তেতাল্লিশের মন্বন্তর। চারদিকে শুধু মৃত্যুর মিছিল। ব্রিটিশ সরকারের হিসাবেই খাবারের অভাব ও রোগে ভুগে মৃতের সংখ্যা ২০ লাখ। আর্তের চিৎকারে ভারী রাস্তার দুই পাশ। শুরু হয় দুর্ভিক্ষের কারণ অনুসন্ধান। সে সূত্র ধরে স্যার জন উডহেডের নেতৃত্বে ১৯৪৫ সালে প্রকাশিত হয় তদন্ত প্রতিবেদন। প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয় মন্বন্তরের আদ্যোপান্ত। দাবি করা হয়: বাংলায় কৃষিজমির পরিমাণ ২ কোটি ৯০ লাখ একর। কিছু জমিতে আবার বছরে কয়েকবার চাষ করা হয়। বিভিন্ন ধরনের ফসল মিলিয়ে সামগ্রিকভাবে আবাদি জমির আকার দাঁড়ায় সাড়ে তিন কোটি একর। এ জনপদের প্রধান উৎপাদিত ফসল ধান, যা আবাদ হয় প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ একর জমিতে। সত্যি বলতে বাংলাকে ‘চাল উৎপাদনকারী ও ভাতভোজীর দেশ’ হিসেবে আখ্যা দেয়া যায়। (ফেমিন ইনকোয়ারি কমিশন, রিপোর্ট অন বেঙ্গল, পৃষ্ঠা-৫)
ব্রিটিশ সরকার মন্বন্তরকে কীভাবে বুঝেছে সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ; তবে প্রতিবেদনে বাংলাকে ‘A land of rice growers and rice eaters’ হিসেবে নামকরণ করাটা ছিল বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বঙ্গীয় জনপদের পাশে এ অভিধা কেবল ঔপনিবেশিক সময়ের জন্য নয়; প্রাচীনকাল থেকেই সত্য। আবহমানকাল থেকেই বাংলার সঙ্গে ধান ও ভাতের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। বাংলা কৃষিপ্রধান, আর সেই কৃষিপ্রধান বলতে মূলত ধানপ্রধান হওয়াকেই বোঝায়। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে ঐতিহাসিকতার দিক থেকে বাংলার পার্থক্যও এখানে। কারণ এ কথা সত্য যে মিঠা পানির উৎসই সভ্যতা গড়ে ওঠার ভিত তৈরি করে। বিশ্বের বড় সভ্যতা মিঠা পানিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। কারণ মিঠা পানির নিকটবর্তী বসবাস করা কৃষির জন্য অনুকূল। তবে বঙ্গীয় জনপদের জন্য সে আখ্যান এগিয়েছে অনেক দূর। নদীতীরে দাঁড়িয়ে বাংলা হয়ে উঠেছে ধানের দেশ। বছরে দু-তিনবার ধান চাষের মৌসুমকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে এখানকার মানুষের জীবনাচার। পরিণত হয়েছে এখানকার নারী ও পুরুষের প্রাত্যহিক ব্যস্ততায়। ধানের বীজ বপন, ধান কাটা, মাড়াই ও নতুন চালের ভাত খাওয়ার দিনকে মানুষ উদযাপন করেছে। এভাবে ধান নির্ধারণ করে দিয়েছে সংস্কৃতির গতিপথও। জারি হয়েছে এখানকার উৎসব ও পার্বণের রেওয়াজ। কোনো অদৃশ্য দেবতার পাত থেকে মেহমান আপ্যায়ন পর্যন্ত থেকেছে ভাতের উপস্থিতি। কিন্তু ধান তো কেবল ভাতেই সীমাবদ্ধ নয়। ভাতের বাইরেও বাঙালির খাদ্যোপাদানের অধিকাংশই আসে ধান থেকে।
