দেশের নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ১০টি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। একেকটি কেন্দ্রের সক্ষমতা হবে ৫০ মেগাওয়াট। সেই হিসাবে মোট সক্ষমতা হবে ৫০০ মেগাওয়াট। আগামী সপ্তাহে এ দরপত্র আহ্বান করা হবে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য এরই মধ্যে দরপত্র আহ্বানের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরির কাজ চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। আগ্রহী সব প্রতিষ্ঠান যেন অংশ নিতে পারে, সেভাবেই দরপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। দরপত্রে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে অভিজ্ঞ ও সর্বনিম্ন দরদাতা চূড়ান্তভাবে বিবেচিত হবেন।
বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সৌরবিদ্যুতের ১০টি কেন্দ্র নির্মাণের জন্য প্রাথমিকভাবে বিপিডিবির সিদ্ধান্ত ছিল। ৫০ মেগাওয়াট করে ১০টি প্রকল্প নেয়া হবে। তবে দু-একটি উচ্চ সক্ষমতার হতে পারে। সেটি এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। যাবতীয় কাজ সম্পন্ন হলে আগামী সপ্তাহে এ দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা রয়েছে। উন্মুক্ত দরপত্রের জন্য নানা ধরনের বিষয় বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। আজও (মঙ্গলবার) কমিটি বসেছিল; তারা কাজ করছে। এ প্রক্রিয়ার মধ্যে ভালো একটা ডকুমেন্ট তৈরি হলে পরবর্তী সময়ে আরো দরপত্র আহ্বান করার পরিকল্পনা রয়েছে।’
বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে যেসব সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে, সেগুলোর জন্য প্রাথমিক জায়গা নির্বাচন করা হয়েছে। এ তালিকায় রয়েছে পাবনার ঈশ্বরদী, রংপুরের পীরগঞ্জ, ময়মনসিংহের ভালুকা, কক্সবাজারের চকরিয়া, পঞ্চগড়, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও নীলফামারীর জলঢাকা। এসব এলাকার কাছাকাছি দূরত্বে গ্রিড সাব-স্টেশন রয়েছে। ফলে আলাদা করে গ্রিড লাইন নির্মাণের জটিলতা নেই। মূলত এ কারণে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য এসব এলাকা নির্বাচন করা হয়েছে।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি আইন (বিশেষ আইন) স্থগিত করে দেয়। এ আইন স্থগিত হওয়ায় নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ৩১টি বেসরকারি (আইপিপি) প্রকল্প নিয়ে ধোঁয়াশা এখনো কাটেনি। এসব প্রকল্প বাতিল নাকি এগুলো বিবেচনা করার সুযোগ সরকার রেখেছে, তা নিয়ে এ খাতের স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে দ্বিধা রয়েছে। কারণ নবায়নযোগ্য এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রাথমিক অনুমতিপত্র এলওআই (লেটার অব ইনটেন্ট) দেয়া হয়েছিল বিগত সরকারের আমলে। অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত হলো বিশেষ আইন স্থগিত হওয়ায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বিগত সরকারের দেয়া সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো নিয়ে গত ২৭ আগস্ট বিদ্যুৎ ভবনে একটি সভা হয়। ওই সভায় বিদ্যুৎ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছাড়াও বিভিন্ন কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় ৩১টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। এগুলোর মোট সক্ষমতা ছিল ২ হাজার ৬৭৮ মেগাওয়াট।
তবে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে শুরুতে দশটি প্রকল্প নেয়া হচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছেন বিদ্যুৎ বিভাগের দুজন কর্মকর্তা। নাম গোপন রাখার শর্তে তারা বণিক বার্তাকে বলেন, সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে বিপিডিবি ১০টি কেন্দ্র নির্মাণ প্রক্রিয়া নিয়ে এগোচ্ছে। বিষয়টি চূড়ান্ত করে বিপিডিবিতে কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে। তারা সে অনুযায়ী কাজ করছে।
দেশে বিশেষ আইনের আওতায় বেশকিছু সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প অনুমোদন দেয় সরকার। কিন্তু কোনো সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুতের প্রতি কিলোওয়াটের দাম ৯-১০ সেন্টে নিচে ক্রয় চুক্তি করতে পারেনি বিপিডিবি। দেশে সর্বশেষ অনুমোদন পাওয়া বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির হিসাব ধরলে ডলারের বিপরীতে এ দাম পড়ে ১০ টাকা ৭৫ পয়সা। তবে বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি ভিন্ন হওয়ায় দামের তারতম্য হচ্ছে, যা কিলোওয়াটপ্রতি সর্বনিম্ন ১০ থেকে সর্বোচ্চ ১৩ টাকা পড়ছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তানসহ বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের দাম উচ্চ মূল্য। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন সমালোচনা করে আসছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
তাদের দাবি বিশ্ববাজারে সোলার প্যানেলের দাম অনেক কমে এসেছে। তার পরও বাংলাদেশে কেন উচ্চ মূল্যে সৌরবিদ্যুতের ক্রয় চুক্তি হচ্ছে? এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রতি ওয়াট প্যানেলের দাম বিশ্ববাজারে এখন ৯ সেন্টে নেমে এসেছে। ১০ বছর আগে ছিল ২৫-৩০ সেন্ট। প্যানেলের দাম কমে আসায় বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ ব্যয় অর্ধেকে নেমে এসেছে। সংগত কারণে এখন সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণকে লাভজনক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। একবার কেন্দ্র স্থাপন করলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য আর জ্বালানি কিনতে হয় না।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা-২০০৮ ও পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান (পিএসএমপি)-২০১৬ অনুযায়ী সরকার ২০২১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য স্থির করেছিল। কিন্তু সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রাংশ আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহ, জমির সংস্থান না হওয়াসহ নানা কারণে এ লক্ষ্য পূরণ হয়নি। তবে এখন আগের সেই পরিকল্পনা থেকে বেরিয়ে এসে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট উৎপাদন সক্ষমতার ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস ও ক্লিন এনার্জি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্র নেয়া হয়েছে।