ছেলের কণ্ঠের সেই শেষ স্মৃতি আঁকড়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি।
গতকাল নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গণ্ডগোহালী গ্রামে মোহনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। দুই ছেলে মোহন প্রামাণিক ও সুমন প্রামাণিককে হারিয়ে নির্বাক বাবা গাফফার প্রামাণিক। আর মা ময়না খাতুন বারবার কান্নায় মূর্ছা যাচ্ছেন। বাড়ির চারপাশে পড়ে থাকা নির্মাণসামগ্রী যেন সাক্ষী হয়ে আছে মোহনের অসমাপ্ত স্বপ্নের। বাড়ির নির্মাণকাজ শেষ করে দেশে ফিরে বিয়ে করার কথা ছিল মোহনের। সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।
রোববার দুপুরের দিকে সৌদি আরবের রিয়াদের শিফা এলাকার একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশী নিহত হন। তাদের মধ্যে ১৩ জনের বাড়ি নওগাঁর আত্রাই উপজেলায়। বাকি তিনজনের মধ্যে দুজনের বাড়ি নাটোর এবং একজনের বাড়ি রাজশাহীতে বলে জানা গেছে।
আত্রাই উপজেলার নিহতরা হলেন বিশা ইউনিয়নের ডুবাই গ্রামের সুমন (৩৫) ও হাসিবুল হাসান শুভ (২৭); কালিকাপুর ইউনিয়নের গণ্ডগোহালী গ্রামের মোহন প্রামাণিক, সুমন প্রামাণিক, রুবেল হোসেন (৩০) ও কলিমউদ্দিন প্রামাণিক (৩৫); পারকাসুন্দা গ্রামের আব্দুল জলিল (৩৮); বিশা গ্রামের সাগর (৩১) ও মজিদুল (৩৪); উদনপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ (৩২); বোয়ালা গ্রামের হৃদয় এবং নওগাঁ গ্রামের শাহিন।
নিহতদের প্রায় সবাই দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কাজ করছিলেন। পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করা, ঋণ শোধ করা কিংবা একসময় দেশে ফিরে স্বজনদের নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্য জীবন কাটানোর স্বপ্ন ছিল তাদের। কেউ সংসারের হাল ধরেছিলেন, কেউ জমিয়েছিলেন বাড়ি করার টাকা, কেউ আবার দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছিলেন। রিয়াদের আগুনে মুহূর্তেই থেমে গেছে সব পরিকল্পনা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নিহত ১৩ বাংলাদেশীর প্রায় সবাই পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। তাদের কেউ দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কাজ করছিলেন। উপার্জনের অর্থ দিয়ে কেউ সংসার চালিয়েছেন, কেউ ঋণ শোধ করেছেন, আবার কেউ দেশে ফিরে নতুন করে জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করছিলেন।
একসঙ্গে এত মানুষের মৃত্যুতে আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, নিহতদের মধ্যে কেউ কেউ সৌদি আরবে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থান করছিলেন। এ কারণে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কোনো আইনি জটিলতা তৈরি হলে তা দ্রুত সমাধানে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডে আত্রাই উপজেলার ১৩ জনের মৃত্যুর খবর এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া গেছে। নিহতদের পরিবারের সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে। মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।’