বাংলাকে বলা হয় স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ অর্থনীতির অঞ্চল। প্রত্যেকটা গ্রাম কাজ করেছে স্বতন্ত্র ইউনিট আকারে। সে গ্রামের ভেতরের সব অর্থনৈতিক কাজকর্মের কেন্দ্রে ছিল কৃষি। ভূমি মালিক ধান চাষের জন্য ভূমি বর্গা দিয়েছেন, ভূমিহীন কৃষক তা আবাদ করেছেন। বেনিয়ারা যখন নানা পণ্য বিক্রি করতে আসতেন, তাদের মূল্যও পরিশোধ করা হয়েছে ধানের মাধ্যমে। এভাবে ধানের ওপর একচ্ছত্র নির্ভরতার জন্য জনগোষ্ঠীর এ ফ্রন্ট ছিল অপেক্ষাকৃত সংবেদনশীল। ইতিহাসের ঠিক যখনই বাংলায় ধান উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে, তখনই খাদ্য সংকটে পড়েছে মানুষ। দেখা দিয়েছে মন্বন্তর। তৈরি হয়েছে জন-অসন্তোষ। সেই জন-অসন্তোষই নির্ধারণ করে দিয়েছে পরবর্তী রাজনীতির ভাগ্য। ইতিহাসে বাংলাকে বিদ্রোহের নগরী বলা হয়। সে বিদ্রোহে খাদ্যের হিস্যা কতটুকু, সেটা গবেষণার দাবি রাখে। বাংলার হাল ইতিহাসে তিন বড় দুর্ভিক্ষ ১৭৭০, ১৯৪৩ ও ১৯৭৪ সালে; দুর্ভিক্ষগুলোর পর এখানকার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনই প্রমাণ করে বাঙালির রাজনৈতিক চেতনায় ভাতের প্রাসঙ্গিকতা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাংলার শাসকরা এখানকার ধাননির্ভরতার দিকটায় সে অর্থে মনোযোগ দেননি। ফলে একিলিস হিলের মতো অনিশ্চয়তা থেকে গেছে জনপদের খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্নে। সব রকমের অগ্রগতির পরও ধান ও বাঙালির সম্পর্কের দিক যেন প্রায় উপেক্ষিত।
ধান চাষের ইতিহাস পুরনো। বিশেষ করে দক্ষিণ চীন, ভারত ও ইন্দোনেশিয়া অঞ্চলের সঙ্গে ধানের ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভারত ও চীনকে কেন্দ্র করে চাষ ব্যবস্থায় যে ক্রম অগ্রগতি, সেটা পরবর্তী সময়ে ছড়িয়ে পড়েছে কোরিয়া, জাপান, ফিলিপাইন, শ্রীলংকা ও ইন্দোনেশিয়ায়। প্রত্নতাত্ত্বিকরা চীনের ইয়াংজি নদীর উপত্যকা, থাইল্যান্ডের স্পিরিট গুহা, ভারতের উত্তর প্রদেশের কোলদিয়া ও কোরিয়ার সরোরিতে ধান চাষের আদি নিদর্শন খুঁজে পেয়েছেন। ধান চাষের প্রাচীন ভূমির মধ্যে বাঙালি অধ্যুষিত ব্রহ্মপুত্র ও গাঙ্গেয় অববাহিকার নিম্নভূমি অন্যতম। তাই ধানবৈচিত্র্য বাঙালিদের ঐতিহ্য ও কৃষ্টির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার নজির বাংলার ইতিহাস ঘাঁটলেও দেখা যায়। প্রাচীন পূর্ব বাংলার মহাস্থানে খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৩০০ অব্দে এবং উয়ারী-বটেশ্বরে ৪০০-৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ধান চাষের প্রমাণ পাওয়া যায়। সত্যি বলতে, এ বদ্বীপে চাষের প্রথম শস্য ধান। এ ধান চাষকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়েছে স্থানীয় সভ্যতা। প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে যেমন ধান চাষের প্রমাণ মেলে, তেমনি বাংলা ভাষার প্রথম রচনা চর্যাপদেও রয়েছে ধানের কথা। মধ্যযুগের সাহিত্যেও রয়েছে হরেক কিসিমের ধান বা ভাতের উল্লেখ। ধান যে বাংলার খাদ্যতালিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী!
