অভিজাত প্রশাসন ক্যাডারকে জনবান্ধব ও পেশাদার করতে পারবে কি বিএনপি?

অ্যাডমিন বা প্রশাসন ক্যাডারকে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ও প্রধান ক্যাডার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যার সদস্যরা সরকারের নীতিনির্ধারণ, মাঠপর্যায়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা (এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে) এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় সাধনের দায়িত্ব পালন করেন।

অ্যাডমিন বা প্রশাসন ক্যাডারকে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ও প্রধান ক্যাডার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যার সদস্যরা সরকারের নীতিনির্ধারণ, মাঠপর্যায়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা (এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে) এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় সাধনের দায়িত্ব পালন করেন। তারা মাঠপর্যায়ে সহকারী কমিশনার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) থেকে শুরু করে সচিবালয়ে নীতিনির্ধারণী পদে কাজ করেন।

মাঠ প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই দুটি ভিন্ন ভূমিকা পালন করেন—সহকারী কমিশনার এবং এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট। তারা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১০ অনুসারে একজন জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, সিনিয়র সহকারী কমিশনার (উপজেলা নির্বাহী অফিসার) এবং সহকারী কমিশনার হলেন মাঠ প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। অতিরিক্ত হিসাবে, উপধারা ১০(৫) অনুযায়ী, প্রয়োজনে, সরকার প্রশাসন ক্যাডারের যেকোনো সদস্যকে ডেপুটেশনের মাধ্যমে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ক্ষমতা প্রদান করতে পারেন। যেমন বাংলাদেশ রোড অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ), সিটি করপোরেশন, বন্দর, বিমানবন্দর ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।৷

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৬ বছরের কর্তৃত্বপরায়ণ শাসন টিকিয়ে রাখতে মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন আমলারা। একচ্ছত্র ক্ষমতা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে কাজে লাগিয়েছে তৎকালীন আওয়ামী সরকার। মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান—রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ সব স্তরেই প্রশাসন ক্যাডারের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের শাসনামলের তিনটি বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে ওঠা অভিযোগ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনটি নির্বাচনের অভিনব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে বিশেষ সেল গঠন করা হয়, যা ‘নির্বাচন সেল’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ২০১৪-২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে নির্বাচন ব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে মূলত প্রশাসনের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময়ে কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই হয়ে ওঠে নির্বাচন পরিচালনার মূল শক্তি।

গত বছর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরে কর্মরত যুগ্ম সচিব ও সমপর্যায়ের পদে থাকা প্রশাসনের ৩৩ জন কর্মকর্তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। তারা ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এছাড়া তিনটি বিতর্কিত সংসদ নির্বাচনের (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) দায়িত্বে থাকা সাবেক জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) মধ্যে যাদের চাকরির বয়স ২৫ বছর হয়েছে, এমন অন্তত ২২ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।

সে সময় বিতর্কিত নির্বাচন ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন জনবিরোধী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রশাসন ক্যাডারের শীর্ষ পর্যায়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পাশাপাশি মেগা প্রকল্পকেন্দ্রিক অনিয়ম-দুর্নীতি, বিদেশে সম্পদ গড়ার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর অনেকের প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে প্রশাসন ক্যাডারকেন্দ্রিক ক্ষমতার এ কাঠামোয় পরিবর্তন আসবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে মাথাভারী প্রশাসনিক কাঠামো ও পুরনো কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভরতার সংস্কৃতিতে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হয়নি। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের দুর্নীতি প্রতিরোধসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলোও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।

এমন বাস্তবতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সরকার গঠনের পথে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে—অভিজাত প্রশাসন ক্যাডারকে কার্যকরভাবে জনবান্ধব ও পেশাদার করা। বর্তমান কাঠামোয় নীতি বাস্তবায়ন থেকে মাঠ প্রশাসনের সমন্বয় এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষায় তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বিএনপি যদি জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়তে চায়, তাহলে শুরু থেকেই পদায়ন, মনিটরিং ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। অন্যথায় প্রশাসনের ভেতরে গড়ে ওঠা সুবিধাবাদী প্রবণতা নতুন সরকারের জন্যও চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্তমানে সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের জন্য মোট ২৬টি সার্ভিস ক্যাডার রয়েছে। এগুলো হলো প্রশাসন, কৃষি, আনসার, নিরীক্ষা ও হিসাব, সমবায়, শুল্ক ও আবগারি, পরিবার পরিকল্পনা, মৎস্য, খাদ্য, পররাষ্ট্র, বন, সাধারণ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, তথ্য, পশুসম্পদ, পুলিশ, ডাক, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল, গণপূর্ত, রেলওয়ে প্রকৌশল, রেলওয়ে পরিবহন ও বাণিজ্যিক, সড়ক ও জনপথ, পরিসংখ্যান, কর, কারিগরি শিক্ষা এবং বাণিজ্য। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী কর্মবিভাগ হিসেবে পরিচিত অ্যাডমিন বা প্রশাসন ক্যাডার। সরকারি কর্মচারী বাতায়নের তথ্য মতে, বর্তমানে জনপ্রশাসনে ৬ হাজার ৫৪১ জন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা রয়েছেন। এদের মধ্যে সচিব ও সিনিয়র সচিব পদে কর্মরত রয়েছেন ৭১ জন।

