আইন ভেঙে ঢাকার ভালো মাঠ পার্ক অভিজাত সোসাইটিকে দিচ্ছে রাজউক ও সিটি করপোরেশন

উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ শেষে ২০২২ সালের ১৯ ডিসেম্বর উদ্বোধন করা হয় রাজধানীর গুলশান ২ নম্বরে অবস্থিত শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্ক। এতে ব্যয় হয় প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকা।

কিন্তু উদ্বোধনের দুই বছর পর ২০২৪ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) পার্কটির পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয় গুলশান ইয়ুথ ক্লাবকে। তবে এর আগে থেকেই পার্কের একটি বড় অংশ ক্লাবটির নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে পুরো পার্কের নিয়ন্ত্রণ কার্যত ওই ক্লাবের হাতে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ক্লাবটি পার্কের মূল নকশায় পরিবর্তন এনে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করেছে। শুধু তা-ই নয়, পার্কসংলগ্ন মাঠে খেলাধুলা করতে ঘণ্টাপ্রতি ১ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত ফি দিতে হয়। সম্প্রতি পার্কটিতে ‘গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক ও ক্রীড়া কমপ্লেক্স’ নাম লেখা নতুন সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে।

অন্যদিকে প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয় গুলশানের শহীদ ডা. ফজলে রাব্বি পার্ক। উদ্বোধনের সময় এটিকে দেশের প্রথম ‘স্মার্ট পার্ক’ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। তৎকালীন মেয়রও ঘোষণা করেছিলেন, শুধু গুলশান বা নিকেতন সোসাইটির জন্য এ পার্ক নয়, বরং উন্মুক্ত থাকবে সবার জন্যই। খেটে খাওয়া মানুষও এ পার্কে আসতে পারবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। স্থানীয়দের দাবি, বর্তমানে পার্কটির নিয়ন্ত্রণ গুলশান ও নিকেতন সোসাইটির হাতে। পার্কটি খোলা কিংবা বন্ধও হয় এসব সংগঠনের নির্দেশে।

সম্প্রতি ডা. ফজলে রাব্বি পার্কে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটকসহ বাকি দুটি ফটকই বন্ধ। নিরাপত্তকর্মীদের কাছে পার্কের ফটক বন্ধ থাকার কারণ জানতে চাইলে তারা বলেন, গুলশান সোসাইটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে পার্কটি দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বন্ধ রাখতে। কেন বন্ধ রাখতে হবে এর সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর নিরাপত্তাকর্মীরা দিতে পারেননি। তবে তারা বলেছেন, এ সময় বাইরের মানুষজন বেশি থাকে, তাদের প্রবেশ সীমিত করার জন্যই এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে থাকতে পারে। তাছাড়া এ সময় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও গাছের পরিচর্যা করা হয় বলে জানান তারা।

নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনগণের টাকায় সংস্কার করে পার্কগুলোকে কোনো সংস্থা, সোসাইটি, প্রতিষ্ঠান কিংবা ক্লাবের কাছে হস্তান্তর করা সম্পূর্ণ বেআইনি সিদ্ধান্ত। সিটি করপোরেশন ও রাজউক আইন-বহির্ভূতভাবে এ কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে তারা বলেন, এসব পার্ক ও মাঠ ভাড়া দিয়ে ক্লাবগুলো বাণিজ্য করছে, ভূমির শ্রেণী পরিবর্তন করে অফিস নির্মাণ করছে। এগুলো সবই বেআইনি কার্যক্রম।

মহানগরী, বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরের পৌর এলাকাসহ দেশের সব পৌর এলাকার খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০-এ বলা হয়েছে, ‘এ আইনের বিধান ব্যতীত, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার হিসাবে চিহ্নিত জায়গার শ্রেণী পরিবর্তন করা যাইবে না বা উক্তরূপ জায়গা অন্য কোনোভাবে ব্যবহার করা যাইবে না বা অনুরূপ ব্যবহারের জন্য ভাড়া, ইজারা বা অন্য কোনোভাবে হস্তান্তর করা যাইবে না। এ আইনের৷ ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এই ধারার উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, কোনো উদ্যানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট হয় এইরূপে উহার বৃক্ষরাজি নিধনকে উদ্যানটির শ্রেণী পরিবর্তনরূপে গণ্য করা হইবে।’

গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক ক্লাবের ব্যবস্থাপনায় দেয়ার বিরুদ্ধে আইনি তৎপরতায় যুক্ত রয়েছেন অ্যাডভোকেট মাহবুবুল আলম। তিনি পার্কটির ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, ‘রাজউক ২০১৩ সালে এ মাঠ থেকে সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য নির্দেশনা প্রদান করে। গুলশান ইয়ুথ ক্লাব এ আদেশের বিরুদ্ধে রিট করে। আদালত এ রিট খারিজ করে দেন এবং মাঠের অবৈধ স্থাপনার উচ্ছেদের নির্দেশনা প্রদান করেন। তার পরও প্রথমে তৎকালীন মেয়র আতিকুল ইসলাম এবং সর্বশেষ রাজউক আবার পার্ক ও মাঠটি দখলদার গুলশান ইয়ুথ ক্লাবকেই হস্তান্তর করেছে।’

গুলশান সেন্ট্রাল পার্কের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গুলশান ইয়ুথ ক্লাবকে দিয়েছে ডিএনসিসি

ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী

সম্প্রতি এ পার্কে গিয়ে দেখা যায়, পার্কটির ভেতরে গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের অফিস, ক্যাফে ও পার্কিং নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া একটি সুইমিং পুল নির্মাণাধীন রয়েছে। এসব স্থাপনা পার্কের শ্রেণী পরিবর্তন করেই করা হয়েছে বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

গত বছরের আগস্টে ডিএনসিসির সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ পার্কটির ক্যাফেটেরিয়ায় একটি কক্ষকে আল মাহমুদ স্মৃতি পাঠাগার হিসেবে উদ্বোধন করেন। অভিযোগ উঠেছিল, মূলত পার্ক দখল করে গড়ে ওঠা ক্যাফেটেরিয়াকে বৈধতা দেয়ার জন্যই কাজটি করা হয়েছিল।

গত বছরের ১৫ নভেম্বর রাজউক অভিযান পরিচালনা করে ক্যাফেটেরিয়াটি সিলগালা করে দেয়। কিন্তু চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল রাজউকই আবার গুলশান ইয়ুথ ক্লাবকে পার্কটির পরিচালন, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়। এ ঘটনায় স্থানীয়রা ছাড়াও ক্ষোভ জানিয়েছেন অনেক বিশিষ্ট নাগরিক।

জানতে চাইলে গুলশান ইয়ুথ ক্লাব লিমিটেডের প্রেসিডেন্ট ডা. ওয়াহিদুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজউক কেন আমাদের পার্কটি দিয়েছে, কোন আইনের ভিত্তিতে দিয়েছে এটা তারাই ভালো বলতে পারবে। আমরা মাঠ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যারা খেলতে আসে তাদের থেকে ফি নিয়ে থাকি—এটা সত্য। তবে এখানে ফ্রি খেলার সুযোগও আছে।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক ইয়ুথ ক্লাবকে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দিয়েছি শুধু। রাজউক কোনো মাঠ-পার্ক নির্মাণ করলে সেটি কোনো না কোনো সংস্থাকে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়। তবে শর্ত থাকে এটা কোনোভাবেই বাণিজ্যিক ব্যবহার করা যাবে না, শ্রেণী পরিবর্তন করা যাবে না। আরো অনেক শর্ত থাকে। এসব শর্ত ভঙ্গ করলে আমরা তাদের সঙ্গে ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত চুক্তিটি বাতিল করি। ইয়ুথ ক্লাবকেও আমরা একই শর্তে গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক দিয়েছি। এর আগে একবার সেখানে আমরা তাদের কফি শপ, অফিস সিলগালা করেছি। তারা আবার শর্ত ভঙ্গ করলে তাদের বিরুদ্ধে বিধিমতো ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

রাজধানীর আরেক অভিজাত এলাকা বনানীর ২৭ নম্বর সড়কে অবস্থিত কামাল আতাতুর্ক পার্কটি ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার শেষে উদ্বোধন হয়। পার্কটি উত্তর সিটি করপোরেশন নিজের তত্ত্বাবধানেই রেখেছে। কিন্তু পার্কটিতে সামাজিক অনুষ্ঠান, মেলা, কনসার্ট, মৌসুমি বাজার বসানোর জন্য ভাড়া দিচ্ছে খোদ ডিএনসিসিই। এতে বছরের অনেকটা সময় পার্কটি বন্ধ থাকে। গত রমজান মাস থেকে শুরু করে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পার্কটি পাঁচবারের বেশি বিভিন্ন বিরতিতে বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানান পরিবেশকর্মী নয়ন সরকার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘রমজান মাসে ইফতার বাজার, এরপর ঈদের মেলা, বৈশাখী মেলা, কনসার্টসহ নানা কারণেই মাসের বেশির ভাগ সময় পার্কটি বন্ধ থাকে। এছাড়া পার্কটি যখন খোলা থাকে তখনো ওয়াশরুম, মেইন গেট বন্ধ থাকে। পার্কটিকে সিটি করপোরেশন মূলত রাজস্ব বৃদ্ধির জন্যই ব্যবহার করছে।’

