ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়

অধিভুক্ত মাদরাসার সংখ্যা বাড়লেও প্রশ্নবিদ্ধ শিক্ষার মান

‘বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৩’-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ফাজিল ও কামিল পর্যায় মিলিয়ে প্রতি বছর প্রায় দেড় লাখ বা তার বেশি শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হচ্ছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ফাজিলে ৭৮ হাজার ৭৪২ এবং কামিলে ২৩ হাজার ৬০৭ জন উত্তীর্ণ হন।

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অধ্যয়নরত মোট শিক্ষার্থীর ১০ শতাংশের বেশি ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বিভিন্ন মাদরাসায় পড়াশোনা করছেন। সংখ্যার দিক থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান। দেশের মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার পর গত এক দশকে দেশের প্রায় দেড় হাজার ফাজিল ও কামিল মাদরাসা বিশ্ববিদ্যালয়টির অধিভুক্ত হয়েছে। তবে শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অধিভুক্ত মাদরাসার সংখ্যা বাড়লেও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব, শিক্ষার্থীদের ক্লাসে অনিয়মিত উপস্থিতি এবং দক্ষ শিক্ষকের সংকটসহ নানা কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত মাদরাসার সংখ্যা ১ হাজার ৪৭৪। এর মধ্যে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে অধিভুক্ত হয়েছে ১৪৫টি মাদরাসা। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৩ অনুযায়ী, এসব অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানে মোট ৫ লাখ ৩ হাজার ৫৮০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩ লাখ ৪০ হাজার ৪৮১ জন ফাজিল বা স্নাতক (পাস) কোর্সে এবং ২৫ হাজার ৬৩৩ জন ফাজিল (সম্মান) কোর্সে পড়ছেন। এছাড়া কামিল বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ লাখ ৩৭ হাজার ৪৬৬। অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক রয়েছেন মোট ৩২ হাজার ২২ জন।

শিক্ষাবিদদের মতে, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল পাঠ্যক্রম আধুনিক ও যুগোপযোগী করা। তবে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা এখনো গতানুগতিক পাঠ্যক্রমের স্নাতক (পাস) কোর্সে অধ্যয়ন করছেন। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই সংখ্যার মধ্যে আটকে গেছে। এখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানো হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়, শিক্ষার গুণগত মানে গুরুত্ব দেয়া হয় না। ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল মাদরাসা শিক্ষাকে আধুনিক ও সময়োপযোগী করে তোলা। কিন্তু বাস্তবে মাদরাসা শিক্ষা এখনো গতানুগতিক ধারায় পরিচালিত হচ্ছে। দেশের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের মতো তাদের কারিকুলামের সঙ্গেও শ্রমবাজারের বড় ঘাটতি আছে।’

তার মতে, এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোয় একদিকে যেমন প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতি আছে, তেমনি আরেকটি বড় সমস্যা হলো পর্যাপ্ত মনিটরিংয়ের অভাব। শিক্ষার্থীদের বড় অংশ নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ না করেই সনদ অর্জন করলেও দক্ষতা গড়ে উঠছে না। এভাবে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ, উন্নত কারিকুলাম এবং নিয়মিত মূল্যায়ন ছাড়া এ সম্প্রসারণ কেবল শিক্ষিত বেকার তৈরির সংখ্যা বাড়াবে।

বিভিন্ন গবেষণায় মাদরাসা শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতার চিত্রও উঠে এসেছে। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) ‘এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড এক্সপেকটেশনস অব ফরমার মাদরাসা স্টুডেন্টস ইন কক্সবাজার: আ ক্রস-সেকশনাল এক্সপ্লোরেশন’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন মাদরাসার সাবেক শিক্ষার্থীদের মাত্র ৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। আলিয়া মাদরাসার সাবেক শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এ হার কিছুটা বেশি, ৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ। কক্সবাজারের বিভিন্ন পর্যায়ের ৭৮২ জন কওমি ও আলিয়া মাদরাসার সাবেক শিক্ষার্থীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এতে দেখা যায়, তাদের বড় একটি অংশ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা ও ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত।

সাধারণ ধারার তুলনায় ইংরেজি, কম্পিউটার শিক্ষার মতো বিষয়গুলোতে মাদরাসায় কম গুরুত্ব দেয়া হয় বলে জানিয়েছেন পটুয়াখালী ওয়ায়েজীয়া কামিল মাদরাসার প্রাক্তন শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শহরের মাদরাসাগুলোতে এসব সুযোগ কিছুটা পেলেও মফস্বল এবং গ্রামের মাদরাসাগুলো বেশ পিছিয়ে। যে কারণে চাকরি ক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে থাকতে হয় এবং ভালো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমরা তুলনামূলক কম সুযোগ পাই। তার পরও এ ধারায় যারা পড়ালেখা করে তাদের প্রায় সবাই ব্যবসা বা কোনো না কোনো কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত। বিশেষত সাবেক শিক্ষার্থীদের বড় অংশ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করছেন। কারিকুলাম আধুনিকায়ন করা হলে মাদরাসার শিক্ষার্থীরা আরো ভালো কিছু করার সুযোগ পেত।’

