কৃষি আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতি উন্নতকরণ প্রকল্প

চট্টগ্রাম অঞ্চলে বেশির ভাগ যন্ত্রই অচল, মিলছে না আগাম আবহাওয়া বার্তা

কৃষি আবহাওয়া ও নদ-নদীর অবস্থা সম্পর্কিত অগ্রিম তথ্য মাঠ পর্যায়ে কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে কৃষি আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতি উন্নতকরণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

কৃষি আবহাওয়া ও নদ-নদীর অবস্থা সম্পর্কিত অগ্রিম তথ্য মাঠ পর্যায়ে কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে কৃষি আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতি উন্নতকরণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পের মেয়াদ এরই মধ্যে শেষ হলেও স্থাপিত বেশির ভাগ যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে পড়েছে। সারা দেশে প্রায় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত প্রকল্পটির আওতায় উপজেলা পর্যায়ে স্থাপিত আবহাওয়া বোর্ড ইলেক্ট্রিক্যাল যন্ত্রপাতির বেশির ভাগই অকেজো। যন্ত্রপাতি পরিচালনায় দক্ষ অপারেটর না থাকা, যন্ত্রপাতির আয়ুষ্কাল না থাকায় কৃষকরা প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কৃষি আবহাওয়া ও নদ-নদীর অবস্থা সম্পর্কিত অগ্রিম তথ্য দেয়ার কথা থাকলেও মাঠ পর্যায়ে কৃষক পাচ্ছেন না আগাম আবহাওয়া বার্তা।

উপজেলা পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের আওতায় উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সারা দেশে কিয়স্ক, এগ্রোমেট ডিসপ্লে বোর্ড, অটোমেটিক রেইনগেজ স্থাপন করা হয়। জেলা পর্যায়ে রেডিও স্টেশন স্থাপন করাসহ কর্মকর্তাদের জন্য ইন্টারনেট ডাটাসহ ট্যাব বিতরণ করা হয়। এরই মধ্যে ইউনিয়ন পর্যায়ের ডিসপ্লে বোর্ডসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। চট্টগ্রামের রেডিও স্টেশনও সম্ভবত বন্ধ। তবে প্রকল্প থেকে কৃষকদের যে সুবিধা পাওয়ার কথা সেটি হয়নি। প্রকল্প শুরু হলেও জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে এসব যন্ত্রপাতি স্থাপন করতেই পাঁচ থেকে সাত বছর লেগে গেছে।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬-২১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটি বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সহযোগিতায় বাস্তবায়ন করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। প্রায় ৯৮৭ কোটি টাকার প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক ১০৬ কোটি টাকা সহায়তা দেয়। প্রকল্পের আওতায় ৬৪ জেলায় রেডিও স্টেশন নির্মাণ, ৪৮৭টি উপজেলায় কিয়স্ক মেশিন (কৃষকদের আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানার জন্য), ৪ হাজার ৫১টি ইউনিয়নে এগ্রোমেট ডিসপ্লে বোর্ড ও অটোমেটিক রেইনগেজ স্থাপন করা হয়। এছাড়া কৃষি অধিদপ্তরের এসএএওদের মাঝে ইন্টারনেটসহ দুই দফায় ১১ হাজার ট্যাব বিতরণ করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফেনী সদর উপজেলা ও ইউনিয়নে একটি কিয়স্ক, একটি অটোমেটিক ওয়েদার ডিসপ্লে ও ১২টি এনালগ ডিসপ্লে বোর্ড এবং ২০টির বেশি ট্যাব বিতরণ করা হয়। যার মধ্যে রেইনগেজ মেশিন কাজ করে না। এমনকি অন্যান্য যন্ত্রপাতি পরিচালনার জন্য নেই অপারেটর। এসব কারণে মেশিনগুলো অকেজো হয়ে পড়ে আছে। অন্যদিকে চট্টগ্রামের পটিয়া ও বোয়ালখালীতে বিতরণকৃত যন্ত্রপাতির অবস্থাও একই রকম। লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে নির্মাণাধীন কৃষি আবহাওয়া স্টেশনটির কাজই শেষ হয়নি। চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চল ছাড়াও দেশের অনান্য কৃষি অঞ্চলেও প্রকল্পটির অবস্থা প্রায় একই বলে জানা গেছে।

