প্রাথমিক শিক্ষা

শিক্ষার মানোন্নয়নে নেই কার্যকর উদ্যোগ, ভবন ও ক্লাসরুম নির্মাণে ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন ও শ্রেণীকক্ষ নির্মাণে আবারো বড় বাজেটের প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সম্প্রতি প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের মোট তিনটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন ও শ্রেণীকক্ষ নির্মাণে আবারো বড় বাজেটের প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সম্প্রতি প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের মোট তিনটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন, আধুনিক কারিকুলাম প্রণয়নসহ সামগ্রিক প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে নজর না দিয়ে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন করলে তা টেকসই হবে না। শুধু অবকাঠামো শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না।

প্রস্তাবিত তিনটি প্রকল্পের মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্পে ১৪ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা, ১০টি সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ২ হাজার ৬১৭ কোটি এবং জরাজীর্ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ১৪ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। প্রকল্পগুলোর প্রস্তাব অনুযায়ী এ অর্থের পুরো জোগান আসবে সরকারের রাজস্ব খাত থেকে। বর্তমানে এসব প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশন যাচাই-বাছাই করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম মনে করেন প্রাথমিক শিক্ষায় প্রশাসনিক বিষয়ে মনিটরিং থাকলেও একাডেমিকে কার্যকর মনিটরিংয়ের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বিগত দেড় দশকে শিক্ষা খাতে যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে সেগুলোর বেশির ভাগ ছিল রাজনৈতিক বিবেচনায়। এ কারণে শিক্ষার্থীদের শিখনমান ও দক্ষতার প্রত্যাশিত উন্নয়ন ঘটেনি। বিভিন্ন প্রকল্পে ভবন নির্মাণ হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কেনাকাটায় নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ফলে এসব প্রকল্প কার্যত শিক্ষার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারেনি। এর প্রতিফলন জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। শিক্ষার মানোন্নয়নে দরকার শিখন-শেখানোর গুণগত মানের উন্নয়ন, দক্ষ প্রশিক্ষিত শিক্ষক, আধুনিক কারিকুলাম। কিন্তু এর সবকিছুতেই ঘাটতি আছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নও প্রয়োজন, কিন্তু শুধু অবকাঠামো দিয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যাবে না।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে শুরু হওয়া ‘প্রাইমারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (পিইডিপি-৪)’ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের জুনে। তার পরবর্তী ধাপে নতুন এসব প্রকল্প হাতে নেয়া হবে, যেন প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দেশের সব জেলা মিলিয়ে ৩ হাজার ৪৭৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২৪ হাজার ৭৪২টি নতুন শ্রেণীকক্ষ নির্মাণ এবং পুরনো ভবন সংস্কার করা হবে। ১০টি সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ৫৩৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় উন্নয়ন করা হবে। এসব বিদ্যালয়ে নতুন শ্রেণীকক্ষ, লাইব্রেরি, মাল্টিপারপাস রুম, শিক্ষকদের বিশ্রামাগার ও আধুনিক শিক্ষা উপকরণ সংযোজন করা হবে। জরাজীর্ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে জরাজীর্ণ বিদ্যালয়গুলোর সংস্কারকাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রকল্পগুলোর অর্থায়নে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা বা দাতা দেশগুলো থেকে সহজ শর্তে ঋণ বা অনুদান নিলে সরকারের চাপ কমবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নও টেকসই হবে বলে মত দিয়েছেন ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘মানসম্মত শিক্ষা অর্জনের জন্য শিক্ষকের সংখ্যা, যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ বাড়ানো দরকার। শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ ছাড়া শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন সম্ভব নয়। এছাড়া রাজস্ব আহরণ দুর্বল হওয়ায় সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত। তাই অভ্যন্তরীণ তহবিলের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করলে বাজেটে চাপ বাড়বে এবং অন্য খাতে ব্যয় সংকোচন ঘটতে পারে।’

এর আগে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে দুটি প্রকল্পেই এক যুগে ব্যয় করা হয়েছিল প্রায় সাড়ে ৩৩ হাজার কোটি টাকা। ২০১১ সালে ‘প্রাথমিক শিক্ষায় সব শিশুর জন্য মানসম্মত শিক্ষার ব্যবস্থা করা’র লক্ষ্য সামনে রেখে তৃতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প (পিইডিপি-৩) শুরু করে সরকার। ১৮ হাজার ১৫৩ কোটি ৮৮ লাখ ৩৬ হাজার টাকা ব্যয়ে নেয়া এ প্রকল্প শেষ হয় ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে। বিপুল ব্যয়ের এ প্রকল্প শেষে শিক্ষার্থীদের দক্ষতামানের উন্নতি হবে এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্পটি শেষে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার হ্রাস পাওয়া এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছাড়া শিক্ষার মানে কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। পরবর্তী সময়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিখন ও শেখানোর গুণগত মানের উন্নয়ন, সর্বজনীনভাবে বিস্তৃত একটি সুষ্ঠু সমতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত এবং প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিতের উদ্দেশ্যে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প (পিইডিপি-৪) কার্যক্রম শুরু করে সরকার। ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত এ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছিল ১৫ হাজার ৩১৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে এ দুই প্রকল্পের অধীনে গত এক যুগে প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়নে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৩ হাজার ৪৭৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।

