হিমালয় পর্বতমালায় অবস্থিত বিশ্বের দশম সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ অন্নপূর্ণা-১, যার উচ্চতা ৮ হাজার ৯১ মিটার। এই পর্বতের প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে চূড়ায় লাল-সবুজের পতাকা ওড়ালেন চট্টগ্রামের বাবর আলী।
আজ সোমবার (৭ এপ্রিল) সকালে পর্বতশৃঙ্গে পৌঁছান তিনি। তার সঙ্গে আছেন গাইড ফুর্বা অংগেল শেরপা। গণমাধ্যমকে খবরটি নিশ্চিত করেছেন অভিযানের ব্যবস্থাপক ফরহান জামান ও নেপালের অভিযান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান মাকালু অ্যাডভেঞ্চারের স্বত্বাধিকারী মোহন লামসাল।
বাবর আলী পেশায় একজন চিকিৎসক। একই সঙ্গে তিনি চট্টগ্রামভিত্তিক পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিকাল ড্রিমার্সের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক। আজ দুপুরে তার প্রতিষ্ঠানের এক ফেসবুক পোস্টে জানানো হয়, লাখো শুভাকাঙ্ক্ষীর প্রার্থনার উত্তর দিয়েছেন স্রষ্টা। প্রকৃতিমাতা বিমুখ হননি। বঙ্গ সন্তান বাবরকে ক্ষণিকের জন্য নিজের চূড়ায় দাঁড়াতে দিয়েছে অন্নপূর্ণা। বিশ্বের দশম শীর্ষ পর্বত এবং অন্যতম কঠিন পর্বত ২৬ হাজার ৫৪৫ ফুট উচ্চতার অন্নপূর্ণা-১ এর শীর্ষে প্রথমবার উড়ল আমাদের লাল-সবুজের পতাকা।
এতে আরো বলা হয়, খানিক আগে আউটফিটার কোম্পানির স্বত্বাধিকারী আমাদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। আরো জানা গেছে, বাবর আলী সুস্থাবস্থায় ক্যাম্প-৩ এ নেমে এসেছেন। যুদ্ধ এখানেই শেষ নয়। বাবরকে আজ নেমে আসতে হবে ক্যাম্প-২ এর নিরাপত্তায়। আর আগামীকাল নামতে হবে বেসক্যাম্পে।... বাবরের নিরাপদ অবতরণের জন্য চলুক প্রার্থনা। এরপরই হবে উৎসব।
নেপালের গন্ডকিতে অবস্থিত অন্নপূর্ণা পর্বত স্থানীয়দের কাছে ফসলের দেবী হিসেবে পূজনীয়। এর মূলত চারটি চূড়া আছে, যার মধ্যে শীর্ষ হলো পৃথিবীর দশম শীর্ষ পর্বত ৮ হাজার ৯১ মিটার (২৬ হাজার ৫৪৫ ফুট) উচ্চতার অন্নপূর্ণা-১। তবে পর্বতারোহীদের মৃত্যুর হার বিবেচনায় বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক পর্বত হিসেবেই ধরা হয় এটিকে। এর সফল সামিটের বিপরীতে মৃত্যুর হার প্রায় ১৪ শতাংশ, যা ২০১২ সাল পর্যন্ত ছিল ৩২ শতাংশ। গত মৌসুম পর্যন্ত এ পর্বত জয় করেছেন ৫১৪ জন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন ৭৩ জন।
এ পর্বত জয় করতে গত ২৪ মার্চ বাংলাদেশ থেকে নেপালের যান বাবর। রাজধানী কাঠমুন্ডুতে প্রস্তুতি শেষে ২৬ মার্চ যান পোখারায়। এরপর কিছু পথ গাড়িতে ও কিছু পথ পায়ে হেঁটে পৌঁছান বেসক্যাম্পে। সেদিন ছিল ২৮ মার্চ। একদিন সেখানে বিশ্রাম নিয়ে পরদিন চড়তে শুরু করেন উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে। ক্যাম্প-১ (৫২০০ মিটার) এ দুই রাত এবং ক্যাম্প-২ (৫৭০০ মিটার) এ এক রাত কাটিয়ে ২ এপ্রিল বেসক্যাম্পে নেমে আসেন বাবর।
এরপরই শুরু ভালো আবহাওয়ার জন্য অপেক্ষা। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বাবর জানতে পারেন, তার পর্বতারোহনের জন্য অনুকূল আবহাওয়া থাকবে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত। তাই পরদিনই চূড়ার দিকে উঠতে শুরু করেন। ওই দিন ক্যাম্প–১–এ থেকে পরদিন উঠে যান ক্যাম্প–২–এ। এর মধ্যেই সম্মুখীন হন তুষারঝড়ের। ঝড় মাথায় নিয়েই বাবর পৌঁছে যান ক্যাম্প–৩–এ (৬৫০০ মিটার)। সাধারণত ৭ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতায় ক্যাম্প তৈরি করে পর্বতারোহীরা চূড়ায় আরোহণের চূড়ান্ত পদক্ষেপ (সামিট পুশ) নেন। কিন্তু আবহাওয়া বিবেচনায় বাবর আলী ক্যাম্প-৩ থেকেই সেই পদক্ষেপ নেন। লক্ষ্য ওই উচ্চতায় একটানা ১৬০০ মিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। ৬ এপ্রিল রাতে শুরু হয় তার সামিট পুশ।
অভিযান ব্যবস্থাপক ফরহান জামান জানান, আজই ক্যাম্প–২–এ নেমে আসার চেষ্টা করবেন বাবর। সেখানে থেকে আগামীকাল ৮ এপ্রিল নামতে পারেন বেসক্যাম্পে।
তিনি আরো বলেন, গত বছর এভারেস্ট-লোৎসে সামিটের পর এবার অন্নপূর্ণা-১ শীর্ষে পৌঁছানোর মাধ্যমে দেশের পর্বতারোহণের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় যোগ করেছেন বাবর। ওর কঠোর পরিশ্রম ও নিরলস অধ্যবসায়ের প্রতিফলন এই সাফল্য।