চারণভূমি ও প্রাকৃতিক খাদ্য সংকটে ছোট হয়ে আসছে নোয়াখালীর দেশীয় মহিষ বাথান। সম্প্রতি জেলার উপকূলীয় কয়েকটি এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে মহিষ খামার গড়ে তোলার দৃশ্য চোখে পড়ে। দেশী-বিদেশী মুররা জাতের এসব খামারে ৪-১০টি পর্যন্ত মহিষ রয়েছে। পুরুষের পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসছেন এ খাতে।
পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন-পিকেএসএফ ও স্থানীয় এনজিও সাগরিকার মাধ্যমে সরকার অল্প পরিসরে মহিষ খামার সম্প্রসারণে সমন্বিত প্রকল্পও হাতে নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিকভাবে সরকারি সহায়তা বাড়ানো হলে মহিষের মাংস, দুধ ও দুগ্ধজাতীয় খাদ্যের বাজার সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে প্রান্তিক মানুষের জীবনমান আরো উন্নত হবে।
এক সময় বাথানেই দেশীয় জাতের মহিষ পালন করতেন সুবর্ণচর উপজেলার চর মহিউদ্দিন গ্রামের আবদুল মালেক। কিন্তু চারণভূমি কমে যাওয়ায় ও সবুজ বেষ্টনী উজাড় হওয়ায় খাদ্য সংকট দেখা দেয়। এতে তার বাথান সংকুচিত হয়। সম্প্রতি একটি সংস্থার ট্রেনিং নিয়ে নিজ বাড়িতেই পরিবেশসম্মতভাবে গড়ে তুলেছেন মহিষের খামার। তবে আর্থিক সংকটের কারণে শেডগুলো সম্প্রসারণ করতে পারছেন না তিনি। কম পরিশ্রম ও স্বল্প খরচে গড়ে তোলা খামারে বর্তমানে বিদেশী মুররা জাত, ক্রস ও দেশীয় মিলে ১০টি মহিষ রয়েছে তার। দেশীয় মহিষের তুলনায় মুররা ও ক্রসে মিলছে বেশি দুধ ও মাংস।
আবদুল মালেকের মতে, এ খামারেই একদিন স্বপ্ন পূরণ হবে এমন প্রত্যাশা করছেন তিনি। বাড়ির পাশের ছোট্ট একটা জমিতে উন্নতমানের ঘাস চাষ করছেন। তিনি জানান, অল্প খাবারে মহিষ সন্তুষ্ট থাকে। বর্তমানে তার বিদেশী মুররা জাতের একটি মা মহিষ বাচ্চা দিয়েছে। অন্য মহিষগুলোর মধ্যে মা মহিষ যেগুলো আছে, সেগুলোও আগামী এক বছরের মধ্যে বাচ্চা দেবে। এতে করে তার খামার আরো বড় হবে। মুররা জাতের মহিষ থেকে তিনি প্রতিদিন ৮-১০ কেজি দুধ পাচ্ছেন। দুধের বাজারও ভালো রয়েছে। তিনি আশা করেন, খামার বড় হলে মাংসের জন্য যেমন মহিষ বিক্রি করতে পারবেন, অন্যদিকে বছরখানেক পর থেকে প্রতিদিন গড়ে ২-৩ হাজার টাকার দুধও বিক্রি করতে পারবেন।
শুধু আব্দুল মালেক নন, সুবর্ণচরের প্রত্যন্ত গ্রামে এখন মহিষ খামার দিয়ে ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন অনেক নারী-পুরুষ। বিভিন্ন স্থানে এভাবে অন্তত ৪০টি খামার গড়ে উঠেছে। দুধ ও মাংস বেশি হওয়ায় বিদেশী জাতের মুররা ও দেশীয় ক্রস জাতের প্রতি আগ্রহ খামারিদের। খামারিরা বলছেন, দেশীয় জাতের একটি মা মহিষ দেড় থেকে দুই কেজি দুধ দিলেও মুররা দিচ্ছে ৮-১০ কেজি। আবার ১৫-২৫ মণ পর্যন্ত মাংস হচ্ছে ক্রস ও মুররা জাতের মহিষে। এতে দুধ ও মাংসের বাজার বড় হচ্ছে। ফলে গরুর খামারের পাশাপাশি মহিষ খামারে আগ্রহী হচ্ছেন নতুন উদ্যোক্তারা। মহিষের খামারকে কেন্দ্র করে চরাঞ্চলে দুধ ও দুগ্ধজাতীয় খাদ্য উৎপাদনেও আগ্রহী হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা অব্যাহত থাকলে মহিষের খামার দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
