চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের মালিকানায় বেসরকারি হাসপাতাল

সিএসসিআর কার্ডিয়াকের চেয়ারম্যানসহ পরিচালকদের অধিকাংশই সরকারি চিকিৎসক

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের সীমানা ঘেঁষেই প্রবর্তক মোড় এলাকায় সিএসসিআর কার্ডিয়াক হাসপাতাল।

নিজেদের ‘আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য’ হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে পরিচয় দেয়া এ বেসরকারি হাসপাতালটি পরিচালিত হচ্ছে এমন এক পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে; যার চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে পরিচালক ও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শেয়ারহোল্ডারই সরকারি চিকিৎসক। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন চমেক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম চৌধুরী। পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন একই হাসপাতালের একাধিক সহযোগী ও সহকারী অধ্যাপক, এমনকি অন্য সরকারি হাসপাতালের দায়িত্বশীল চিকিৎসকরাও।

কেবল মালিকানাই নয়, সরকারি পরিচয় ব্যবহার করে হাসপাতালটির প্রচারণা ও বিভিন্ন করপোরেট কার্যক্রমেও তাদের সরাসরি অংশগ্রহণের প্রমাণ মিলেছে। অথচ সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালায় সরকারি চাকরির পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা, ব্যবস্থাপনা ও প্রচারণায় অংশগ্রহণের বিষয়ে স্পষ্ট বিধিনিষেধ রয়েছে। ফলে সরকারি দায়িত্ব, ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং রোগীসেবার মধ্যে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে সম্প্রতি এক অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রাম কার্ডিয়াক প্রাইভেট লিমিটেড নামে কোম্পানির চেয়ারম্যান ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম চৌধুরী এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. জামাল আহমেদ। পরিচালনা পর্ষদে আরো রয়েছেন ডা. কায়সার নসরুল্লাহ খান, ডা. আনিসুল আউয়াল, ডা. মোহাম্মদ নূর উদ্দিন তারেক, ডা. মোহাম্মদ শাহীন, ডা. মোহাম্মদ সাফিউল আলম, অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল কাদের, ডা. এনএএম মোমেনুজ্জামান, ডা. তানভীর আহমদ, ডা. সৈয়দ মোহাম্মদ আতিক, ডা. মোহাম্মদ ফজলে মারুফসহ একাধিক চিকিৎসক। এছাড়া চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. একরাম হোসেনও প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পরিচালনা পর্ষদের অন্য কয়েকজন বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে কর্মরত।

যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তরের নথি অনুযায়ী, সিএসসিআর কার্ডিয়াক হাসপাতাল প্রাইভেট লিমিটেড ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর নিবন্ধিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদিত মূলধন ৫ কোটি টাকা। ১০০ টাকা মূল্যমানের মোট ৫ লাখ অনুমোদিত শেয়ারের বিপরীতে ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ৩৭ হাজার শেয়ার ইস্যু করা হয়েছে। কোম্পানিটিতে বর্তমানে ৩২ জন শেয়ারহোল্ডার এবং ১২ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ রয়েছে।

নথিপত্রে দেখা গেছে, সিএসসিআর কার্ডিয়াক হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম চৌধুরীর নামে রয়েছে দুই হাজার শেয়ার। একই পরিমাণ শেয়ারের মালিক পরিচালক ডা. আনিসুল আউয়াল ও ডা. মোহাম্মদ নূর উদ্দিন তারেক। কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. মোহাম্মদ ফজলে মারুফ এবং চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. একরাম হোসেনের নামে রয়েছে এক হাজার করে শেয়ার।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, সিএসসিআর কার্ডিয়াক হাসপাতালের ফেসবুক পেজে সরকারি চিকিৎসকদের পরিচয় ব্যবহার করে নিয়মিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রচারণা চালানো হচ্ছে। চলতি বছরের ১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত প্রথম ও তৃতীয় বার্ষিক সাধারণ সভায় চেয়ারম্যান হিসেবে ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম চৌধুরী সভাপতিত্ব করেন। সেখানে তার একদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান, অন্যদিকে সিএসসিআর কার্ডিয়াকের ম্যানেজিং পার্টনার হিসেবে পরিচয় দেয়া হয়। একইভাবে ডা. আনিসুল আউয়ালকে চমেকের পরিচয়ের পাশাপাশি হাসপাতালের পরিচালক, ডা. কাজী শামীম আল মামুনকে পরিচালক এবং ডা. একরাম হোসেনকে সিনিয়র কনসালট্যান্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম চৌধুরী ও পরিচালক ডা. আনিসুল আউয়াল সরকারি চাকরির পাশাপাশি সিএসসিআর কার্ডিয়াক হাসপাতালের মালিকানায় থাকার বিষয়টি স্বীকার করলেও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। একই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ডা. কাজী শামীম আল মামুন অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং প্রতিবেদন প্রকাশ না করতে চাপ প্রয়োগ করেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চমেক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নূর উদ্দিন তারেক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারি চাকরির পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে থাকা অপরাধ নয়। আমি দীর্ঘদিন সরকারি মেডিকেল কলেজে কর্মরত। সার্ভিস রুলস সম্পর্কে অবগত আছি। আয়কর বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও এ বিষয়ে কথা হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, সরকারি চাকরির পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালের মালিকানা থাকলে সমস্যা নেই।’

