আগামী মৌসুমে আলুবীজ সংকট দেখা দিতে পারে রংপুর কৃষি অঞ্চলে

কৃষিপ্রধান এ অঞ্চলের জমি ও আবহাওয়া আলু চাষের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী।

গাইবান্ধা, রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও কুড়িগ্রাম নিয়ে রংপুর কৃষি অঞ্চল গঠিত। কৃষিপ্রধান এ অঞ্চলের জমি ও আবহাওয়া আলু চাষের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। ডিলারদের মাধ্যমে এসব জেলায় কৃষক পর্যায়ে আলুবীজ সরবরাহ করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্বায়ত্তশসিত প্রতিষ্ঠানের দুটি বীজ সংরক্ষণাগার রয়েছে রংপুর ও কুড়িগ্রামে। তবে ১৯৭১ সালের পর নির্মাণ করা প্রতিটি সংরক্ষণাগারের ধারণক্ষমতা এক হাজার টন, যা কৃষি অঞ্চলে বীজ সরবাহের জন্য অপর্যাপ্ত। মানসম্পন্ন আলুবীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ এবং কৃষক পর্যায়ে বিতরণের লক্ষ্যে রংপুরে দুই হাজার টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন আরো একটি হিমাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেয় বিএডিসি। তবে ২০২২ সালে শুরু হওয়া নির্মাণকাজ তিন দফা মেয়াদ বাড়িয়েও শেষ হয়নি। এ অবস্থায় আগামী মৌসুমে কৃষক পর্যায়ে বীজ সংকট দেখা দিতে পারে বলে জানিয়েছেন বিএডিসির ডিলাররা।

অবশ্য বিএডিসি কর্তৃপক্ষ বলছে, এরই মধ্যে হিমাগার নির্মাণকাজ ৭০ শতাংশ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে আরো তিন মাস সময় দেয়া হয়েছে। আগামী মৌসুমের আগেই নির্মাণকাজ শেষ হবে।

বিএডিসি (বীজ বিপণন) রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক মো. মাসুদ সুলতান বণিক বার্তাকে বলেন, গাইবান্ধা, রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও কুড়িগ্রাম জেলায় বীজের চাহিদা প্রায় দেড় লাখ টন। সেখানে সরকারিভাবে বীজ সরবরাহ করা হয় সাড়ে তিন হাজার টন। পাঁচ জেলার জন্য বিএডিসির হিমাগার রয়েছে শুধু রংপুর ও কুড়িগ্রামে। প্রতিটির ধারণক্ষমতা এক হাজার টন করে। তবে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় হিমাগার দুটিতে ১ হাজার ৬০০ টনের বেশি বীজ রাখা সম্ভব হয় না। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বীজ আনতে ডিলারদের পরিবহন খরচ বেশি পড়ে যাচ্ছে। এজন্য রংপুর ও নীলফামারীতে দুই হাজার টন ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি হিমাগার নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। এগুলো নির্মিত হলে ডিলারদের ভোগান্তি আর থাকবে না।

বিএডিসি (নির্মাণ) রংপুর জোন সূত্রে জানা গেছে, মানসম্পন্ন আলুবীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও কৃষক পর্যায়ে বিতরণ জোরদারকরণ প্রকল্পের অধীনে হিমাগারটি নির্মাণ করা হচ্ছে। ১৬ কোটি ৬১ লাখ ১৮ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণকাজ করছে ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইকম-ইইএল জেভি। দুই হাজার টন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন হিমাগারটির কার্যাদেশ দেয়া হয় ২০২১ সালের ৭ ডিসেম্বর। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করে ২০২২ সালের ১৭ জুন। কাজ শেস করার জন্য সময় বেঁধে দেয়া ছিল ৪৫০ দিন। সে হিসাবে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রথম দফায় তিন মাস বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয় ২০২৩ সালের ১১ ডিসেম্বর। সে সময়ের মধ্যেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শেষ করতে পারেনি। পরে দ্বিতীয় দফায় নয় মাসেরও বেশি সময় বৃদ্ধি করে নির্ধারণ করা হয় ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। বরাবরের মতো এবারো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হয়। চলতি বছরের ৩০ জুন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় কাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে আরো তিন মাস সময় দেয়া হয়েছে।

