সাধারণ মানুষকে আবাসনে সরকারিভাবে প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেয় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। লটারির মাধ্যমে আবাসন নিশ্চিত হয় গ্রাহকের। গতপূর্ত অধিদপ্তর সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আবাসন প্রকল্প নিলেও গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ প্রকল্প নেয় সাধারণ মানুষের জন্য। তবে চট্টগ্রামে দপ্তরটির চলমান পাঁচটি প্রকল্পের সবই থমকে রয়েছে। এ অবস্থায় প্লট, ফ্ল্যাট বা দোকান বরাদ্দ নিয়ে তা বুঝে পাচ্ছেন না সাধারণ গ্রাহক।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণ মানুষের সরকারি প্রকল্পে আগ্রহ বেশি হলেও সেখানেই গড়িমসি করা হচ্ছে। গ্রাহক প্লট বা ফ্ল্যাট নিলেও বছরের পর বছর অপেক্ষা করছেন। প্লট বা ফ্ল্যাট বুঝে না পাওয়ায় ক্ষতিপূরণও পান না তারা। সমন্বয়হীনতা, বাজেটের ধীরগতি, ঠিকাদারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ না করার কারণে চলমান প্রকল্পকাজ শেষ হচ্ছে না।
তবে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পগুলো কয়েক দফা সংশোধন করা হয়েছে। এখন বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো সম্ভব না। যে ঠিকাদাররা কাজ নিয়েছে, তারা জেনে-বুঝেই নিয়েছেন। তারা সময়মতো কাজ করলে প্রকল্পগুলো এত দেরি হতো না। গ্রাহককে সময়মতো প্লট বা ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেয়া যেত।
চট্টগ্রাম গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, বর্তমানে চট্টগ্রামে পাঁচটি প্রকল্পের কাজ চলমান। তবে তার বেশির ভাগই স্তিমিত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে নোয়াখালীর মাইজদীতে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য প্লট উন্নয়ন প্রকল্প, চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রকল্প, ফিরোজশাহ-হালিশহর আবাসিক প্লট নির্মাণ প্রকল্প, হালিশহরে মাল্টি পারপাস টাওয়ার নির্মাণ প্রকল্প এবং হালিশহরে আবাসিক নির্মাণ প্রকল্প (চতুর্থ পর্যায়) হাতে নিয়েছে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ।
সংস্থাটির তথ্যমতে, মিরসরাই উপজেলার কিসমত জাফরাবাদ মৌজায় মধ্যম আয়ের লোকদের জন্য সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয় ২০১৫ সালে। প্রায় ১৬ দশমিক ২৮ একরের ১৬৩টি প্লট ও চারটি বাণিজ্যিক প্লটের জন্য প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। কাজের জন্য ২০১৬ সালে চুক্তি করা হয়। প্রায় ৪২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৬৩টি প্লট গ্রাহকের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রকল্পটির ডিপিপি কয়েক দফা পরিবর্তন করা হলেও কাজ এখনো শুরু না হওয়ায় প্লট বুঝে পাননি কোনো গ্রাহক।
এদিকে নোয়াখালীর মাইজদিতে ২০১৭ সালে ৩ দশমিক ৮৫ একর জমিতে বিভিন্ন সাইজের ৪০টি প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রকল্পটির জন্য কয়েক দফা ডিপিপি সংস্কার করেও কাজ শুরু হয়নি এখনো। ১৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকার প্রকল্পটির সংশোধিত ডিপিপি অনুযায়ী ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বেড়েছে। প্লট বরাদ্দ দিতে না পারলেও তিনটি ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পও নিয়েও বিপাকে রয়েছে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে চট্টগ্রাম নগরীতে ২০১৩ সালে ফিরোজশাহ-হালিশহর আবাসিক প্লট নির্মাণ প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়। নানা জটিলতার পরও প্রকল্পটি কাজের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয় ২০১৭ সালে। ১ দশমিক ৫৫ একর জায়গার ওপর প্রায় ৩৪২ কোটি টাকার এ প্রকল্পে ১০ তলার চারটি ভবনে ৩৪২টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটির বর্ধিত মেয়াদ রয়েছে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে ঠিকাদার তিনটি ভবণ নির্মাণে ধীরগতি অবলম্বন করছেন বলে জানিয়েছেন খোদ গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা।
এছাড়া হালিশহরের এ ব্লকে মাল্টিপারপাস টাওয়ার নির্মাণ প্রকল্পটির কাজ থেমে আছে মামলা জটিলতায়। প্রায় ১ দশমিক ৩৫৯৮ একর জমিতে সাততলার এ বাণিজ্যিক ভবনে ৩১৯টি দোকান নির্মাণ করার কথা। একই এলাকার জি ব্লকে আবাসিক নির্মাণ প্রকল্পের (চতুর্থ পর্যায়ে) অধীনে ২ দশমিক ২৩ একর জমিতে ৩১২টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। এসব ফ্ল্যাটও গ্রাহককে বুঝিয়ে দিতে পারেনি মামলা জটিলতার কারণে।
হালিশহরের প্রকল্প সম্পর্কে কর্মকর্তারা জানান, টাওয়ার ও আবাসন নির্মাণে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিবিএল কমপ্রিহেনসিভ হোল্ডিং লিমিটেডের (জেভি) সঙ্গে চুক্তি করে। কিন্তু কাজের ধীরগতি ও কাজ বন্ধ রাখায় তাদের একাধিকবার নোটিস দেয়া হলেও অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। সেজন্য পরে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ চুক্তি বাতিল করে। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনে মামলা করে। শুনানির জন্য কাজটি দেড় বছরের বেশি সময় বন্ধ। আদালতের রায় ছাড়া কাজও চালু করা যাচ্ছে না।
তবে কাজ কেন সময়মতো শেষ করা যাচ্ছে না—এমন প্রশ্নে ঠিকাদাররা জানান, গৃহায়ন অধিদপ্তরের প্রকল্পগুলো যখন বাজেট বরাদ্দ হয়, সেটা ২০১৪ সালের নিয়মানুযায়ী দেয়া হয়। কিন্তু অর্থছাড়, প্রকল্পের কাজের দীর্ঘসূত্রতার কারণে শুরু করতে দেরি করেছে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২০১৪ সালের বাজেট অনুযায়ী কাজ করা সম্ভব নয়। প্রতিটি জিনিসের দাম দ্বিগুণের বেশি। আগের বাজেট দিয়ে তারা কাজ শেষ করতে পারছেন না। প্রকল্পগুলো সঠিক সময়ে বুঝিয়ে দিলে বাজেট নিয়ে কোনো সমস্যা হতো না।
সার্বিক প্রসঙ্গে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (চট্টগ্রাম সার্কেল) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ মোক্তার হোসেন দেওয়ান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিভাগে আমাদের পাঁচটি প্রকল্পের কাজ চলছে। কিন্তু বাজেট, ডিপিপি, আদালতে মামলা ইত্যাদি কারণে প্রতিটি প্রকল্পের কাজ আটকে আছে। কিছু প্রকল্পের কাজ আগে নেয়া হলেও নানা জটিলতার কারণে তা করতে পারিনি। এতে অনেককে প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেয়া হলেও সেগুলো বুঝিয়ে দেয়া যাচ্ছে না। আমাদের কাছে প্লট বা ফ্ল্যাট গ্রহীতারা আসেন, কিন্তু কাজগুলো শেষ না হওয়ায় হস্তান্তর করা যাচ্ছে না।’