মাদরাসা শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক প্রতিবেদনেও তাদের আয় ও কর্মসংস্থানে পিছিয়ে থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের উপযোগী করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে অপ্রতুল শিক্ষা উপকরণ, সীমিত পাঠ্যক্রম, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের অভাব, অভিজ্ঞ ও দক্ষ শিক্ষকের সংকট, প্রয়োজনের তুলনায় কম শিক্ষক এবং দুর্বল বেতন কাঠামো।

মাদরাসা শিক্ষার বর্তমান মান নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে শিক্ষকদের মধ্যেও। ময়মনসিংহের কাতলাসেন কাদেরিয়া কামিল (মাস্টার্স) মাদরাসার অধ্যক্ষ ও বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষক-কর্মচারী ফোরামের সভাপতি অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফাজিল ও কামিল পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বেশকিছু বড় চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পর্যাপ্ত বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধার অভাবে এ খাতে মেধাবীরা কম আকৃষ্ট হচ্ছেন। অন্যদিকে এমপিও নীতিমালা সংশোধনের মাধ্যমে পদ সংকুচিত হওয়ায় অনেক মাদরাসায় শিক্ষক সংকটও তৈরি হয়েছে। সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় মাদরাসা শিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগও কম। অনেক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শ্রেণীকক্ষ, আইসিটি ল্যাবসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে।’

তার মতে, ফাজিল ও কামিল পর্যায়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের হওয়ায় প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। ফলে পরিবারকে সহায়তা করতে পড়াশোনার পাশাপাশি অনেককে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হতে হয়। এর প্রভাব পড়ে তাদের নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি ও সামগ্রিক শিক্ষার মানে।

‘বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৩’-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ফাজিল ও কামিল পর্যায় মিলিয়ে প্রতি বছর প্রায় দেড় লাখ বা তার বেশি শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হচ্ছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ফাজিলে ৭৮ হাজার ৭৪২ এবং কামিলে ২৩ হাজার ৬০৭ জন উত্তীর্ণ হন। ২০২০ সালে এ সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১ লাখ ১৭ হাজার ২৩১ ও ৬২ হাজার ৬৯৭। ২০২১ সালে ফাজিলে উত্তীর্ণ হন ১ লাখ ৮ হাজার ৯২০ এবং কামিলে ৪০ হাজার ৪৯৮ জন। তবে করোনাকালীন সেশনজট ও শিক্ষার্থী ঝরে পড়াসহ বিভিন্ন কারণে ২০২২ সালে ফাজিল পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যায়। ওই বছর ফাজিলে ৩০ হাজার ৬৫৮ এবং কামিলে ৬১ হাজার ৯৯৪ জন উত্তীর্ণ হন। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ফাজিল ও কামিল সম্পন্ন করলেও তাদেরকে শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষতায় গড়ে তোলা না গেলে দেশে উচ্চ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।

সার্বিক বিষয়ে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. মোহাম্মদ আবু জাফর খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিক্ষার মানের বিষয়টি আপেক্ষিক এবং মাদরাসা শিক্ষার প্রকৃতি সাধারণ শিক্ষার তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। মাদরাসার শিক্ষার্থীরা বেকার—বিষয়টি এমন নয়। তারা বিভিন্ন ধরনের কর্মক্ষেত্রে যুক্ত রয়েছেন।’ শিক্ষার্থীদের শ্রমবাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলা এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মাদরাসাগুলো আধুনিকায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ও ওয়াই-ফাই জোন স্থাপন এবং ইন্টারনেটভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি এসব কার্যক্রমে অতিরিক্ত বরাদ্দ চেয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।’

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার মানের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কমিশনের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, শিক্ষকস্বল্পতা ও একাডেমিক উন্নয়নের ঘাটতিসহ বেশকিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে মাদরাসা শিক্ষার মান উন্নয়নে ইউজিসির ‘স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান ফর হায়ার এডুকেশন’-এ সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। কমিশন আরো জানায়, অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ল্যাব স্থাপন ও বরাদ্দের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এছাড়া ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল গঠনের মাধ্যমে মাদরাসা শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং গবেষণার পরিবেশ তৈরির উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।

আরও