স্থায়ী ক্যাম্পাস হওয়া সত্ত্বেও উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ছিল না ফায়ার হাইড্রেন্টসহ অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত সরঞ্জাম। পাশাপাশি ছিল না জরুরি নির্গমন ব্যবস্থাও। ফলে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হলে ‘হায়দার আলী ভবন’-এর প্রথম ও দ্বিতীয় তলা থেকে শিশু-শিক্ষার্থীসহ অন্যরা বের হতে পারেনি। এতে হতাহতের সংখ্যা বেশি হয়েছে। একতলা একটি, দোতলা একটি এবং একটি ১১ তলা ভবন সংবলিত এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেই ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্রও। অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবেলার পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকলে দুর্ঘটনার হতাহতের সংখ্যা কমিয়ে আনা যেত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
কেবল মাইলস্টোনই নয়, ঢাকায় এমন অন্তত ১০৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে যেগুলোর অগ্নিঝুঁকি মোকাবেলার সক্ষমতা নেই। দুর্ঘটনায় প্রথম সাড়া দেয়া সংস্থা ফায়ার সার্ভিসের পর্যবেক্ষণে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
জানা গেছে, ২০০২ সালে উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকায় স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল নুরন্ নবী। উনি রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ ছিলেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমে কেজি থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষাদান কর্মসূচি রয়েছে। শিক্ষার্থী রয়েছে ২০ হাজারের বেশি। কিন্তু এ বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে নেই পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা। নেই ফায়ার হাইড্রেন্ট ও জরুরি নির্গমন ব্যবস্থা। বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামও অপর্যাপ্ত। এসব মিলেই পুরো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থায় মারাত্মক ঘাটতি ছিল।
ফায়ার সার্ভিসের মুখপাত্র মো. শাহজাহান শিকদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দিয়াবাড়ি স্থায়ী ক্যাম্পাসের ফায়ার সার্ভিসের কোনো ছাড়পত্র নেই। সেখানে অগ্নিদুর্ঘটনা প্রতিরোধের সময় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ফায়ার হাইড্রেন্ট দেখা যায়নি। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে কিছু সংখ্যক বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ব্যবহার করতে দেখা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা ও কর্মীরা উদ্ধার অভিযানে আমাদের সহযোগিতা করেছেন।’
শুধু মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজই নয়, ঢাকার ১০৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেই অগ্নিপ্রতিরোধ সক্ষমতা। নিমতলী ট্র্যাজেডিসহ দেশজুড়ে বেশ কয়েকটি বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের পর ২০১৬ সাল থেকে প্রতি বছরই নিয়ম করে ঢাকার বহুতল ভবনগুলোর অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবেলার সক্ষমতা পরিদর্শন করে আসছে ফায়ার সার্ভিস। তাদের পরিদর্শনে বেশ কয়েকটি নিরাপত্তা নির্দেশিকার ভিত্তিতে বহুতল ভবনগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ ও অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে জরুরি নির্গমন সিঁড়ি, ফায়ার লিফট, আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার রিজার্ভ ব্যবস্থা, রাইজার ও ফায়ার হাইড্রেন্টের মতো জরুরি সরঞ্জামাদি থাকা-না থাকার বিষয় বিবেচনায় নেয়া হয়। পাশাপাশি বহুতল ভবনের সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে প্রত্যেক ফ্লোরে সেফটি লবি আছে কিনা, ছাদে বজ্র নিরোধক ব্যবস্থা রয়েছে কিনা—পরিদর্শনে এসব বিষয় খতিয়ে দেখে ঢাকার ১০৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ফায়ার সার্ভিস। শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার কথা বিবেচনায় নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অগ্নিঝুঁকি মোকাবেলার সক্ষমতা বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শন তালিকা থেকে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বণিক বার্তার পক্ষ থেকে সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার বিজি প্রেস উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়টিতে একটি তিনতলা ও একটি দোতলা ভবন রয়েছে। শিক্ষার্থী রয়েছে ৩৯৮ জন। শিক্ষক ও স্টাফ রয়েছেন ১৬ জন। প্রতিটি ভবনে একটি করে ছয় ফুট প্রশস্ত সিঁড়ি থাকলেও একটিও বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র নেই। এছাড়া বিদ্যালয়টির বৈদ্যুতিক সাবস্টেশনের ট্রান্সফরমার ও সুইচ গিয়ার রুম একসঙ্গে। এটি অগ্নিকাণ্ডের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত এ প্রতিষ্ঠানকে অগ্নিঝুঁকি মোকাবেলা সক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের তালিকা অনুয়ায়ী অতিঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শান্তা মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজির ক্যাম্পাসটি। সেখানে ছয়তলাবিশিষ্ট ভবনে রয়েছে মাত্র চারটি বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র। প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী মিলিয়ে প্রায় ৯০০ জন নিয়মিত যাওয়া-আসা করলেও তাদের নিরাপত্তায় নেই পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতে একইভাবে পিছিয়ে রয়েছে উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের ক্যামব্রিয়ান কলেজ ও ৬ নম্বর সেক্টরের মাস্টারমাইন্ড স্কুলের মতো অভিজাত ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর তুলনায় বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের সংখ্যা অপ্রতুল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত সরঞ্জাম নেই। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়ায় এসব স্থাপনায় ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক গুণ বেশি জনসমাগম থাকে। কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নামমাত্র অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম থাকলেও এর ব্যবহার সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের পর্যাপ্ত ধারণা নেই। ফলে এসব সরঞ্জাম দুর্ঘটনা মোকাবেলায় তেমন কাজেও আসছে না। আবার অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে যেগুলোয় নিয়মিত অগ্নিনির্বাপণ মহড়াও হয় না। এতে ওই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবেলার যথাযথ ধারণা তৈরি করা যাচ্ছে না।
দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবেলায় অংশ নিয়েছেন দেবাশীষ বর্ধন। ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক (অপারেশন) হিসেবে কিছুদিন আগে অবসরে গিয়েছেন তিনি। বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অগ্নিদুর্ঘটনা প্রতিরোধের পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘মাইলস্টোন স্কুলের স্থায়ী ক্যাম্পাসে অগ্নিদুর্ঘটনার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল না। যদি স্কুলের নিজস্ব হাইড্রেন্ট থাকত, তাহলে উপস্থিত জনতা আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে পারত। তাছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির জরুরি নির্গমন পথ ছিল না। এটি থাকলে হতাহতদের বড় একটি অংশ সেখান দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারত। মূলত স্থাপনাটি আবদ্ধ হওয়ায় শিক্ষার্থীরা সেখানে আটকে যায়। তাছাড়া এ ধরনের স্কুলে ডাক্তার, নার্স ও অ্যাম্বুলেন্স থাকার কথা, সেটাও ছিল না। সব মিলিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির অগ্নিঝুঁকি মোকাবেলার পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকলে হতাহতের সংখ্যা এত বেশি হতো না।’