দেশে উচ্চ শিক্ষা

কলা ও মানবিকে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী হলেও নেই আন্তর্জাতিক মান

উচ্চ শিক্ষায় দেশের সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন কলা ও মানবিক বিষয়ে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৪২ শতাংশই এ অনুষদের বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনা করছেন।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী এ ধারার বিষয়গুলো নিয়ে পড়ছেন। তবে শিক্ষার্থীর সংখ্যায় এগিয়ে থাকলেও আন্তর্জাতিক একাডেমিক মানে পিছিয়ে দেশের কলা ও মানবিক শিক্ষা। যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থা কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডস (কিউএস) ২০২৬-এর বিষয়ভিত্তিক রÅvংকিংয়ে এসব বিষয়ে বিশ্বের ৫৫২টি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থান পেয়েছে, যেখানে নেই বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়।

দেশের প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সিলেটের শাহজালাল (শাবিপ্রবি), যা ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে মোট ছয়টি অনুষদের অধীনে ২৭টি বিভাগ রয়েছে। এসব বিভাগের বেশির ভাগেই মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ৪০০-এর কম। মাত্র চারটির শিক্ষার্থী ৪০০-এর অধিক, তার মধ্যে একটি বাংলা বিভাগ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় হলেও শাবিপ্রবির স্নাতক পর্যায়ের ভর্তির আসন বিন্যাসেও কলা, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি। মোট আসনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই রাখা হয়েছে স্কুল অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের আওতাধীন বিষয়গুলোর জন্য। দেশের আরো কয়েকটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রায় একই চিত্র। কোনো কোনোটিতে আবার কলা ও মানবিক অনুষদভুক্ত বিষয়ের আধিক্য।

ইউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৫৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ৪৫ লাখ ৭৮ হাজার ৩৬২ জন। ১১টি অনুষদের আওতাধীন বিভিন্ন বিষয়ে এসব শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী রয়েছেন কলা ও মানবিক অনুষদে, ১৯ লাখ ৮ হাজার ৮৩৯ জন। মোট শিক্ষার্থীর হিসাবে এ হার ৪১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও কলা ও মানবিক বিষয়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী রয়েছেন। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৪১৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩৯ হাজার ২১৫ জন, অর্থাৎ ১০ দশমিক ৯৪ শতাংশ কলা ও মানবিক অনুষদের বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যয়ন করছেন। অথচ দেশের উচ্চ শিক্ষায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের বড় এ অংশের নেই কোনো আন্তর্জাতিক গুণগতমান।

কিউএস সাধারণত একাডেমিক সুনাম, নিয়োগকর্তাদের মূল্যায়ন, গবেষণাপত্রের সাইটেশন, আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতসহ বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাংকিং করে। সামগ্রিক র‍্যাংকিংয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক র‍্যাংকিংও প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের কলা ও মানবিক বিষয়ভিত্তিক র‍্যাংকিং ২০২৬-এ বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় স্থান না পেলেও প্রতিবেশী ভারতসহ এশিয়ার মোট ১৩১টি জায়গা করে নিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে চীনের, ২৬টি। এছাড়া জাপানের ১৪টি, মালয়েশিয়ার ১০টি, হংকংয়ের আটটি, ভারতের পাঁচটি ও সিঙ্গাপুরের দুটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে এ তালিকায়। এ তালিকায় শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড। এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর।

প্রতিবেশী ভারত যেখানে কলা ও মানবিক বিষয়ে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে নিতে পেরেছে, সেখানে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান না পাওয়া এ খাতের গবেষণা ও একাডেমিক সক্ষমতার দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। তাদের মতে, কলা ও মানবিক বিষয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা বেশি হলেও গবেষণা ও একাডেমিক উৎকর্ষের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা তুলনামূলক কম। সরকারি উদ্যোগ ও বরাদ্দের ঘাটতি, গবেষণায় অনীহা, আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে গবেষণা প্রকাশের সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘদিন ধরে পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন না হওয়ায় ইতিহাস, সাহিত্য ও দর্শনের মতো মৌলিক বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পিছিয়ে পড়ছে।

আন্তর্জাতিক গবেষকদের সঙ্গে যৌথ গবেষণার সুযোগ ও উদ্যোগের ঘাটতিও এক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষকদের আন্তর্জাতিক সম্মেলন, যৌথ গবেষণা প্রকল্প এবং বৈশ্বিক একাডেমিক নেটওয়ার্কে সম্পৃক্ততা সীমিত হওয়ায় দেশের কলা ও মানবিক বিষয়ের গবেষণা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রয়োজনীয় দৃশ্যমানতা পাচ্ছে না বলে জানান শিক্ষাবিদরা।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম বণিক বার্তাকে বলেন,”‘আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া কিউএস র‍্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শ্রমবাজারের চাহিদাসহ আরো কিছু বিষয় বিবেচনা করা হয়। আর এসব ক্ষেত্রেই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পিছিয়ে আছে। সামগ্রিকভাবেই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণাবান্ধব পরিবেশ নেই, বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল। আবার যতটুকুও বরাদ্দ দেয়া হয় সেখানে সাধারণত বিজ্ঞান-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পায়।’

তিনি আরো বলেন, ‘কলা অনুষদভুক্ত বিষয়গুলোয় গবেষণা হয় না এমনটা নয়, তবে মানসম্পন্ন গবেষণার ঘাটতি আছে। অনেক ক্ষেত্রে গবেষণা পদ্ধতি এখনো সনাতন রয়ে গেছে। এছাড়া এ ধরনের গবেষণা পিআর রিভিউড জার্নালে প্রকাশ তুলনামূলক কঠিন, আর বিশ্বমানের জার্নালে প্রকাশনা না বাড়ালে আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে দৃশ্যমান হওয়া অসম্ভব।”আবার যদি শ্রমবাজারের কথা বিবেচনা করি তাহলে সেক্ষেত্রেও এ অনুষদের অনেক বিষয় পিছিয়ে আছে। শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশই শিক্ষাজীবন শেষে বেকার থাকছেন।’

ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে কলা ও মানবিক অনুষদভুক্ত বিষয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশই পড়াশোনা করছেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কলা ও মানবিক বিষয়ে শিক্ষার্থীর আধিক্য অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় অনেক বেশি। এর মধ্যে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর ৮৯ শতাংশই কলা ও মানবিক অনুষদভুক্ত বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যয়নরত। ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ হার ৬০ দশমিক ৯৮ শতাংশ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

বিপরীতে ৫০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ কলা ও মানবিক অনুষদভুক্ত বিষয়ে অধ্যয়ন করছেন। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থীর বড় একটি অংশ এ অনুষদের বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনা করছেন।

ইউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ২৯ হাজার ৬৫১ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৮ হাজার ১৩৫ জন কলা ও মানবিক অনুষদের বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যয়ন করছেন। মোট শিক্ষার্থীর হিসাবে এ হার ২৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ। শিক্ষার্থী সংখ্যার দিক থেকে এ হারে দ্বিতীয় অবস্থানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার সময় বিশ্ববিদ্যালয়টির যে কয়েকটি অনুষদ ছিল, তার মধ্যে অন্যতম কলা। প্রতিষ্ঠার ১০৬ বছর পরও বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ৩৫ হাজার ৬৯৬ শিক্ষার্থীর মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক ৭ হাজার ৮৯২ জন কলা অনুষদের বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যয়নরত। মোট শিক্ষার্থীর হিসাবে এ হার প্রায় ২২ শতাংশ।

তবে শিক্ষার্থী ও ঐতিহ্যের দিক থেকে দেশের কলা ও মানবিক শিক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হলেও আন্তর্জাতিক বিষয়ভিত্তিক র‍্যাংকিংয়ে এর প্রতিফলন নেই। প্রকৌশল ও বিজ্ঞানসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে কিউএসের বিষয়ভিত্তিক র‍্যাংকিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থান করে নিলেও ২০২৬ সালের কলা ও মানবিক বিষয়ভিত্তিক র‍্যাংকিংয়ে জায়গা পায়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাবির বর্তমান র‍্যাংকিং মূল্যায়নে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা ও প্রকাশনাকে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। ফলে কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা পিছিয়ে থাকে। এর পাশাপাশি এ দুই অনুষদের অনেক শিক্ষকই নিয়মিতভাবে নিজেদের গবেষণা-প্রোফাইল ও বায়োডাটা হালনাগাদ করেন না, যা র‍্যাংকিংয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আবার বিজ্ঞান, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞানের গবেষণার ধরন এক নয়; তাই একই মানদণ্ডে তুলনা করাও পুরোপুরি যৌক্তিক নয়। বিশেষ করে পালি, উর্দু, ফার্সি প্রভৃতি বিভাগের শিক্ষকদের আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে প্রকাশনার সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। তবে এ বিষয়ে আমি উপাচার্য স্যারের সঙ্গেও আলোচনা করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব উদ্যোগে গবেষণা, প্রোফাইল হালনাগাদ এবং আন্তর্জাতিক প্রকাশনা বাড়ানোর জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। আশা করি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।’

একই পরিস্থিতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও। ইউজিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট ২১ হাজার ২১ শিক্ষার্থীর মধ্যে কলা অনুষদে পড়ছেন ৪ হাজার ৪৯৩ জন, যা মোট শিক্ষার্থীর ২১ শতাংশ। এছাড়া বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বেশি উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকও রয়েছেন রাবিতে। উচ্চ শিক্ষার এ প্রতিষ্ঠানে ১ হাজার ১১ শিক্ষকের মধ্যে ৮২৫ জনই পিএইচডি ডিগ্রিধারী এবং ৩০ জন এমফিল ডিগ্রিধারী। এ শিক্ষকদের একটি বড় অংশই পিএইচডির গবেষণা করেছেন কলা ও মানবিক অনুষদসংশ্লিষ্ট বিষয়ে। অথচ এ বিশ্ববিদ্যালয়টিও কিউএস র‍্যাংকিংয়ে জায়গা করে নিতে পারেনি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বেলাল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিজ্ঞান ও কলা অনুষদের গবেষণার ধরন এক নয়, তাই সরাসরি তুলনা করা ঠিক নয়। আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে পিআর রিভিউড জার্নালে গবেষণা প্রকাশ পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞান অনুষদে পরীক্ষানির্ভর গবেষণা ও পিআর রিভিউড জার্নালে প্রকাশনার সুযোগ বেশি থাকলেও কলা অনুষদে আন্তর্জাতিকভাবে এমন জার্নাল তুলনামূলক কম। তবে কলা অনুষদ গবেষণায় খুব বেশি পিছিয়ে নয়। এ অনুষদের শিক্ষকদের গবেষণাও প্রকাশিত হয়; তবে সেগুলো সবসময় পিআর রিভিউড জার্নালে না হয়ে অনেক ক্ষেত্রে গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়, যা কলা অনুষদের গবেষণার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।’

একই বিষয় উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মো. মামুনুর রশীদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদে গবেষণা প্রকাশনা ও উচ্চ ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরের জার্নাল বেশি থাকায় এসব অনুষদ তুলনামূলক এগিয়ে। তবে অন্য অনুষদগুলো গবেষণায় পিছিয়ে নয়, সব অনুষদেই সমানভাবে মানসম্পন্ন গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।’

তিনি আরো বলেন, ‘গবেষণার বিষয় এমন হওয়া উচিত, যার সামাজিক-অর্থনৈতিক ও জাতীয় পর্যায়ে ইতিবাচক প্রভাব থাকবে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই গবেষণায় সে প্রভাব প্রতিফলিত হয় না। আমরা চেষ্টা করছি এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করার।’

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে কলা অনুষদে চতুর্থ সর্বোচ্চ শিক্ষার্থী জাহাঙ্গীরনগরে। ইউজিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪ হাজার ৬২১ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩ হাজার ১৭ জনই পড়েন কলায়। আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে জায়গা না পেলেও বিশ্ববিদ্যালয়টির কলা অনুষদের বিভিন্ন বিভাগ অবশ্য গবেষণায় পিছিয়ে নেই বলে মনে করেন ডিন অধ্যাপক মোজাম্মেল হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কিউএস র‍্যাংকিংকে সরাসরি গবেষণার মানের একমাত্র সূচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আর মানসম্মত গবেষণায়ও পিছিয়ে থাকার কোনো কারণ নেই। তবে কলা ও সমাজবিজ্ঞানের অনেক গবেষণা বাংলাদেশকেন্দ্রিক বা স্থানীয় বিষয়ভিত্তিক হওয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে বহুল উদ্ধৃত বা স্বীকৃত জার্নালে প্রকাশের সুযোগ তুলনামূলক কম থাকে। অন্যদিকে জীববিজ্ঞান বা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের অনেক গবেষণার বিষয় বিশ্বব্যাপী প্রাসঙ্গিক হওয়ায় সেগুলো সহজে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা পায়।’”

জাবির কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোজাম্মেল হক আরো বলেন, ‘সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা ইতিহাসের গবেষণা যদি কেবল জাতীয় প্রেক্ষাপটে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে তার প্রভাব তুলনামূলক কম দেখা যায়। এর অর্থ এই নয় যে এসব বিষয়ে গবেষণা হচ্ছে না বা গবেষণার মান খারাপ। এছাড়া আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও সেমিনার আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নের ঘাটতি রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বাজেট বৃদ্ধির চেষ্টা করলেও সবসময় প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ পাওয়া যায় না। তাই র‍্যাংকিংয়ের বিষয়টি মূল্যায়নের সময় এসব বাস্তবতাও বিবেচনায় নেয়া উচিত।’

আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে না থাকার ক্ষেত্রে গবেষণা প্রতিবেদনের ভাষা বাংলা হওয়া একটি কারণ বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘মানবিক ও কলা অনুষদ এবং সমাজবিজ্ঞান অনুষদের অনেক বিষয়, যেমন বাংলা, ইতিহাস বা দর্শনে গবেষণার বড় একটি অংশ বাংলায় প্রকাশিত হয়। এসব গবেষণা সবসময় আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশের সুযোগ পায় না বা আন্তর্জাতিক সূচকে অন্তর্ভুক্ত হয় না। ফলে র‍্যাংকিংয়ের সূচকে তাদের অবদান তুলনামূলক কম দৃশ্যমান হয়। মানবিক অনুষদেও অনেক মানসম্মত গবেষণা হয়, কিন্তু সেগুলোর মূল্যায়নের ধরন ও প্রকাশনার মাধ্যম বিজ্ঞান অনুষদের তুলনায় ভিন্ন।’

আরও