এমনই আরেক উদ্যোক্তা মো. মেহেরাজ উদ্দিন। তিনি হাতিয়া উপজেলার নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। বর্তমানে সুবর্ণচর উপজেলার আল আমিন বাজারসংলগ্ন নিজের ক্রয় জমিতে গড়ে তুলেছেন গরু ও মহিষের খামার। বর্তমানে সেখানে দেশী, বিদেশী ও ক্রস জাতের মিলিয়ে ১০০টি মহিষ রয়েছে। এর মধ্যে বিদেশী মুররা ও ক্রস জাতের রয়েছে ২০টি। বাথান হ্রাস পাওয়ায় বিদেশী জাতের মহিষ খামারে পালন শুরু করেছেন। তার মতে, খাবারসহ মহিষ পালনে সময় ও অর্থ দুটোই কম লাগে। বাজারে মহিষের দুধ ও মাংসের চাহিদাও বেড়েছে। ফলে ভবিষ্যতে মহিষের দুধ ও মাংস দেশের আমিষের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে।
এ বিষয়ে স্থানীয় সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক সাইফুল ইসলাম সুমন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চরাঞ্চলে চারণভূমি দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। ফলে দেশীয় মহিষের বাথান কমে যাচ্ছে। তাই সরকার বিদেশী ও দেশীয় ক্রস জাতকে বাড়াতে নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। গ্রামীণ জীবনমান টেকসই করতে বাথানের পাশাপাশি পরিবারকেন্দ্রিক পরিবেশবান্ধব মহিষ খামার গড়ে তুলতে মূলত সরকার এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তার সংস্থা এ প্রকল্পকে সম্প্রসারণ করতে পিকেএসএফের মাধ্যমে কাজ করছে।
এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘স্থানীয়দের মহিষ চাষ করতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মহিষের মাংস, দুধ ও দুগ্ধজাতীয় খাদ্য উৎপাদনে এবং বাজার ব্যবস্থার উন্নয়নে উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণসহ সার্বিক সহযোগিতাও করছি আমরা। তাদের কারিগরি সহায়তা যেমন দেয়া হচ্ছে, তেমনি বাজার ব্যবস্থা উন্নয়নে কাজ করা হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে দুগ্ধ জাতীয় খাদ্য যেমন দধি, মাখন, ঘি উৎপাদনে সহায়তা করা হচ্ছে। দোকানিদের এসব পণ্য বিএসটিআইয়ের আওতায় নিতেও সহায়তা করছে পিকেএসএফ।’
এ বিষয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কাজী রফিকুজ্জামান বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ নতুন উদ্যোগ। দুই বছরে এ উদ্যোগে বেশ সাফল্য দেখা গেছে। সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন এনজিও যৌথভাবে এ প্রকল্প সম্প্রসারণে কাজ করছে। এখন দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ নিজেদের উদ্যোগেই খামার গড়ে তুলছে, যা চরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে। সরকারি সহায়তা বাড়ানো গেলে গরুর পাশাপাশি মহিষের খামার থেকে বছরজুড়ে মাংস, দুধ ও দুগ্ধজাতীয় খাবার দেশের চাহিদা মিটিয়ে রফতানি করারও সুযোগ রয়েছে। ’