গবেষকদের অনেকের ধারণা, ধানচাষী একদল কৃষক বঙ্গীয় বদ্বীপের পূর্বাংশে প্রাচীন অতীতে প্রথম স্থায়ী বসতি গড়ে তুলেছিলেন। এ অঞ্চলে সহজলভ্য বুনো ধান (নিভারা) তারা সংগ্রহ করতেন, পাশাপাশি তাদের সঙ্গে করে নিয়ে আসা ধান স্বল্প পরিসরে চাষাবাদের মাধ্যমে খাদ্য চাহিদা পূরণ করতেন। এ এলাকায় সিনো-তিব্বতীয় ভাষাগোষ্ঠীর মানুষও বসবাস করে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক, আর্কিওবোটানিস্ট ও বর্তমানে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণারত মিজানুর রহমান তার এক গবেষণায় জানান, এরা ছিলেন চাইনিজ জাপোনিকা জাতের ধানচাষী।
ধানের দেশ বাংলার সমৃদ্ধি ও সংকটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধান চাষের সাফল্য ও ব্যর্থতা। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে মহাস্থানগড়ের শিলালিপিতে বঙ্গীয় অঞ্চলের সর্বপ্রাচীন দুর্ভিক্ষের চিহ্ন পাওয়া যায়। এ লিপিতে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে অধস্তন কর্মকর্তাদের প্রতি ধান মাড়াইয়ের মৌসুমে বিপন্ন এলাকায় ধান সরবরাহের এবং তা মুদ্রায় পরিশোধের নির্দেশ দেয়া হয়। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে বাংলার যে দুর্ভিক্ষ, তার সঙ্গেও ধানের যোগাযোগ ছিল স্পষ্ট।
ঔপনিবেশিক যুগে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামক দুর্ভিক্ষ ঘটেছিল বাংলা ১১৭৬ সালে, তথা ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে। সে বছর অত্যধিক বৃষ্টিপাত ও বন্যার গ্রাস থেকে কৃষক ফসল তথা ধান ঘরে তুলতে পারেননি। পরিস্থিতির অবনতি ঘটে ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা এবং খাদ্যবাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের ফলে। কোম্পানি শাসনের সহযোগিতায় খাদ্যশস্যের বাজার থেকে মুনাফা লুট এবং অতিরিক্ত রাজস্ব আহরণের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার কারণে জনমানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছে। পরিণতিতে মারাত্মক দুর্ভিক্ষপীড়িত এলাকাগুলো হয়ে পড়ে জনশূন্য। কৃষি উৎপাদন আর রাজস্ব আদায় অনুরূপ হারে কমে যায়।
১৮৮৬ সালেও বাংলার কিছু এলাকায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যখন প্রধান ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল ছিল ওড়িশা। এবারো সংকট ধানকে ঘিরেই। একে তো উৎপাদন ভালো হয়নি, অন্যদিকে দুর্ভিক্ষপীড়িত অঞ্চলগুলোয় কৃষি শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি অত্যন্ত কমে। এই প্রথমবারের মতো দুর্ভিক্ষের কারণ খতিয়ে দেখা এবং সমাধানসূচক পরামর্শের জন্য বর্ধিত ক্ষমতাসহ ফেমিন কমিশন নামে একটি কমিশন গঠন করা হয়।
১৮৯৬-৯৮ সালে ফের দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত হয় বাংলা। প্রাথমিক কারণ ছিল অনাবৃষ্টির সূত্র ধরে ধানের উৎপাদনে বড় ধাক্কা। বাজারে খাদ্য সরবরাহ থাকলেও তা ছিল সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে, কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষেরই কোনো ক্রয়ক্ষমতা ছিল না। খাদ্যশস্যের মূল্য বহুগুণ বেড়ে গেলেও সরকারের দিক থেকে তা নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ ছিল না। ১৮৯৭ সালের ডিসেম্বরে স্যার জেবি লায়ালের নেতৃত্বে একটি ফেমিন কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনের পর্যবেক্ষণে জানা যায়, ২০ বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বাড়লেও কৃষি শ্রমিক-পেশাজীবীদের মজুরি সে অনুপাতে বাড়েনি।