কিন্তু এ বিপুল ব্যয় সত্ত্বেও প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের পারফরম্যান্সে বিশেষ কোনো উন্নতি ঘটেনি। শিক্ষার্থীদের অর্জিত দক্ষতার স্তর নির্ণয়ে তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের বাংলা ও গাণিতিক দক্ষতার ওপর নির্ভর করে দুই বছর পরপর জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ এ প্রতিবেদন তৈরি করে। সর্বশেষ ২০২২ সালে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫১ শতাংশ বাংলায় ও ৩৯ শতাংশ গণিতে শ্রেণী বিবেচনায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দক্ষতা অর্জন করেছে। পঞ্চম শ্রেণীর ক্ষেত্রে বাংলায় এ হার ৫০ ও গণিতে ৩০ শতাংশ।

এর এক দশক আগের অর্থাৎ ২০১১ সালের প্রতিবেদনের তথ্যমতে, সেবার তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬৭ শতাংশ বাংলায় ও ৫০ শতাংশ গণিতে শ্রেণী অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দক্ষতা অর্জন করেছিল। আর পঞ্চম শ্রেণীর ক্ষেত্রে বাংলায় এ হার ছিল ২৫ আর গণিতে ৩৩ শতাংশ। সে অনুযায়ী প্রায় এক যুগে শ্রেণী বিবেচনায় কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জনে তৃতীয় শ্রেণীতে বাংলায় এ হার কমেছে ১৬ শতাংশীয় পয়েন্ট। গণিতের ক্ষেত্রে পারফরম্যান্সে অবনতির মাত্রা ১১ শতাংশীয় পয়েন্ট। পঞ্চম শ্রেণীতে বাংলায় পারফরম্যান্সে উন্নতি হলেও গণিতে অবনতির মাত্রা ৬ শতাংশীয় পয়েন্ট।

এদিকে বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কারিকুলাম চালু আছে অন্তত পাঁচ রকমের। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ প্রাথমিক পর্যায়ে একই ধরনের কারিকুলামের আওতায় একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলনের কথা বলা হলেও দেড় যুগে তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, উচ্চ বিদ্যালয়সংলগ্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়, এবতেদায়ি মাদ্রাসা, উচ্চ মাদ্রাসাসংলগ্ন এবতেদায়ি মাদ্রাসা, এনজিও পরিচালিত বিদ্যালয়, এনজিও পরিচালিত শিক্ষা কেন্দ্র, শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট স্কুল, কওমি মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরকারি কারিকুলামকে অনুসরণ করা হয়। এ কারিকুলাম সাধারণ শিক্ষা কারিকুলাম নামে পরিচিত। বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, এনজিও পরিচালিত বিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষা কারিকুলামে নির্ধারিত পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি বেশকিছু অতিরিক্ত বিষয় পড়ানো হয়। এবতেদায়ি মাদ্রাসা ও উচ্চ মাদ্রাসাসংলগ্ন এবতেদায়ি মাদ্রাসায় অনুসরণ করা হয় সরকার নির্ধারিত পৃথক কারিকুলাম। এ কারিকুলাম সাধারণ মাদ্রাসা কারিকুলাম নামে পরিচিত, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। আর কওমি মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়গুলোয় সম্পূর্ণ নিজস্ব কারিকুলাম অনুসরণ করা হয়। এ দুই ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন পদ্ধতিও পুরোপুরি আলাদা।

অন্তর্বর্তী সরকার প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষায় সংস্কার, গুণগত পরিবর্তন ও মানোন্নয়নে নয় সদস্যের একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করে। এ কমিটির প্রধান ছিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার সুপারিশ করেছিলাম। উপজেলাভিত্তিক প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে অর্থাৎ কোথায় শিক্ষক ঘাটতি রয়েছে, কোথায় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে, কোথায় অবকাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে চাহিদাভিত্তিক প্রকল্প নেয়ার জন্য বলেছিলাম। কিন্তু যদি এমন হয় যে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ বা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণসহ শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিয়ে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হচ্ছে, তাহলে এসব প্রকল্প কতটা সফল হবে তা নিয়ে সন্দেহ থাকে।’

প্রস্তাবিত এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। সার্বিক বিষয়ে জানতে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করে মন্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দারের সঙ্গে যোগাযোগ করে গত রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

আরও