২০২৩ সালের মার্চে, সেন্ট্রাল ক্যালিফোর্নিয়ায় ৬ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। এ সময় ইউসি বার্কলে-এর কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক ‘মাই শেইক’ অ্যাপের কারণে হাজারো মানুষ সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পনের কয়েক সেকেন্ড আগেই সতর্কবার্তা পেয়েছিল। স্মার্টফোনকে ক্ষুদ্র ভূকম্পন সেন্সরের মতো ব্যবহার করে এআই ডেটা বিশ্লেষণ করেছিল, মিথ্যা সিগন্যাল সরিয়ে প্রকৃত কম্পন শনাক্ত করেছিল এবং সময়মতো সতর্কবার্তা পাঠিয়েছিল। এই কয়েক সেকেন্ড মানুষকে 'ড্রপ, কভার, হোল্ড' নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ দিয়েছিল, স্কুল ও ট্রানজিট সিস্টেমও দ্রুত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছিল। ফলে বেঁচে গেছে অনেক জীবন।
ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর একটি। সরু রাস্তা, বহু পুরনো ও দুর্বল নির্মাণকৃত ভবন, এবং দ্রুত বর্ধমান জনসংখ্যার ফলে শহরটি ভূমিকম্পে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এমন এক পরিবেশে শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে বিপর্যয় অবধারিত। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বা এআই হতে পারে একটি আশার আলো। কম্পনের সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে এবং পরবর্তীতে দুর্যোগ মোকাবেলায় শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে এ প্রযুক্তি।
ভূমিকম্পের আগেই কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা তার কাজ শুরু করে দেয়। ঢাকার মতো শহরে যেখানে যথেষ্ট পরিমাণ সিসমোমিটার বা সরকারি পরিমাপ যন্ত্র নেই, সেখানে প্রতিটি স্মার্টফোন হতে পারে ছোট্ট সেন্সর। আধুনিক অ্যান্ড্রয়েড ফোনে থাকা সেন্সর প্রথম কম্পন বা 'পি-ওয়েভ' শনাক্ত করতে পারে।
ঢাকার জন্য বিশেষভাবে কিছু স্থানীয় অ্যাপও আছে, যেমন 'আর্থকোয়েক অ্যালার্ট বিডি' এবং ‘ডিজাস্টার অ্যালার্ট বিডি'। এই অ্যাপগুলো মূলত আন্তর্জাতিক ডেটা বা ফোন সেন্সর ব্যবহার করে সতর্কবার্তা পাঠায়। তবে ভবিষ্যতে এগুলোকে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা আরো নির্ভুল করা সম্ভব। কোটি স্মার্টফোনকে ক্ষুদ্র সেন্সর হিসেবে ব্যবহার করে প্রাথমিক কম্পন শনাক্ত করা, মাটি ও ভূতাত্ত্বিক তথ্য বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, এবং বাস্তব সময়ে ক্ষয়ক্ষতির মানচিত্র তৈরি করা যেতে পারে। এআই-পাওয়ারড ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং কমিউনিটি রিপোর্টিং সুবিধা যুক্ত করলে সতর্কতা এবং উদ্ধার আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে।
ভূমিকম্পের সময় কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা শুধু সতর্কবার্তা দেয় না। ভবনগুলোতে বসানো সেন্সর থেকে আসা ডেটা বিশ্লেষণ করে 'ড্যামেজ হিটম্যাপ' তৈরি করে। এটি উদ্ধারকারীদের দেখায় কোন এলাকা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্যাস লাইন, বিদ্যুৎ এবং এলিভেটর বন্ধ করতে পারে, যা আগুন বা বিস্ফোরণের ঝুঁকি কমায়। ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়া মানুষ খুঁজে বের করতে ড্রোন এবং রোবট ব্যবহার করে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা উদ্ধার কার্যক্রমকে দ্রুত ও নিরাপদ করে তোলে। এজন্য ঢাকার ভবনগুলোতে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা সেন্সরের ব্যবহার করা এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়াও কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ভূমিকম্প পরবর্তী পুনরুদ্ধারেও সাহায্য করে। ড্রোন ও স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা চিহ্নিত করা যায়। জনসংখ্যা, রাস্তার অবস্থা ও ক্ষতির তথ্য একত্রিত করে খাবার, পানি, চিকিৎসা ও আশ্রয় বিতরণের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা যায়। প্রতিটি ভূমিকম্পের তথ্য কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তাকে শেখায় এবং ভবিষ্যতের জন্য শহরকে আরো শক্তিশালী করে।
কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ভূমিকম্প থামাতে না পারলেও এটি আমাদের সতর্কতা এবং প্রস্তুতি নেয়ার সময় দিতে পারে। যদি ঢাকার মানুষ, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা এবং কর্তৃপক্ষ কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে প্রস্তুতি নেয়, তাহলে শহরটি ভবিষ্যতের ভূমিকম্পের জন্য অনেক বেশি নিরাপদ এবং প্রতিরোধী হয়ে উঠবে।