চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা

পুরুষ রোগীর ২১%হেড অ্যান্ড নেক, নারীরা বেশি আক্রান্ত স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যান্সারে

চট্টগ্রামে ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে পুরুষদের বড় অংশ আক্রান্ত হচ্ছেন মাথা ও ঘাড়ের ক্যান্সারে।

অন্যদিকে নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হচ্ছে স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যান্সার। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২০২৫ সালের তথ্য বলছে, নতুন করে আক্রান্ত পুরুষদের মধ্যে প্রায় ৭২৫ জন বা ২১ শতাংশই হেড অ্যান্ড নেক ক্যান্সারে আক্রান্ত। অন্যদিকে নারীদের মোট আক্রান্তের ২৫ শতাংশই স্তন ক্যান্সারে এবং ১৮ শতাংশই জরায়ুমুখ ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন।

সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা বলছেন, তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার, ধূমপান এবং এ অঞ্চলের মানুষের খাদ্য তালিকায় শুঁটকি বা লাল মাংসের আধিক্যের কারণে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। অন্যদিকে নারীদের অসচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসকের শরণাপন্ন না হওয়ায় স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়েছে। সেজন্য নিয়মিত খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতার ওপর বেশি প্রাধান্য দেয়ার পরামর্শ দেন তারা।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে হাসপাতালটিতে ক্যান্সার রোগীর চাপ ছিল অনেক বেশি। ওই বছরে প্রায় ২৮ হাজার নতুন ও পুরনো রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে পুরনো রোগী ছিলেন প্রায় সাড়ে ২১ হাজার এবং নতুন করে ক্যান্সারে শনাক্ত হওয়া প্রায় ৬ হাজার ৩০০ জনের বেশি রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। নতুন রোগীদের মধ্যে পুরুষ রোগী প্রায় সাড়ে তিন হাজার এবং নারীর সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৮০০।

নতুন শনাক্ত হওয়া ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন মাথা ও ঘাড়ের ক্যান্সারে (হেড অ্যান্ড নেক)। এটি মূলত মুখগহ্বর, গলা, নাক, সাইনাস, লালাগ্রন্থি এবং থাইরয়েড গ্রন্থিতে হওয়া ক্যান্সারকে বোঝায়। মোট ১ হাজার ৫৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন এ ক্যান্সারে। এছাড়া ফুসফুস ক্যান্সারে প্রায় ৭৫০ জন, স্তন ক্যান্সারে প্রায় ৭০০, বৃহদন্ত্র/মলাশয়ের (কোলোরেক্টাল) ক্যান্সারে ৬৩৫ এবং জরায়ুমুখ ক্যান্সারে প্রায় ৫০০ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া খাদ্যনালি, পাকস্থলী ছাড়াও অন্যান্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন আরো অন্তত ২ হাজার ৬০০ জন।

অন্যদিকে ক্যান্সারের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুরুষদের মধ্যে হেড অ্যান্ড নেক ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন ৭২৪ জন বা ২১ শতাংশ। এ ক্যান্সার মূলত তামাক, জর্দা ও ধূমপানের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফুসফুসের ক্যান্সারে ৫৫২ জন বা ১৬ শতাংশ আক্রান্ত হয়েছেন। এটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ধূমপান, বায়ুদূষণ এবং শিল্পাঞ্চলের দূষিত পরিবেশের কারণে হয়ে থাকে। এছাড়া বৃহদন্ত্র/মলাশয়ের ক্যান্সারে ৪১৪ জন বা ১২ শতাংশ, খাদ্যনালি ক্যান্সারে ২৪১ জন বা ৭ শতাংশ এবং পাকস্থলীর ক্যান্সারে ২১০ জন বা ৬ শতাংশ রোগী আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া অন্যান্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৩১৫ জন।

এদিকে নারীরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন স্তন ক্যান্সারে। গত বছর মোট নারী ক্যান্সার রোগীর ২৫ শতাংশ বা প্রায় ৭০০ জন আক্রান্ত হয়েছেন স্তন ক্যান্সারে। মূলত দেরিতে সন্তান নেয়া, সন্তান না হওয়া, হরমোনজনিত পরিবর্তন এবং পারিবারিক ইতিহাসের কারণে এ ক্যান্সার বেড়েই চলেছে। এছাড়া নারীরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন জরায়ুমুখ ক্যান্সারে। প্রায় ৫০০ জন বা ১৮ শতাংশ নারী এ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া হেড অ্যান্ড নেক ক্যান্সারে ৩৩০ জন বা ১২ শতাংশ, বৃহদন্ত্র/মলাশয়ের ক্যান্সারে ২২১ জন বা ৮ শতাংশ, ফুসফুস ক্যান্সারে ১৯৫ জন বা ৭ শতাংশ এবং অন্যান্য ক্যান্সারে ৮৩৪ জন বা ৩০ শতাংশ রোগী নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি ও রেডিওথেরাপি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আলী আসগর চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় চট্টগ্রামে হেড অ্যান্ড নেক ক্যান্সারের হার তুলনামূলক বেশি। এক্ষেত্রে স্থানীয় খাদ্যাভ্যাস, বিশেষত অতিরিক্ত লবণযুক্ত ও সংরক্ষিত খাবার যেমন শুঁটকি মাছ খাওয়ার প্রবণতা বেশি হওয়ায় খাদ্যনালি ও পাকস্থলীর ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত লাল মাংস খাওয়ার কারণে কোলন বা কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়ছে।’

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম মেডিকেলে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের সীমিত সক্ষমতায় সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে। এ বিভাগে অনেক যন্ত্রপাতির সংকট ও নানা সমস্যা থাকলেও আমাদের চিকিৎসকরা সেবা চালু রেখেছেন।’

আরও