কামাল আতাতুর্ক পার্ক ভাড়া দিয়ে সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সংস্থাটির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খানও। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমরা মাঠটি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংস্থাকে ভাড়া দিয়ে থাকি। তারা অনুষ্ঠান করে। এটা আইনত নিষিদ্ধ কিনা সেটা সম্পত্তি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানাব।’

রাজধানীর বনানীতে ছোট-বড় ছয়টি মাঠ ও পার্ক রয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগই বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বনানী সোসাইটির সভাপতি শওকত আলী ভূইয়া (দিলন)। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বনানীর মাঠগুলোতে স্থানীয় ছেলেমেয়েরা খেলতে পারে না। চেয়ারম্যানবাড়ি মাঠ, সি ব্লক মাঠ পার্ক, বি ব্লক পার্ক, কামাল আতাতুর্ক পার্ক—এগুলোর কোনোটি দখল হয়ে আছে, আবার কোনোটি সরকার লিজ দিয়ে রেখেছে। মূলত সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলামের সময় থেকেই মাঠ-পার্কগুলো বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার শুরু হয়। এগুলোর পরিচালনার দায়িত্ব কোনো কোম্পানি বা ক্লাবকে কেন দেয়া হচ্ছে, যারা এ স্থাপনা থেকে আয় করছে।’

মাঠ-পার্ক পরিচালনা কিংবা ব্যবস্থাপনার নামে ক্লাব বা কোনো সোসাইটিকে হস্তান্তর করা মূলত এক রকম দখল প্রক্রিয়ার অংশ বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের (ইউআরপি) অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘মাঠ-পার্ক তো স্থানীয় কমিউনিটি পরিচালনা করবে, এটাই নিয়ম। কিন্তু কোনো অভিজাত ক্লাব, প্রতিষ্ঠান কিংবা সোসাইটিকে এসব গণপরিসর হস্তান্তর করা বেআইনি। চূড়ান্ত দখল শুরুর প্রক্রিয়াটা এমনই হয়। আমরা দেখেছি, রাজধানীর অনেক মাঠ-পার্ক শুরুতে পরিচালনার কথা বলে কোনো ক্লাবকে দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে সে ক্লাব মাঠ রক্ষণাবেক্ষণের নামে মাঠ ভাড়া দেয়, মেলা করে, পার্কের ভেতর অফিস বানায়। রাজউক-সিটি করপোরেশনকে এ বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন করলে তারা বলেন যে আমরা তো জানি না বা জেনে ব্যবস্থা নেব। কিন্তু তারা সবই জানেন। ক্ষেত্রবিশেষে তারাই পরিচালনার কথা বলে ক্লাব বা প্রতিষ্ঠানের কাছে মাঠ হস্তান্তর করেন। এ ধরনের চর্চা পুরোপুরি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।’

জানা গেছে, রাজধানীসহ দেশের পার্ক ও খেলার মাঠ পরিচালনার জন্য এখনো কোনো গাইডলাইন নেই। এ কারণে কোথাও কোথাও পার্ক বা মাঠে বিভিন্ন ক্লাব ও সোসাইটির কর্তৃত্ব করার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কোনো সোসাইটি চাইলেই ঢাকার মতো একটি শহরের পার্ক দিনেদুপুরে বন্ধ করে রাখবে আর করপোরেশন সে বিষয়ে নিশ্চুপ থাকবে তা আসলে দুঃখজনক। ডিএনসিসির মালিকানাধীন পার্ক প্রাইভেট পার্কের মতো ব্যবহার কাম্য নয়। কারো যদি ব্যক্তিগত পার্ক থাকে সেটা চাইলে সে টিকিট সিস্টেমও করতে পারে। কিন্তু করপোরেশনের পার্ক, জনগণের পার্ক সবসময় উন্মুক্ত রাখতে হবে। এখানে একজন অভিজাত যেমন ঢুকবেন, একইভাবে একজন ছিন্নমূলও মানুষও বসে বিশ্রাম নিতে পারবেন। কোনো সোসাইটি যদি পার্ক পরিচালনার দায়িত্বে থাকে সেটাও তত্ত্বাবধান করবে সিটি করপোরেশন। কিন্তু আমরা দেখছি, ডিএনসিসির নাকের ডগায় থাকা একটি পার্কে দীর্ঘদিন জনসাধারণ প্রবেশ করতে পারছেন না। অথচ তারা এ ব্যাপারে নীরব। এটা দুঃখজনক ব্যাপার।’

আরও