কাজটি তদারকির দায়িত্বে থাকা বিএডিসি (নির্মাণ) রংপুর জোনের সহকারী প্রকৌশলী মো. মাসউদুল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে হিমাগার নির্মাণ করতে পারেনি। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আরো তিন মাস সময় বাড়ানো হয়েছে। ভবন নির্মাণকাজ প্রায় শেষের দিকে। যতদূর জেনেছি হিমাগারের কুলিং মেশিন বিদেশ থেকে আনার জন্য যোগাযোগ শুরু করেছেন সংশ্লিষ্টরা। সার্বিক কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৭০ শতাংশ।’

এ প্রসঙ্গে জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার মো. আব্দুল হালিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, হিমাগারের চারটি ছাদের মধ্যে আগে তিনটির কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ছাদের নির্মাণকাজ চলছে। যেহেতু নির্দিষ্ট সময় কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি, তাই আবারো সময় বৃদ্ধির জন্য আবেদন করা হয়েছে।’ তবে তিনি আশাবাদী আগামী মৌসুমের আগে হিমাগার ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

আলু রোপণ মৌসুমে বিএডিসির বিদ্যমান এক হাজার টন ধারণক্ষমতার হিমাগারের বীজ দিয়ে কৃষকের ব্যাপক চাহিদা পূরণ সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আলু উৎপাদন খ্যাত রংপুরে মানসম্পন্ন আলুবীজ বাইরের জেলায় অবস্থিত হিমাগার থেকে সংগ্রহ করতে ডিলার ও কৃষককে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে, খরচও বাড়ছে। তবে হিমাগার নির্মিত হলে সমস্যার সমাধান হবে বলে আশবাদ ব্যক্ত করেছেন ডিলার ও কৃষক।

বিএডিসি বীজ ও সার ডিলার অ্যাসোসিয়েশন রংপুর জেলার সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, আলুর মৌসুমে একেকজন ডিলার বীজ বরাদ্দ পান চার-পাঁচ টন। দুঃখজনক হলেও সত্য হিমাগারের অভাবে তাদের বরাদ্দের কিছু বীজ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন হিমাগার থেকে সংগ্রহ করতে হয়। বীজ সংগ্রহ করতে গিয়ে ভোগান্তিসহ বাড়তি খরচ হয়। অবশ্য গত বছর থেকে বিএডিসি কর্তৃপক্ষ নদীর ওপারের হিমাগার থেকে বীজ আনতে প্রতি কেজিতে এক টাকা করে ইনসেনটিভ দিচ্ছে। এর পরও একজন ডিলারকে সঙ্গে বাইরে থেকে আলু আনতে কয়েকজন ডিলারের যোগাযোগ করতে হয়। যাতে খরচের পরিমাণ কম হয়। অনেক সময় অন্য ডিলারদের খোঁজ মেলে না। দক্ষিণাঞ্চলের বীজ অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানসম্পন্ন না হওয়ায় কৃষক সহজে নিতে চান না।’

নীলফামারী সদর উপজেলার কৃষক আব্দুর রহিম বসুনিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, পার্শ্ববর্তী চাপরা ইউনিয়নে ব্যাপক আলুর আবাদ হয়। বিএডিসির দক্ষিণাঞ্চলের আলুবীজ এ অঞ্চলের উৎপাদিত বীজের চেয়ে একটু নিম্নমানের। এজন্য কৃষক সেগুলো নিতে চান না। হিমাগারটি যত দ্রুত চালু হবে এ অঞ্চলের কৃষকের চাহিদাকৃত আলুবীজ এখান থেকেই সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।

সার্বিক বিষয়ে বিএডিসি আলুবীজ বিভাগের উপপরিচালক (মান নিয়ন্ত্রণ) আসাদুজ্জামান খান বণিক বার্তাকে বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে চলতি বছরের ৩০ জুন। কিন্তু আলু সংরক্ষণ হিমাগার নির্মাণকাজকে গুরুত্ব দিয়ে মেয়াদ আরো দুই বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ সময় বিভিন্ন স্থানে আরো চারটি অনুরূপ হিমাগার নির্মাণ করা হবে। এখন বিষয়টি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

নির্মাণাধীন হিমাগারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আগামী বছরের মার্চে আলুবীজ রাখার মৌসুম শুরু হবে। আশা করি তখন এখানে বীজ রাখা সম্ভব হবে।’

আরও