দেশের প্রায় ৮৭ শতাংশ লবণের চাহিদা পূরণ করেন কক্সবাজারের ১০ উপজেলার চাষীরা। বাকি লবণ আসে চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও পটিয়া থেকে। গত মৌসুমে ৬৭ হাজার ৭৫৭ একর জমিতে লবণ উৎপাদন করা হয়। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৬ লাখ ৭৫ হাজার টন। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন হয় ১৯ লাখ ৩৫ হাজার টন। উৎপাদন ঘাটতি প্রায় ৭ লাখ টন হলেও উৎপাদিত লবনের প্রায় সাড়ে চার লাখ টন এখনো অবিক্রীত। তবু সরকার দেড় লাখ টন অপরিশোধিত লবণ আমদানির অনুমতি দিয়েছে।
দেশের চাহিদা অনুযায়ী লবণ উৎপাদন হলেও বিদেশ থেকে দেড় লাখ টন লবণ আমদানির অনুমতি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ভারত থেকে এসব লবণ আমদানি করা হবে বলে জানা গেছে। ২৪৪টি মিলকে ৫৪৩ টন করে মোট ১ লাখ ৩২ হাজার ৫০০ টন এবং ভ্যাকুয়াম পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদনকারী সাত প্রতিষ্ঠানকে ২ হাজার ৫০০ টন করে মোট ১৭ হাজার ৫০০ টন অপরিশোধিত লবণ আমদানির সুযোগ দেয়া হয়েছে।
পাশাপাশি সরকার ডিজেল-অকটেনসহ সব জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে লিটারপ্রতি ২০ টাকা পর্যন্ত। এতে বেড়েছে পরিবহন ও সেচ খরচ। লবণ উৎপাদন শুরু হচ্ছে নভেম্বরে। এ অবস্থায় উৎপাদন ব্যয় মেটাতে গিয়ে লোকসানের শঙ্কায় পড়েছেন সরোয়ার আলমসহ অন্য লবণ চাষীরা।
কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের সরোয়ার আলম প্রতি বছর ৩২ একর জমিতে লবণ চাষ করেন। গত মৌসুমে প্রতি মণ লবণ ২৫০ টাকা দরে বিক্রি করে আয় করেন ১১ লাখ টাকা। তবে জমির খাজনা, সেচ ও শ্রমিকের বেতন বাবদ ব্যয় হয়েছে ৩১ লাখ টাকার কাছাকাছি। এক মৌসুমেই সরোয়ার আলমের লোকসান হয়েছে ২০ লাখ টাকা।
সরোয়ার আলম গতকাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি প্রায় ৩২ একর জমি লিজ নিয়ে লবণ চাষ করি। আগে জমির খাজনা একর প্রতি ছিল ৫০ হাজার টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে ১ লাখ টাকা হয়েছে। তিন বছর ধরে লবণ চাষ করছি লোকসান দিয়ে। সরকার প্রতি বছর লবণের দাম বাড়ানোর কথা বললেও কোনো উদ্যোগ নেয়নি। উল্টো ব্যবসায়ীদের চাপে লবণ আমদানি করে। এখন নতুন করে যুক্ত হয়েছে জ্বালানির দাম। যার প্রভাব পড়বে সেচ ও পরিবহন ব্যয়ে। একই সঙ্গে বাড়বে শ্রমিকের মজুরিও।’
সরকার গত ২১ সেপ্টেম্বর ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেন—চার ধরনের তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বেড়েছে পরিবহন ব্যয়। আগামী মৌসুমে ট্রাকপ্রতি লবণে পরিবহন ব্যয় বাড়বে ৮ হাজার টাকা। যার প্রভাব পড়বে লবণ উৎপাদনে।
কুতুবদিয়ার চাষী আবুল কালাম বলেন, ‘তেলের দাম বাড়ার ফলে ট্রাকে ব্যয় বেড়েছে ৮ হাজার টাকা, সেচে বাড়বে আরো ৫ হাজার টাকা। ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকার নিচে কোনো শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের অসহায়ত্ব ছাড়া আর কিছু বাকি নেই। এখন ৩৫০ টাকায় এক মণ বিক্রি হচ্ছে। অথচ ব্যয় হয়েছে ৩৪৫ টাকা। আগামী মৌসুম থেকে উৎপাদন ব্যয় ৫০০ টাকা হয়ে যাবে।’
পরিবহন ও সেচে খরচ বাড়লে ব্যবসায়ী পর্যায়ে এর প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন কক্সবাজারের ইসলামপুর লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি শামসুল আলম আজাদ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও বাংলাদেশে বাড়ছে। সেটা সেচ, পরিবহন, পলিথিনের দাম বাড়িয়েছে। প্রায় দ্বিগুণ হবে সবকিছুর ব্যয়। যার কারণে আমাদের সরবরাহে একটি বড় ঘাটতি দেখা দেবে। গত বছর আমাদের এখানে উৎপাদন কমেছে। সেখানে যদি নতুন করে সবকিছুর ব্যয় বেড়ে যায় তাহলে সামনে আরো কমবে।’
কক্সবাজার বিসিকের লবণ শিল্পের উন্নয়ন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১৫ নভেম্বর লবণ উৎপাদন শুরু হচ্ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে পরিশোধিত লবণের মোট চাহিদা ধরা হয়েছে ২১ লাখ টন। এর মধ্যে খাওয়ার লবণ সাড়ে ৭ লাখ টন, শিল্পে ব্যবহারের লবণ সাড়ে ৯ লাখ টন, প্রাণিসম্পদ খাতের ৩ লাখ ৬ হাজার এবং মাছ চাষের ৩৭ হাজার টন। দেশে সাধারণত নভেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত লবণ উৎপাদনের মৌসুম চলে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিসিকের লবণ শিল্পের উন্নয়ন কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক জাফর ইকবাল ভূঁইয়া বলেন, ‘১৫ নভেম্বর থেকে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে লবণ চাষ শুরু করব। তবে এর আগে থেকে কয়েকটি এলাকায় লবণ উৎপাদন শুরু হয়ে যাবে। এবার ২১ লাখ টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা। তবে সবসময় কিছু ঘাটতি থেকে যায়। সেজন্য বিদেশ থেকে আমদানির প্রয়োজন পড়ে। সরকার দেড় লাখ টন আমদানির অনুমতি দিয়েছে। সেগুলো এলে আমাদের ঘাটতি থাকবে না।’