এ প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজধানীর শেওড়াপাড়া-কাজীপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় যত্রতত্র রাস্তা কেটে ফেলে রাখায় এখন তা সাধারণ মানুষের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডেসকোর এ প্রকল্পের আওতায় মাথার ওপরের তারের জঞ্জাল সরিয়ে ৩৩ কেভি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘এক্সএলপিই ইনসুলেটেড কেবল’ মাটির নিচ দিয়ে নেয়া হচ্ছে। নাগরিক সেবার নামে শুরু হওয়া এ উন্নয়ন কাজ পরিকল্পিত তদারকির অভাবে বিলম্বিত হওয়ায় এখন এলাকাবাসী ও পথচারীদের জন্য অন্তহীন দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাস্তা কেটে অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখায় মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে সাধারণ মানুষের চলাফেরা ও ব্যবসা-বাণিজ্য।
সরজমিনে দেখা যায়, শেওড়াপাড়া মেট্রো স্টেশন থেকে শুরু করে পশ্চিম কাজীপাড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ পর্যন্ত প্রায় ১ কিলোমিটার সড়কে চলছে এ বিশৃঙ্খল খোঁড়াখুঁড়ি। কেবল প্রধান সড়কেই নয়, পূর্ব শেওড়াপাড়ার কাফরুল এলাকার গলিগুলোয়ও আরো প্রায় ১ কিলোমিটার রাস্তা একইভাবে কেটে রাখা হয়েছে। এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ভূগর্ভস্থ লাইনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নামমাত্র হলুদ রঙের ‘ওয়ার্নিং টেপ’ ব্যবহার করা হলেও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য কোনো শক্ত বেষ্টনী নেই। দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ থাকায় এবং অযত্নে পড়ে থাকায় অনেক স্থানে সেই ওয়ার্নিং টেপও এখন আর অবশিষ্ট নেই। ফলে সরু হয়ে যাওয়া রাস্তায় ঘনবসতিপূর্ণ এ এলাকার মানুষ যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার কবলে পড়ার আশঙ্কা করছেন।
ডেসকোর ভূগর্ভস্থ কেবল স্থাপনের জন্য খোঁড়া রাস্তার মাটি ও ইটের খোয়া সড়কের ওপরই স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এর ফলে ব্যস্ত সড়ক সংকুচিত হয়ে পড়েছে। শুষ্ক মৌসুম হওয়ায় প্রতিনিয়ত উড়ন্ত ধুলোবালি পথচারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে সামান্য বৃষ্টি হলেই মাটির স্তূপ গলে কর্দমাক্ত হয়ে পড়ছে পুরো এলাকা।
ডেসকোর খোঁড়াখুঁড়ির কারণে সরু ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাওয়া রাস্তা দিয়ে একই সঙ্গে যানবাহন ও পথচারীদের চলাচল করতে হচ্ছে, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার শঙ্কা জাগাচ্ছে। এছাড়া দিন-রাত এ এলাকায় তীব্র যানজট লেগেই থাকছে। বিশেষ করে বয়োবৃদ্ধ, শিশু পথচারীরা এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন।
খোঁড়াখুঁড়ির কারণে দুর্ভোগ শুধু যাতায়াতেই সীমাবদ্ধ নেই। দেখা গেছে, শেওড়াপাড়া ও কাজীপাড়া এলাকায় রাস্তার ওপর বসানো অস্থায়ী বাজারের ময়লা-আবর্জনা ও প্লাস্টিক বর্জ্য এখন এ উন্মুক্ত গর্তগুলোয় ফেলা হচ্ছে। ময়লার পচা দুর্গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। গর্তগুলো খোলা থাকায় সেখানে পানি জমে মশার প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, যা স্থানীয়দের জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে জনভোগান্তি নিরসনে ডেসকো ও সিটি করপোরেশনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী। তাদের দাবি, দ্রুত এ আন্ডারগ্রাউন্ড কেবল স্থাপনের কাজ শেষ করে রাস্তাটি চলাচলের যোগ্য করে তোলা হোক।
কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া এলাকা মূলত দেশের ফার্নিচার ব্যবসার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। রাস্তার ঠিক পাশেই সারি সারি বড় ব্র্যান্ডের শোরুম। কিন্তু দোকানের সামনে গর্ত আর মাটির পাহাড় থাকায় ক্রেতারা ভেতরে প্রবেশ করতে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। ‘রিগ্যাল এম্পোরিয়াম’-এর ম্যানেজার সাইদুল হক বলেন, ‘১৫ রমজানের দিকে এ রাস্তা কেটে ফেলে রাখা হয়। এতে ঈদের আগে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে আমাদের বেশ অসুবিধায় পড়তে হয়, এখনো হচ্ছে। শোরুমের সামনে গাড়ি ভেড়ানোর জায়গা নেই। আমাদের ফার্নিচার ডেলিভারি দিতেও ভীষণ সমস্যা হচ্ছে।’
একই আক্ষেপ ‘লং লাইফ ফার্নিচার’-এর এক বিক্রয়কর্মীর। তিনি জানান, বিক্রি করা মালামাল গাড়িতে তুলতে অনেক দূর ঘুরতে হচ্ছে।
নির্মাণসামগ্রী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এসএস করপোরেশনের এক কর্মী জানান, এক সপ্তাহ ধরে রাস্তা কাটা থাকায় তাদের বড় গাড়িগুলো ঢুকতে পারছে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে ডেসকোকে সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘অনগেট’-এর কোনো কার্যকর তদারকি দেখা যাচ্ছে না। গর্ত খুঁড়ে ফেলে রেখে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা উধাও হয়ে গেছেন বলে অনেকের দাবি। জনবহুল এলাকা হওয়া সত্ত্বেও কাজ শেষ করে দ্রুত গর্ত ভরাট বা মাটি সরানোর কোনো উদ্যোগ লক্ষ করা যায়নি।
মাঠপর্যায়ে ডেসকোর নিয়মিত উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ‘অনগেট’-এর সাইট ইঞ্জিনিয়ার রঞ্জু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঈদের আগে যা কাজ হয়েছে, এ পর্যন্তই থাকবে। পথচারী ও যানবাহনগুলোকে সতর্ক করতে হলুদ রঙের ওয়ার্নিং টেপ দিয়ে গর্তগুলো ঘিরে দেয়া হচ্ছে। ঈদের কারণে শ্রমিকরা সব ছুটিতে থাকায় কাজ বন্ধ রাখতে হয়। এখন নতুন করে কাজ শুরু হবে।
এ ব্যাপারে কথা বলতে চাইলে ডেসকোর প্রধান প্রকৌশলী (ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড প্রজেক্ট বিভাগ) মোহাম্মদ মফিজুল ইসলাম ভূইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নিয়মিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের আওতায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আমাদের কাজ চলছে। মিরপুর, পল্লবী, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, বাড্ডা ক্ষিলখেতসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে। রমজান এবং ঈদের কারণে শ্রমিক সংকট থাকায় এ কাজগুলো এভাবে কেটে ফেলে রাখা হয়। তবে সতর্কতার জন্য আমরা হলুদ ওয়ার্নিং টেপ দিয়ে প্রকল্প এলাকা ঘিরে দিয়েছিলাম যাতে পথচারীরা সতর্ক হতে পারে। পথচারীরা বা রাস্তায় বসা হকাররা হয়তো অজ্ঞতাবশত এসব হলুদ টেপ ছিঁড়ে ফেলেছে। ঈদ শেষ হয়েছে। শ্রমিকরা ফিরতে শুরু করেছে, খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমরা কাজগুলো সেরে মাটি দিয়ে গর্তগুলো ভরাট করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা হবে। হয়তো আগামী সপ্তাহের মধ্যেই কাজগুলো আমরা সম্পন্ন করে ফেলতে পারব।’