সরকারের উচ্চপদে পদায়নে বৈষম্য নিরসনসহ বেশকিছু লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭৯ সালে সিনিয়র সার্ভিস পুল (এসএসপি) চালু করেছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। জনমুখী, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও দক্ষ প্রশাসন কাঠামো গড়ে তুলতে এসএসপির মাধ্যমে সে সময় লিখিত পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে উচ্চপদের জন্য বিভিন্ন ক্যাডারের মধ্যে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা হয়। এতে জনপ্রশাসনে প্রশাসন ক্যাডারের প্রাধান্য কমে যাওয়ার বাস্তবতা তৈরি হয়। তাই সে সময় প্রশাসন ক্যাডারদের একটি অংশ এর বিরোধিতা করে। ফলে এ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সেভাবে গতি আসেনি। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর এসএসপির কার্যক্রম অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং পরবর্তী সময়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সরকার সেটি বাতিল করলে প্রশাসন ক্যাডারের কর্তৃত্ব পাকাপোক্ত হয়।

অভিযোগ রয়েছে, বিগত দেড় দশকের বেশি সময় আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। আর এসব কর্মকর্তার বেশির ভাগই প্রশাসন ক্যাডার থেকে আসা। আওয়ামী সরকারের সময় মাঠ প্রশাসন দলীয়করণের মাধ্যমে কর্তৃত্ববাদী শাসন দীর্ঘায়িত করতে তারা প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেন। এ সময় রাজনৈতিক আনুগত্যকে নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির ক্ষেত্রে প্রধান যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অনুগত আমলাদের পুরস্কার দিতে তৈরি করা হয় ‘সিনিয়র সচিব’ পদ। পদায়নের আগে পুলিশ ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিতের পর নিয়োগ চূড়ান্ত করা হতো। বিগত পতিত সরকারের আমলে বিদেশে বড় অংকের সম্পদ গড়া বাংলাদেশীদের মধ্যে বড় অংশই সরকারি আমলা। কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বাড়ি কেনা, ব্যবসায় বিনিয়োগ, ব্যাংক হিসাবে অর্থ রাখা কিংবা তাদের পরিবারের সদস্যদের ওই সব দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণের বিষয়গুলো আলোচনায় এসেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পতন ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। তবে আরো অনেক ক্ষেত্রের মতো জনপ্রশাসনে কোনো উল্লেখযোগ্য সংস্কার দৃশ্যমান হয়নি। মন্ত্রিপরিষদ, প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব, নির্বাচন কমিশনের সচিব, স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জনপ্রশাসনে মেধাভিত্তিক নিয়োগ-পদায়ন, দলীয়করণ কমানো, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং জবাবদিহি নিশ্চিতের মতো পদক্ষেপ দ্রুত দেখা যাবে—এমন আশাবাদ ছিল অনেকের। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের আধিক্য, ‘সিনিয়র সচিব’ পদে ঢালাওভাবে পদায়ন, বিভিন্ন স্তরে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি ও সুপারিশনির্ভর সিদ্ধান্তের ফলে প্রশাসনের মাথাভারী কাঠামো বজায় ছিল। ওপরের দিকে অতিরিক্ত জনবল, আর মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় লোকবলের ঘাটতি—এ সংকটও আগের মতো রয়ে গেছে। জবাবদিহির ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। সব মিলিয়ে যে ধরনের সংস্কার প্রক্রিয়া জনপ্রশাসনকে আরো জনবান্ধব, পেশাদার, নিরপেক্ষ ও কার্যকর করতে পারত, তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রশাসনিক ভঙ্গুরতারও কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এমন বাস্তবতায় দীর্ঘ সময় পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসতে যাওয়া বিএনপির সামনে জনপ্রশাসন পুনর্গঠন একটি বড় নীতিগত ও প্রশাসনিক পরীক্ষায় পরিণত হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গত দেড় দশকে গড়ে ওঠা পদায়ননির্ভর ক্ষমতা কাঠামো, দলীয় আনুগত্যভিত্তিক পদোন্নতির সংস্কৃতি এবং শীর্ষ পর্যায়ে কেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক প্রভাব—এসবের মধ্যেই নতুন সরকারকে কাজ শুরু করতে হবে। ফলে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনের ভেতরে বিভিন্ন সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের মতো দেশে নতুন কোনো সরকার ক্ষমতায় এলে আমলাতন্ত্রের বিভিন্ন সুবিধাবাদী গোষ্ঠী সরকারকে ঘিরে ধরার চেষ্টা করে। তারা নিজেদের সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। তাই বিএনপি সরকারকে শুরু থেকেই সতর্ক থাকতে হবে। সচিব, সংস্থাপ্রধান থেকে শুরু করে মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সব পদায়ন দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে হতে হবে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে জড়িতদের মনিটরিংয়ের আওতায় রাখা, ভালো কাজের পুরস্কারের পাশাপাশি অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, ‘আগামীতে সরকার যদি সত্যিই দেশকে ভালোভাবে পরিচালনা করতে চায়, তাহলে সব জায়গায় মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা, সততা, সুনামের ভিত্তিতে এবং প্রতিশ্রুতিশীল ব্যক্তিদের দিয়েই প্রশাসন সাজাতে হবে। তা না হলে ভালো ফল পাওয়া কঠিন হবে।’