ফেনী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আতিক উল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কৃষি আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতি উন্নতকরণ প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে সম্ভবত। প্রকল্পের আওতায় জেলা, উপজেলা বা ইউনিয়নে যত যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে সেগুলো অকেজো হয়ে পড়ে আছে। ইউনিয়ন পর্যায়ের আবহাওয়া, ঘূর্ণিঝড়ের তথ্যগুলো এখানো আবহাওয়া অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে হাতে লিখে দিতে হচ্ছে। অনেক যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে। অপারেটর না থাকায় সেগুলো সংস্কার করাও হয়নি। মূলত কৃষকদের অগ্রিম তথ্য সরবরাহ করার জন্য প্রকল্পটি নেয়া হলেও কোনো কাজে আসেনি।’

চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলা কৃষি অফিসের এক কর্মকর্তা নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রকল্পটির আওতায় যেসব যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছিল বা ট্যাব দেয়া হয়েছিল সেটি নষ্ট। প্রকল্পটির কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। প্রকল্পটি শেষ হয়ে যাওয়ায় সম্ভবত কোনো কাজ হয় না। তবে হাতে লিখে যেসব তথ্য আগে প্রতিবেদন আকারে দেয়া হতো, এখনো সেভাবে কাজ করা হয়।

প্রকল্পটি গ্রহণের সময়ে বলা হয়েছিল বামিসের (কৃষি আবহাওয়া বিষয়ক একটি ওয়েব পোর্টাল) জন্য দেশের প্রতিটা ইউনিয়নে অবকাঠামো তৈরিসহ সেখানে আবহাওয়া অধিদপ্তর ও পাউবোর স্থানীয় নদ-নদীর তথ্য থাকবে। সেজন্য যন্ত্রপাতি বসানো হবে। যন্ত্রপাতির মাধ্যমে কৃষি আবহাওয়া সংক্রান্ত ডাটাবেজ তৈরি, ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি এবং ইউনিয়ন ও উপজেলার ভূমির তথ্য ডিজিটাল করা হবে, যা পরবর্তী সময়ে জিআইএস ও রিমোট সেন্সিংয়ের কাজে ব্যবহার করা হবে। এতে ইউনিয়নের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে কৃষককে করণীয় সম্পর্কে আগে ভাগেই দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ দেয়া যাবে। প্রকল্পটি পরিচালনায় দক্ষ জনবল গড়ে তোলা ও কৃষি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের শুরু থেকেই যন্ত্রপাতি পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা দেখা গেছে। প্রকল্পের কাজ নিয়মিতভাবে চালানো হলেও কভিডের সময় সময়ক্ষেপণ হয়। তবে ২০২১ সালে প্রকল্পটি শেষের কথা থাকলেও ২০২৪ সালে মোটামুটি সম্পন্ন হয়। যন্ত্রপাতি পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবলের সংকট সমাধান করা যায়নি। তাছাড়া ট্যাব বা অন্যান্য যন্ত্রপাতি সংস্কারের জন্য বরাদ্দ থাকলেও প্রকল্প থেকে যেভাবে দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়ার কথা সেটা পাননি কৃষক।

সার্বিক বিষয়ে চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আবদুচ ছোবহান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকল্পটির অনেক সুবিধা থাকলেও সেটি আলোর মুখ দেখেনি। যদি উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে যন্ত্রপাতি ঠিক এবং দক্ষ অপারেটর থাকত, তাহলে দুর্যোগ আসার আগেই কৃষকদের সচেতন করা যেত। তবে বিকল্প উপায়ে কৃষকদের কাছে তথ্য সরবরাহ করা হয়। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা নিয়মিত কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং তাদের বিভিন্ন পরামর্শ দেন।’

আরও