মন্ত্রিসভায় অনুমোদন

সচিবালয় সরিয়ে নেয়া হচ্ছে শেরেবাংলা নগরে পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠে

রাজধানীর আবদুল গনি রোড থেকে সচিবালয় সরিয়ে নেয়া হচ্ছে শেরেবাংলা নগরের পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠে। সচিবালয়ে গতকাল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে এ প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বৈঠক শেষে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান। ২০২৯ সালের মধ্যে শেরেবাংলা নগরে সচিবালয়ে অফিস করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সরকার এগোচ্ছে বলেও জানান তিনি।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানান, পুরনো বাণিজ্য মেলা প্রাঙ্গণে প্রায় ৩১ একর জমির ওপর নতুন সচিবালয় নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সেখানে প্রায় ৩১ লাখ বর্গফুট আয়তনের ভবন নির্মাণ করা হবে। ২০২৯ সালের মধ্যে নতুন সচিবালয়ে দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ প্রকল্পে ১৪টি বারোতলা ভবন, তিনটি বেজমেন্টে ৩ হাজার ৮০০ গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা, মসজিদ ও ক্যাফেটেরিয়া থাকবে। পাশাপাশি যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে আশপাশে আন্ডারপাস ও ভূগর্ভস্থ সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘ঢাকার আগের মাস্টারপ্ল্যানে যে জায়গা বরাদ্দ ছিল, সেখানেই বাংলাদেশ সচিবালয় নির্মাণ করা হবে। এটি খুব নান্দনিক স্থাপনা হবে। ওই এলাকার মূল পরিকল্পনার সঙ্গে এর কিছুটা সম্পর্ক রয়েছে, আবার পুরোপুরি এক নয়। তবে বাংলাদেশ সচিবালয় সেখানে যাচ্ছে—এটাই মূল যোগসূত্র। নতুন সচিবালয় নির্মাণের কাজ শিগগিরই শুরু হবে। সচিবালয়ের আশপাশে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বেশকিছু ভূগর্ভস্থ সড়ক ও আন্ডারপাস নির্মাণ করতে হবে।’ সব অবকাঠামোর মাধ্যমে ওই এলাকার যানবাহন চলাচলের প্রবাহ ঠিক রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

নাসিমুল গনি বলেন, ‘সচিবালয়ের মূল নকশার ধারণাটি অনুমোদন করা হয়েছে। তবে এখনো বৈদ্যুতিক, প্লাম্বিং, স্থাপত্য ও কাঠামোগত প্রকৌশল নকশাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কাজ বাকি। এসব কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। আরো কিছু বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’

নতুন সচিবালয় নির্মাণের অর্থায়ন কোথা থেকে হবে, জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, বাংলাদেশ সরকারই এ প্রকল্পের অর্থায়ন করবে। তবে এজন্য কত টাকা ব্যয় হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে প্রাক্কলন তৈরির কাজ চলছে। তবে বর্গফুটের হিসাব থেকে ব্যয়ের একটি ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

বর্তমানে আবদুল গনি রোডে সচিবালয়ের যে স্থাপনা রয়েছে, স্থানান্তরের পর সেখানে কী করা হবে, জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘ওই জায়গায় ভবিষ্যতে ভালো কিছু করা হতে পারে। পুরান ঢাকায় প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রম ও আদালত-সংক্রান্ত অনেক বিষয় আটকে রয়েছে। সেগুলোর কিছু সেখানে স্থানান্তর করা হতে পারে। তবে সেখানে ঠিক কী করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।’

বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এ প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সচিবালয়ের ১৬টি মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে মূল ভবনের বাইরে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীও সচিবালয়ের এ অংশে অফিস করছেন। প্রধানমন্ত্রী চান, পুরো সরকার যেন সমন্বিতভাবে আরো দ্রুত কাজ করতে পারে। এ লক্ষ্যেই সচিবালয় স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।’

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও বলা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশ সচিবালয় ১৭ দশমিক ৫৭ একর জায়গার ওপর অবস্থিত। সেখানে মোট ১৩টি ভবন রয়েছে, যার মধ্যে আটটি ভবন স্বাধীনতার আগে নির্মিত। সচিবালয়ের পুরনো ১, ২, ৩ ও ৮ নম্বর ভবন ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে এবং ৫ নম্বর ভবন ১৯৪৭ সালে নির্মিত হয়। এসব ভবন ভূমিকম্প সহনীয় করে নির্মাণ করা হয়নি। ঢাকা ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় এসব ভবনে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া ভবনগুলোয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবহারযোগ্য জায়গা নেই। পর্যাপ্তসংখ্যক শৌচাগার ব্লক না থাকায় এবং ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী ব্যবহার করায় স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এতে স্বাভাবিক কর্মপরিবেশও ব্যাহত হচ্ছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরো জানানো হয়, বর্তমানে সচিবালয়ে মোট অফিস স্পেস প্রায় ১৮ লাখ ৭৬ হাজার বর্গফুট। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত জায়গার চাহিদা এবং সচিবালয় কম্পাউন্ডের বাইরে থাকা মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে স্থান দেয়ার জন্য আরো ১০ লাখ বর্গফুটের বেশি অফিস স্পেস প্রয়োজন। তাই একনেক সভার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে লুই আই কানের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী শেরেবাংলা নগরের পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠে নতুন বাংলাদেশ সচিবালয় নির্মাণের জন্য স্থাপত্য অধিদপ্তর ধারণাগত স্থাপত্য নকশা প্রণয়ন করেছে। নতুন সচিবালয় প্রকল্পের নকশায় ৩ হাজার ৮০০টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে। এর মধ্যে ২০০টি ভূ-উপরিস্থ পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া প্রকল্প এলাকায় প্রায় ৩০ শতাংশ জায়গায় সবুজায়ন ও জলাধারের সংস্থান রাখা হয়েছে।

এদিকে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রিসভা। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, মন্ত্রণালয়টির নাম পরিবর্তন করে নতুন নামকরণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ ২০২৬-এর খসড়া নীতিগত চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেন, ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ ২০২৬-এর খসরা নীতিগত চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এটার প্রধান কারণ হচ্ছে যে সৌরবিদ্যুৎ আমাদের জন্য খুব এসেনশিয়াল ছিল। আগেও ছিল। এখন আরো বেশি এসেনশিয়াল হয়েছে।’

আরও