হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে শুরু করে জরুরি বিভাগ ও আন্তঃবিভাগের প্রতিটি ওয়ার্ডে ছড়িয়ে রয়েছে তাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। রোগীদের প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠিয়ে চালানো হচ্ছে অনৈতিক কমিশন বাণিজ্য। ফলে স্বল্প মূল্যের সরকারি চিকিৎসাসেবা থেকে প্রতিদিন বঞ্চিত হচ্ছেন শত শত সেবাপ্রার্থী।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হাসপাতালে চিকিৎসকরা বসার আগেই সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে বহির্বিভাগের কক্ষে অবস্থান নেন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের এসব দালাল সদস্যরা। বহির্বিভাগের চিকিৎসকদের দেয়া প্রেসক্রিপশনে পাঁচ-ছয়টি পরীক্ষা লেখা থাকে। যেগুলোর বেশির ভাগ হাসপাতালেই সম্ভব। তবে এমন একটি পরীক্ষা থাকে, যেটা বাইরে থেকে করাতে হবে। তারা রোগীদের সব পরীক্ষা এক জায়গা থেকে করানোর সুবিধার কথা বলে নির্দিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের টোকেন ধরিয়ে দেন। ফলে রোগীরা দালালদের খপ্পরে পড়ে সব পরীক্ষাই বাইরে থেকে করাতে বাধ্য হন।
অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের ভেতরের এ কমিশন বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন কিছু অসাধু চিকিৎসক, কর্মচারী, আউটসোর্সিং স্টাফ ও অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসায়ীরা। এমনকি অনেক চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী এসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক বা অংশীদার।
জানা গেছে, হাসপাতালে কমিশন লেনদেনের জন্য ব্যবহার করা হয় ভিন্ন নাম। দালালদের বলা হয় ‘এজেন্ট’। হৃদরোগের পরীক্ষার কমিশনকে বলা হয় ‘কনসালট্যান্ট ফি’। আর প্রেসক্রিপশন লেখার জন্য চিকিৎসকদের কমিশনকে বলা হয় ‘রেফারেল ফি’।
চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা জানান, হাসপাতালের ভেতরেই নমুনা সংগ্রহ করে বাইরের প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। পরে দালালরাই পরীক্ষার রিপোর্ট পৌঁছে দেয়। বিনিময়ে অতিরিক্ত অর্থ নেয়া হয়। তাদের খুমেক হাসপাতালকে কেন্দ্র করে গেটের সামনে থেকে বয়রা পূজাখোলা এবং সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল পর্যন্ত এলাকায় ২৫-৩০টি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্যই সরকারি হাসপাতালের রোগী ভাগিয়ে নেয়া। এ কাজে অন্তত দুই শতাধিক দালাল সক্রিয় রয়েছে।
টিকিট কাউন্টার ও ওয়ার্ডের সামনে অবস্থান নিয়ে দালালরা রোগীদের সঙ্গে আত্মীয়ের মতো কথা বলে। বিশেষ ব্যবস্থায় অভিজ্ঞ চিকিৎসক দেখানো ও দ্রুত চিকিৎসার প্রলোভন দিয়ে বাইরে নিয়ে যায়। এমনকি নির্দিষ্ট ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনতে বাধ্য করে। পরিচয় গোপন করে কয়েকজন দালালের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, এ চক্রে নারী সদস্যরাও রয়েছে। তারা এ কাজে আরো পারদর্শী। পরীক্ষার বিলের ওপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট কমিশন দেয়া হয়।
অথচ হাসপাতালে প্যাথলজি বিভাগ রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে। ট্রোপোনিন ও থাইরয়েডের টিএসএইচসহ প্রায় ৪০ ধরনের পরীক্ষা সরকারিভাবে কম খরচে করা সম্ভব। কিন্তু অসাধু চক্রের কারণে রোগীরা এ সুবিধা পাচ্ছেন না।
খুলনা সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি কুদরত-ই-খুদা বলেন, ‘বর্তমানে চিকিৎসাসেবা বড় বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোয় সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা প্রভাবিত হন। অধিকাংশ চিকিৎসকই একাধিক ক্লিনিকে চুক্তিবদ্ধ। অনেক চিকিৎসক আবার নিজেরাই হাসপাতাল, ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এদের বিরুদ্ধে সরকারিভাবে মনিটরিং এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেই।’
খুলনা নাগরিক সমাজের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করলে দালাল চক্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। কিন্তু কমিশন বাণিজ্যের কারণে তা সম্ভব হয় না। এটাই বাস্তবতা।’ এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কয়েকজন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক এবং ব্যবস্থাপক খুমেক হাসপাতালের চিকিৎসকদের কমিশন বাণিজ্যে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন।
এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক কাজী আইনুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দালাল চক্র রোগীদের ভুল বুঝিয়ে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসার প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যায়।’
হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মচারীরা দালাল চক্র ও কমিশন বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকদের কক্ষ থেকে রোগীদের টোকেন দেয়ার বিষয়ে জানা নেই। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে হাসপাতাল প্রশাসন দালাল নির্মূলে কাজ করছে।’