১৯৪৩ সালে বাংলা আরেকটি বড় দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে। ১৯৩৮ সাল থেকে একনাগাড়ে ফসল তথা ধান উৎপাদন ব্যাহত হয়। সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও অনুষঙ্গী আরো কিছু ধ্বংসাত্মক ঘটনা বাংলাকে দুর্ভিক্ষে ফেলে। জাপানিদের হাতে বার্মার পতন ঘটার পর সেখান থেকে খাদ্যশস্যের আমদানি বন্ধ এবং পূর্বাঞ্চলে যুদ্ধাবস্থার কারণে বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটায় দুর্ভিক্ষ ত্বরান্বিত হয়। সেনাবাহিনীর জন্য খাদ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়া, শরণার্থী আগমন ও প্রশাসনের দূরদৃষ্টিহীনতা দুর্ভিক্ষকে আরো ভয়াবহ করে তোলে। খাদ্যশস্যের মূল্যবৃদ্ধি একই সঙ্গে দুর্ভিক্ষের কারণ ও প্রতিফল। মজুদদারি ও মুনাফা লাভের প্রবণতা খাদ্যশস্যের আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধির কারণ। দুর্ভিক্ষে বিপুলসংখ্যক মানুষ মৃত্যুবরণ করে। প্রায় সমগ্র বাংলাদেশেই এ দুর্ভিক্ষ আঘাত হেনেছিল। কিন্তু লক্ষণীয়, এক বিরাটসংখ্যক নিরাশ্রয় মানুষ যারা অনাহারে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করে, তাদের মধ্যে একজনও কলকাতাবাসী ছিল না। খাদ্যের সন্ধানে গ্রামগঞ্জ থেকে ছুটে আসা অনাহারী মানুষই নগরে এসে প্রাণ ত্যাগ করেছিল। এতে প্রমাণিত হয় গ্রামীণ জনপদ অধিক মর্মন্তুদ দুর্বিপাকে পড়েছিল। সে দুর্বিপাকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় খুলনা, ফরিদপুর, যশোর, চট্টগ্রাম, ত্রিপুরা, ঢাকা, নোয়াখালী অঞ্চলের মানুষ। এত বড় অভিঘাতে কিন্তু বাংলার তৎকালীন রাজনৈতিক ব্যক্তিরা দায় এড়াতে পারেন না। ১৯৩৭-৪৭ সাল পর্যন্ত বাংলায় রাজনীতির নিয়ন্তা ছিলেন বাংলার নেতারাই। অথচ তেতাল্লিশে বাংলা যখন মন্বন্তরে বিপর্যস্ত, তখন ব্রিটিশ শাসিত অন্যান্য অঞ্চলে অত বড় কোনো অভিঘাত দেখা যায় না। বরং বাংলার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ফজলুল হকের সরকার ও পরবর্তী খাজা নাজিমুদ্দিনের সরকার মন্বন্তরের জন্য একে অন্যকে দোষারোপ করে চলেছে। দুর্নীতি ও নীতিগত ব্যর্থতার অভিযোগ চাপিয়েছে এক পক্ষ অন্য পক্ষের ওপর। বিশেষ করে ফরিদপুর জেলার রাজনীতিতে স্বজনপ্রীতির প্রভাব ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ফরিদপুরের প্রধান চারজন পাইকারি ব্যবসায়ীর একজন ছিলেন মো. আইয়ুব আলি, তিনি ছিলেন ফরিদপুর জেলা মুসলিম লীগ সেক্রেটারি মৌলভি আবদুস সালাম খানের আত্মীয়। এভাবে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির মধ্য দিয়ে বাংলার খাদ্য ব্যবস্থাপনায় যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, তা মন্বন্তরের পেছনে কম ভূমিকা রাখেনি।
১৯৭৪ সালে বাংলাদেশকে আরো এক দুর্ভিক্ষের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। দুর্ভিক্ষের মুখ্য কারণ মারাত্মক বন্যার মুখোমুখি দুর্বল খাদ্য বণ্টন ব্যবস্থাপনা। ১৯৭১ সালের পর প্রধানত মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বিধ্বস্ত অর্থনীতি ও সামাজিক বিপর্যয়ের কারণে দেশের ব্যাপকসংখ্যক মানুষের জীবনযাত্রার মান নিচে নেমে যায়। চরম অবস্থার শিকার হয়েছিল শিল্প শ্রমিক, ক্ষুদ্র কৃষক, কৃষি শ্রমিক ও নিম্ন বেতনভুক্ত মানুষ। স্বাধীনতার পর ঘূর্ণিঝড়, খরা ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ব্যাহত হয় ধান উৎপাদন। তার সঙ্গে যুক্ত হয় দুর্বল প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক মুদ্রাস্ফীতি এবং বিশ্বব্যাপী খাদ্য, সার ও তেল সংকট। যা আর্থসামাজিক বৈষম্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দুর্ভিক্ষকে প্রবল করে। এ সময়ে দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কারণেও দুর্ভিক্ষ মারাত্মক রূপ নেয়। ১৯৭৪ সালের জানুয়ারিতেই দেখা দেয় অনাহারে মৃত্যুর ঘটনা। বছরের মধ্যভাগে কিছু লঙ্গরখানা চালু করে অন্নহীন মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়। এ বছরের সেপ্টেম্বর নাগাদ অবস্থা চরমে পৌঁছে। দুর্ভিক্ষের চিত্র ছিল ১৮৬৬, ১৯৪৩ ও ১৯৭০ সালের দুর্ভিক্ষের মতোই ভয়াবহ। খাদ্যের সন্ধানে গ্রামের মানুষ শহরে ভিড় জমায়, বহু পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং গ্রাম থেকে মূলোৎপাটিত হয়। ব্যাপকসংখ্যক মানুষ দুমুঠো খাওয়ার জন্য ভিটেমাটি ও সর্বস্ব বিক্রি করতে বাধ্য হয়। এমন পরিস্থিতিতেই কবি রফিক আজাদের কলম থেকে বের হয়েছিল, ‘ভাত দে হারামজাদা, তা না হলে মানচিত্র খাবো।’
