন ঘোষণা দেয়া হয়, ২০২৫ সাল থেকে প্রতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সব সরকারি চাকরিজীবীকে সম্পদের হিসাব জমা দিতে হবে।

২০২৪ সালের সম্পদের তথ্য জমা দেয়ার জন্য প্রথমে ওই বছরের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত করা হয়। সে সময় অনেক সরকারি কর্মচারী সম্পদের তথ্য জমা দেন। তবে এসব সম্পদের হিসাব যাচাই বা নিরীক্ষা করে যথার্থতা খতিয়ে দেখা হবে কিনা, সে বিষয়ে নির্দেশনা না থাকায় জমা দেয়া বিবরণীর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ অবস্থায় প্রতি বছর সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব জমা দেয়ার বিষয়টিকে স্থায়ী প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনার তাগিদ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দিষ্ট সময় পরপর সম্পদের হিসাব দেয়ার বিধান আগে থেকেই রয়েছে। কিন্তু শুধু বিবরণী জমা দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তথ্যে কোনো অসংগতি আছে কিনা কিংবা সম্পদের হিসাব গোপন করা হয়েছে কিনা—এসব যাচাইয়েরও একটি কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।’

রাজস্ব বোর্ডের মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ আরো বলেন, ‘কর কর্মকর্তারা অন্যদের সম্পদ ও আয় যাচাই করেন। তাই তাদের নিজেদের সম্পদের হিসাব যথাযথভাবে যাচাই হচ্ছে কিনা, সে বিষয়ে একটি স্বয়ংক্রিয় ও স্বাধীন ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এতে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে এবং দুর্নীতির সুযোগও কমবে। তাই এটিকে কোনো বিশেষ সরকারের সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে একটি স্থায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।’

সম্পদের হিসাব জমা দেয়া ও তা যাচাইয়ের প্রশ্নের পাশাপাশি এনবিআরের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নিয়েও সংস্কার আলোচনা চলছে। বাংলাদেশে এনবিআর একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ ও করনীতি প্রণয়নের দায়িত্ব পালন করে। স্বার্থের সংঘাত এড়াতে বিশ্বের অনেক দেশ করনীতি প্রণয়ন ও সংগ্রহের কার্যক্রম পৃথক করেছে। বাংলাদেশেও ২০০৭-০৮ সালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, যদিও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

পরবর্তী সময়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার রাজস্ব প্রশাসন সংস্কারের অংশ হিসেবে করনীতি ও কর সংগ্রহের কার্যক্রম আলাদা করার উদ্যোগ নেয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের মতো বহুজাতিক সংস্থাও এ সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় গত বছর রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে দুটি স্বতন্ত্র বিভাগ গঠনের প্রস্তাবসংবলিত অধ্যাদেশ জারি করা হয়। তবে এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনের মুখে পরে অধ্যাদেশটিতে সংশোধন আনা হয়।

বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত অধ্যাদেশটি যাচাই-বাছাই করে নতুনভাবে উত্থাপনের লক্ষ্যে গত এপ্রিলে একটি সুপারিশ প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহকে প্রধান করে গঠিত নয় সদস্যের কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরসহ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিবরা রয়েছেন। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব এ কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

আগের অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করে আরো কার্যকর ও প্রয়োগযোগ্য করে নতুন বিল উত্থাপনের বিষয়ে সুপারিশ দেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে কমিটিকে। রাজস্ব প্রশাসনের কাঠামোগত সংস্কারের এ উদ্যোগের পাশাপাশি এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নিয়মিত জমা ও স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা গেলে কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা জোরদার হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও