মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগে রেজিস্ট্যান্স হচ্ছে পোকামাকড়

ঝুঁকি বাড়ছে কৃষি ও কৃষকের

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নোয়াখালীর চরাঞ্চলের কৃষিজমিতে লবণাক্ততা বাড়ছে। এছাড়া রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত এখানকার কৃষি খাতে এবার যুক্ত হয়েছে মানহীন বালাইনাশক।

কৃষিবিদদের পরামর্শ ছাড়াই বেশি মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহারের কারণে পোকার সহনশীল ক্ষমতা বাড়ছে। ফলে ফসলের একটি রোগের জন্য একাধিক বালাইনাশক ব্যবহার করেও সুফল পাচ্ছেন না কৃষক। এটা একদিকে যেমন ঝুঁকিতে ফেলছে কৃষি ও কৃষকের, অন্যদিকে ভোক্তারাও রয়েছেন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফসল আবাদের পরিধি ও ধরন এখন বদলে গেছে। বেড়েছে ক্ষতিকর রোগজীবাণু ও কীটপতঙ্গ। এসব দমনে কৃষক বালাইনাশকের ব্যবহারও বাড়িয়েছেন। দেখা যাচ্ছে ফসলে ছত্রাকের আক্রমণ হলো, সেটা দমনে এক ধরনের বালাইনাশক ব্যবহার করা হলো। তাতে সাময়িক সময়ের জন্য ছত্রাক অকার্যকর হয়ে পড়ল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ওই ছত্রাকই আবার ধরন বদলে ফিরে আসছে। ফলে তখন ওই কীটনাশক আর কাজ করে না। এ প্রক্রিয়াটাকে বলে রেজিস্ট্যান্স। এ বিষয়ে এখনই সচেতন না হলে ভবিষ্যতে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন যেমন হুমকিতে পড়বে, তেমনি বাড়বে ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি। অবশ্য কৃষি বিভাগ বলছে, এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করেছে তারা।

কথা হয় সুবর্ণচর উপজেলার চরজব্বার গ্রামের কৃষক আবদুল্যাহর সঙ্গে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এক মাসের বেশি সময় ধরে মরিচখেতে পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। কয়েক ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করেছি। তিনটি কীটনাশক একসঙ্গে মিশিয়েও প্রয়োগ করা হয়েছে। তাতে কাজ হচ্ছে না। শুধু এর পেছনে গচ্চা দিতে হয়েছে ১২ হাজার টাকা।’

গত মৌসুমে একই ধরনের ছত্রাকের উপদ্রব দেখা দেয় উপজেলার দক্ষিণ চরক্লার্ক গ্রামের কৃষক আবদুল আজিজের শিমখেতে। মৌসুমের শুরুর দিকে ভালোই গাছ গজিয়েছিল। ফুল যেমন এসেছিল, তেমনি শিমের ফলনও ভালো হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করে পাতা মোড়ানো রোগ দেখা দেয়। দফায় দফায় কীটনাশক প্রয়োগ করেন। বিক্রেতাদের পরামর্শে কয়েকটি কীটনাশক একসঙ্গে মিশিয়েও প্রয়োগ করেন। তাতেও শেষরক্ষা হয়নি।

কৃষকরা বলছেন, ফসলে বিভিন্ন ধরনের রোগ দেখা দিলেও কাজে আসছে না কীটনাশক। সুবর্ণচর উপজেলার কৃষক জাহাঙ্গীর আলম ফসলের রোগ নির্ণয় ও বালাইনাশক ব্যবহারে একাধিক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। কৃষিকাজের পাশাপাশি তিনি চরজব্বার বাজারে বালাইনাশক ও বিভিন্ন কোম্পানির বীজও বিক্রি করেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের লাইসেন্সও রয়েছে তার।

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘পুরো উপজেলাজুড়ে নামসর্বস্ব কোম্পানির বালাইনাশকে ভরে গেছে। যে সুযোগ পাচ্ছে, সে-ই কীটনাশকের দোকান খুলে বসছে। যাদের বেশির ভাগেরই প্রশিক্ষণ তো দূরের কথা বিক্রিরই লাইসেন্স নেই। ফলে কৃষক বেশি প্রতারিত হচ্ছেন। দেখা যাচ্ছে বিক্রেতাই বনে যাচ্ছেন কৃষিবিদ। এতে একই গ্রুপের কীটনাশক বারবার দেয়া হচ্ছে কৃষককে। কৃষকও এসব বালাইনাশক ব্যবহারে সঠিক পদ্ধতি মানছেন না। ফলে একদিকে যেমন কৃষি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে কৃষক নিজেও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।’

উপজেলার বিভিন্ন কৃষিজমির আইল ও জমিতে পড়ে থাকতে দেখা গেছে বালাইনাশকের প্যাকেট। উপজেলার পথে পথে কয়েকশ দোকান। যে যার মতো করে দোকান খুলে কীটনাশক বিক্রি করছেন। কারো কারো বিক্রি ও পরামর্শ দেয়ার অনুমতি থাকলেও বেশির ভাগেরই নেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের লাইসেন্স। কৃষিবিদের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই নিজেরাই কৃষিবিদ বনে যাচ্ছেন বিক্রেতা।

কৃষিবিদ শিবব্রত ভৌমিক বলেন, ‘কৃষক যখন একটি রোগের জন্য একটি কীটনাশক ব্যবহার করে প্রতিকার পাচ্ছেন না, তখন দেখা গেছে একাধিক কীটনাশকের মিশ্রণ ঘটিয়ে তা ব্যবহার করছেন। বেশির ভাগ সময় তাও কোনো কাজে আসছে না। ফলে জমিতে যদি ওই পোকা বা রোগের কোনো জীবাণু থেকে যায়, তাহলে সে পোকা বা জীবাণু আর আগে ব্যবহৃত কীটনাশকে দমন হবে না। অর্থাৎ কীটনাশকটি ওই রোগের জন্য অকার্যকর হয়ে পড়বে। অতিমাত্রায় ব্যবহারের কারণে বেশির ভাগ কীটনাশক অকার্যকর হয়ে পড়ছে। যা আগামী দিনে কৃষি ও কৃষক উভয়ের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য কৃষকদের কৃষি কর্মকর্তার শরণাপন্ন হওয়া দরকার।’

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশী-বিদেশী নামসর্বস্ব এসব বালাইনাশকে রয়েছে হেবি মেটাল। এতে জমির স্বাস্থ্য বিনষ্ট হওয়ার পাশাপাশি হুমকিতে পড়ছে পরিবেশ। ফলে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে অনিশ্চতা দেখা দেয়ার পাশাপাশি হুমকিতে পড়বে ভবিষ্যৎ কৃষি।

এ বিষয়ে ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও ইনস্টিটিউট সুবর্ণচরের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক প্রধান ড. মো. নুর আলম সিদ্দিকী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এরই মধ্যে কীটনাশকের রেসিডুয়াল ইফেক্ট পড়তে শুরু করেছে। যা সম্পর্কে কৃষক ও ভোক্তা উভয়েরই অজ্ঞতা রয়েছে। বিশেষ করে কৃষকের অজ্ঞতার কারণে যত্রতত্র ব্যাপকভাবে বালাইনাশক ব্যবহার হয়ে আসছে। এতে সবজি, ফলের মান ও পুষ্টির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। কীটনাশকের প্রভাব নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে এবং আরো গবেষণা চলমান। যেটুকু গবেষণা এরই মধ্যে হয়েছে এতে দেখা গেছে, পুষ্টিগুণের ওপর বেশ প্রভাব পড়েছে। মানহীন বালাইনাশক ব্যবহার ও অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে নারী-পুরুষ উভয়ের বন্ধ্যাত্ব তৈরি হচ্ছে। শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠায় বাধা সৃষ্টি করছে। ভোক্তা ও কৃষক উভয়ের ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধির ঝুঁকি বাড়ছে। চর্মরোগ ব্যাপক হারে বেড়ে যাচ্ছে। এখনই এর অতিরিক্ত ব্যবহার ঠেকানো না গেলে অদূরভবিষ্যতে কৃষিতে ভয়াবহতা দেখা দেবে।’

বালাইনাশকের ভয়াবহতা বাড়ছে স্বীকার করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মুহাম্মদ শহীদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কৃষি অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া বালাইনাশক ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া শুধু প্রশিক্ষিত তথা কৃষিবিদের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া বালাইনাশক বিক্রিরও অনুমতি নেই। বিগত সময়ে বালাইনাশক ব্যবহারে কৃষকদের সচেতনতা বাড়াতে মাঠ দিবস পালন করে আসছি আমরা। ভবিষ্যতে কৃষকদের সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি বালাইনাশক বিক্রির বিষয়ে আরো কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

আরও