ছিয়াত্তরের মন্বন্তর তথা ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে যে দুর্ভিক্ষ হয়, তা ব্রিটিশ সরকারকে শাসন কাঠামো নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। তিন বছর পরেই ১৭৭৩ সাল থেকে প্রবর্তিত হয় গভর্নর জেনারেল ব্যবস্থা। প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসেবে আসেন ওয়ারেন হেস্টিংস। ১৯৪৩ সালের মন্বন্তর ব্যাপকভাবে ভূমিকা রেখেছে ১৯৪৭ সালের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণে। সবিশেষ ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ তৎকালীন সরকারকে অজনপ্রিয় করে তোলে, যা ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের রাস্তা তৈরি করছিল।
দুর্ভিক্ষের প্রধান ভুক্তভোগী বাংলার অন্ত্যজ ও কৃষিজীবী শ্রেণী। ধানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ওতপ্রোত। দুঃখজনকভাবে বাংলার গত আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসে কোনো রাজনৈতিক শক্তি এদিকটার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। তাদের ব্যস্ততা জুড়ে ছিল নগর। ফলে ধানে সমৃদ্ধ বাংলার মানুষ ভাতের অভাবে মারা গেছে বারবার। দুর্ভিক্ষের কাছে অরক্ষিত হয়ে থেকেছে, যেভাবে অদৃশ্য শত্রুর সামনে অরক্ষিত থাকে দুর্গ। বাংলার জানা ইতিহাসে ধানের সঙ্গে মানুষের বসবাস আড়াই হাজার বছরের। এ সময়ের মধ্যে ধানের সংস্থানে নির্ভর করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে বহুবার। কিন্তু আজ পর্যন্ত ধানের দেশে মানুষের ভাতের সংস্থান নিয়ে সেভাবে চিন্তা হয়নি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি) প্রকাশিত প্রতিবেদন তার বড় প্রমাণ। জরিপ বলছে, বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে ২০ শতাংশ মানুষ। সিলেট ও বরিশাল অঞ্চলে এ হার সবচেয়ে বেশি, ২৪ শতাংশ। এমনকি দেশের রাজধানী ঢাকায় খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার হার ১৭ শতাংশ। প্রতিবেদনের দাবি, দেশের সাম্প্রতিক বন্যায় কৃষি ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে প্রয়োজনীয় খাদ্যসংস্থান করতে পারছে না প্রতি ১০ জনের তিনজন বা ৩০ শতাংশ। নিম্ন আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এ হার প্রায় ৩৬ শতাংশ। খাদ্য ব্যয় সংকোচনমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে ২৯ শতাংশ মানুষ। আর সার্বিক জীবন-জীবিকায় ব্যয় সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে ৭১ শতাংশ মানুষ। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে প্রয়োজনের চেয়ে কম খাদ্য গ্রহণ করছে দেশের ৩০ শতাংশ মানুষ। খাদ্যের এ নিরাপত্তার প্রশ্নটি দিন শেষে ভাতের নিরাপত্তার প্রশ্ন। কারণ দেশের যে অংশটি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, তাদের প্রধান খাদ্যই ভাত। দেশের আট বিভাগের ১ হাজার ২০০ মানুষের ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে ডব্লিউএফপি। তাতে যেন বঙ্গীয় জনপদের ইতিহাসে চিরকাল ধরে থাকা সংকটটিই আরেকবার চিহ্নিত হয়েছে।
জুলাই-আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পটভূমি নতুনভাবে বিন্যস্ত হয়েছে। সামনে আসছে নতুন অনেক ইশতেহার ও সংস্কার প্রস্তাব। নতুন পরিস্থিতিতে দেখা দিয়েছে খাদ্যনিরাপত্তার চিরকালীন প্রসঙ্গ। একটা জনপদের অগ্রগতি ও প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক শর্ত খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্ন সমাধান। যখন জনগোষ্ঠীর বড় অংশই খাদ্যের সংস্থানে অনিশ্চয়তায় বসবাস করে, সামগ্রিক উন্নতির আলোচনা সেখানে ফিকে হয়ে যায়। প্রশ্নবিদ্ধ হয় আদর্শিক উত্তরণের প্রস্তাব।