এদিকে চমেক হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সরকারি দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকদের এভাবে বেসরকারি হাসপাতালের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হওয়া চিকিৎসা নৈতিকতার পরিপন্থী। এতে সরকারি হাসপাতালের রোগী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের ঝুঁকিও তৈরি হয়।

চমেক হাসপাতালের তথ্য বলছে, কয়েক বছর আগেও সরকারি প্রতিষ্ঠানটির হৃদরোগ বিভাগের ক্যাথল্যাবে বার্ষিক তিন হাজারের কাছাকাছি রোগীর স্বল্প খরচে এনজিওগ্রাম হতো। বর্তমানে দুটি ক্যাথল্যাবের মাধ্যমে বার্ষিক এনজিওগ্রাম নেমে এসেছে দুই হাজারের ঘরে। এর মধ্যে ২০২২ সালে এনজিওগ্রাম হয়েছিল ২ হাজার ৬৮৮টি, ২০২৩ সালে ২ হাজার ৪৩৫, ২০২৪ সালে ২ হাজার ১৭২ ও ২০২৫ সালে এনজিওগ্রাম হয় ২ হাজার ১৩০টির মতো। হৃদরোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধানসহ শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসকরা ঢালাওভাবে বেসরকারি হাসপাতালের মালিকানায় ব্যস্ত হয়ে পড়ায় ধারাবাহিকভাবে এনজিওগ্রামসহ সেবার মান কমছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টদের অনেকেই। আর সে কারণেই চট্টগ্রাম অঞ্চলের লোকজনের মধ্যে ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরের মতো দেশের হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসা গ্রহণের হার অনেক বেশি।

জনপ্রশাসন ও স্বাস্থ্যনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি চিকিৎসকদের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় সম্পৃক্ততার বিষয়টি নতুন নয়। তবে কোনো কোম্পানি বা হাসপাতালের সরাসরি চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা পরিচালক হিসেবে সম্পৃক্ততা এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা থাকলে সরকারি আচরণবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্য খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা গুরুতর বলে মনে করছেন তারা। দেশের সার্বিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় চিকিৎসক ও রোগীর অনুপাত নেতিবাচক হওয়ায় সরকার অনেক বিষয়ে ছাড় দেয়। কিন্তু সরকারি চাকরিরত অবস্থায় সরাসরি বেসরকারি হাসপাতালের মালিকানার বিষয়টি চিকিৎসকদের নৈতিকতার চরম অধঃপতন বলে মনে করছেন তারা।

সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ১৬ নম্বর বিধিতে সরকারি কর্মচারীদের কোনো কোম্পানির প্রচার, নিবন্ধন বা ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণে বিধিনিষেধ রয়েছে। একই বিধিমালার ১৭ নম্বর বিধিতে সরকারের পূর্বানুমোদন ছাড়া ব্যক্তিগত ব্যবসা বা অন্য কোনো লাভজনক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. জসিম উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাসপাতালের কোন শিক্ষক কোথায় ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, সেটা আমাদের জানার কথা নয়। তবে সরকারি চিকিৎসকই কেবল নন, যেকোনো প্রতিষ্ঠানের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সার্ভিস রুলস অনুযায়ী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা, ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন না। চমেক হাসপাতালের চিকিৎসকরা যদি এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন তবে অবশ্যই আইন লঙ্ঘন করেছেন।’

পূর্বানুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘হৃদরোগ বিভাগের চিকিৎসকরা এ বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রের (সিএসসিআর কার্ডিয়াক) মালিকানায় থাকার বিষয়ে কোনো পূর্বানুমতি নেননি।’

চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, উপকূলীয় অঞ্চলে হৃদরোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও সরকারি পর্যায়ে চিকিৎসা সুবিধা সীমিত। এ কারণে অনেক রোগী বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতাল কিংবা দেশের বাইরে চিকিৎসা নেন। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের বেসরকারি হাসপাতালের মালিকানায় যুক্ত হওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক।

জানতে চাইলে চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ ফজলে রাব্বি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতালগুলো সঠিকভাবে পরিচালনার বিষয়টি দেখভাল করা আমাদের কাজ। কিন্তু কোনো হাসপাতালে সরকারি মেডিকেল কলেজ কিংবা হাসপাতালের চিকিৎসক মালিকানায় থেকে সরাসরি ব্যবসা পরিচালনা করলে সেটি কলেজ কর্তৃপক্ষের দেখার বিষয়। তবে সরকারি কর্মচারীদের সার্ভিস রুলস মেনে চাকরি না করলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে।’

আরও