কার্যকর প্রশাসন গড়ে তুলতে করণীয় বিষয়ে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র পরিচালনায় যারা সততা, পেশাদারত্ব ও দক্ষতার মাধ্যমে বাস্তব সহায়তা করতে পারবে, এমন ব্যক্তিদেরই বেছে নিতে হবে। সরকার যদি সচিব, সংস্থাপ্রধান, ডিসি, কমিশনারসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ্য, দক্ষ ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিতে পারে, তাদের উৎসাহ দেয়, নিয়মিত মনিটরিং করে এবং জবাবদিহিতার মধ্যে রাখে, তাহলে কার্যকর প্রশাসন গড়ে তোলা কঠিন হবে না।’

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে দলীয় ইশতাহার ঘোষণা করে বিএনপি। ইশতাহারে তারা সুশাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করে। দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মেধাভিত্তিক নিয়োগ, প্রশাসনিক সংস্কার, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গঠন, শক্তিশালী পাবলিক কমিশন, বেসরকারি সার্ভিস রুল প্রণয়ন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে পেশাদারত্ব বৃদ্ধি ও দলীয়করণ রোধসহ দলটি বেশকিছু ম্যান্ডেট জনগণের সামনে উপস্থাপন করে।

সরকার গঠনের পর জনপ্রশাসন নিয়ে বিএনপির সামনে কোনো চ্যালেঞ্জ রয়েছে কিনা জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক এক সচিব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আশা করব দলটি ইশতাহারে যেটুকু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা বাস্তবায়ন করবে। জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গঠনে তাদের ইশতাহারে বিস্তারিত রয়েছে। তবে সেগুলো বাস্তবায়ন হতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দীর্ঘ সময় পর একটি বিশেষ রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় বসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার অন্যতম প্রধান দাবি ছিল মেধাভিত্তিক সিভিল সার্ভিস গড়ে তোলা। কিন্তু বাস্তবতা হলো দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের ভেতরে পেশাদারত্বের চেয়ে সিনিয়রিটি, দলীয় আনুগত্য বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক আনুগত্য বেশি গুরুত্ব পাওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।’

প্রশাসনকে জনবান্ধব ও পেশাদার করতে বিএনপির চ্যালেঞ্জ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নতুন (বিএনপি) সরকার যদি সত্যিকার অর্থে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে গেঁড়ে বসা প্রশাসনিক সংস্কৃতি ভাঙা বড় একটি চ্যালেঞ্জ হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি মেধা, দক্ষতা ও পারফরম্যান্স—এ তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকেন, তাহলে পরিবর্তন আনা অসম্ভব নয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং বাস্তব সংস্কার পদক্ষেপ—এ তিনটি একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’

সরকারের একজন সচিব ও দুজন অতিরিক্ত সচিবের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। নাম প্রকাশ না করে তারা জানান, বিগত আমলে বঞ্চিত হয়েছেন এমন অনেক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা বিভিন্ন পদে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করছেন। তারা মূলত দায়িত্ব পেতে চান। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন একটি পলিসি অ্যাডভাইজরি কমিটি গঠন করে তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জ্বালানি, কৃষিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে নিয়োজিত করা যেতে পারে। তাহলে উনাদের পরামর্শ সরকার কাজে লাগাতে পারবে। কিন্তু আগের মতো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা হলে জনপ্রশাসন ফাংশনাল হবে না। তারা বলেন, যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে চলতি কর্মকর্তাদের পদায়ন হওয়া প্রয়োজন। সুশাসন নিশ্চিতে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুরস্কারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অন্যদিকে যারা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়াবেন তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ প্রসঙ্গে এরই মধ্যে বলেছেন। মেরিটোক্রেসি (মেধাতন্ত্র) হবে প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। যিনি যে কাজে দক্ষ সে অনুযায়ী কাজ ভাগ করে দেয়া হবে। এখানে দল-মত কিংবা ধর্ম নয়, দক্ষতাই মুখ্য বিষয় হবে।’

আরও