২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল

আগে সবচেয়ে বেশি ফ্ল্যাট কেনাবেচা ছিল মোহাম্মদপুরে পরে এগিয়েছে গুলশান

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা নেয়ার বছর ২০০৯ সালে রাজধানীবাসীর কাছে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ছিল মোহাম্মদপুর এলাকার ফ্ল্যাটের। সে তুলনায় বেশ পিছিয়ে ছিল গুলশান ও ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকাগুলো।

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা নেয়ার বছর ২০০৯ সালে রাজধানীবাসীর কাছে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ছিল মোহাম্মদপুর এলাকার ফ্ল্যাটের। সে তুলনায় বেশ পিছিয়ে ছিল গুলশান ও ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকাগুলো। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। গত বছর গুলশানের ফ্ল্যাট কেনায় সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করেছে মানুষ। এর বিপরীতে মোহাম্মদপুরে ব্যয় হয়েছে সবচেয়ে কম। মূলত নিম্নমধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হয়ে আসার পাশাপাশি উচ্চবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণীর কাছে নগদ টাকা বেড়ে যাওয়ার কারণেই এমনটা হয়েছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা শহরের জন্য একটি রেসিডেন্সিয়াল প্রপার্টি প্রাইস ইনডেক্স (আরপিপিআই) বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংককে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এ বিষয়ে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি ও চলতি বছরে মে মাসে বাংলাদেশ সফর করেছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা। প্রপার্টির দামের ক্ষেত্রে আবাসন খাতে অর্থায়নকারী ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ডিবিএইচ ফাইন্যান্স পিএলসির কাছ থেকে নেয়া তথ্য ব্যবহার করেছে আইএমএফ। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক নিচ্ছে ডিবিএইচ ফাইন্যান্সের পাশাপাশি আরো আটটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রপার্টি কেনাবেচার তথ্য। আইএমএফের আরপিপিআই মিশন সম্প্রতি একটি কারিগরি সহায়তা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে রাজধানীর ছয়টি এলাকায় ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে ২০০৯-২৩ সাল পর্যন্ত অর্থ লেনদেনের গতিপ্রকৃতি তুলে ধরা হয়েছে।

আইএমএফের প্রতিবেদনে ঢাকা শহরকে মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, গুলশান, মিরপুর, উত্তরা ও দক্ষিণ-পূর্ব ঢাকা—ছয়টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে মোহাম্মদপুর অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে মোহাম্মদপুরের পাশাপাশি আদাবর, শেরেবাংলা নগর ও হাজারীবাগ এলাকা। সে হিসাবে রাজধানীতে ২০০৯ সালে ফ্ল্যাট কেনায় যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে তার ২৮ দশমিক ৭ শতাংশই ছিল এ অঞ্চলে। এর পরের বছর ২০১০ সালে মোহাম্মদপুর অঞ্চলে ফ্ল্যাট কেনায় ব্যয় হয় ২৭ দশমিক ২ শতাংশ অর্থ। ২০১২ সালে এর পরিমাণ বেড়ে ২৯ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল। যদিও এর পরের বছর থেকে এ অঞ্চলে ফ্ল্যাট কেনায় অর্থ ব্যয়ের পরিমাণ কমেছে। ২০২২ সালে ১২ দশমিক ২ শতাংশ এবং সর্বশেষ ২০২৩ সালে ১০ শতাংশ অর্থ মানুষ ব্যয় করেছে মোহাম্মদপুর অঞ্চলে ফ্ল্যাট কিনতে গিয়ে।

রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও ব্রিক ওয়ার্কস ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের পক্ষে নগদ অর্থ দিয়ে ফ্ল্যাট কেনা সম্ভব হয় না। তাই বিশ্বের অন্যান্য দেশে কম সুদে ও দীর্ঘমেয়াদের জন্য ফ্ল্যাট কিংবা বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ ঋণ সুবিধা পায়। আমাদের দেশে পর্যাপ্ত ঋণ সুবিধা না পাওয়ার পাশাপাশি আর্থিক সক্ষমতা কমে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ফ্ল্যাট কেনার পরিমাণ কমেছে। অন্যদিকে উচ্চমধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের কাছে নগদ অর্থ থাকায় তারা ফ্ল্যাট কিনেছে এবং তাদের পছন্দের তালিকায় অভিজাত এলাকাগুলো অগ্রাধিকার পায়। ওইসব এলাকায় ফ্ল্যাট কেনায় বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে।’

ধানমন্ডি অঞ্চলের ভাগে পড়েছে–ধানমন্ডি, কলাবাগান, নিউমার্কেট, শাহবাগ ও রমনা এলাকা। এ অঞ্চলে ২০০৯ ও ২০১০ সালে ফ্ল্যাট কেনায় ব্যয় হয়েছে যথাক্রমে মোট অর্থের ১৫ দশমিক ২ ও ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০১৪ সালে ধানমন্ডি অঞ্চলে ফ্ল্যাট কেনায় সবচেয়ে বেশি ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়। আর ২০২২ সালে ১৩ দশমিক ৮ ও সর্বশেষ ২০২৩ সালে ফ্ল্যাটের ক্রেতারা ব্যয় করেছেন ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ অর্থ।

ঢাকা শহরের সবচেয়ে অভিজাত এলাকা বিবেচনা করা হয় গুলশানকে। আইএমএফের প্রতিবেদনে গুলশানের পাশাপাশি বাড্ডা, তেজগাঁও ও তেঁজগাও শিল্প এলাকাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এ অঞ্চলে। ২০০৯ সালে ১৫ দশমিক ৯ ও ২০১০ সালে ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ অর্থ এ অঞ্চলে ফ্ল্যাট কেনায় ব্যয় হয়েছে। এর পর থেকে তা ক্রমেই বেড়েছে। ২০২২ সালে ২৫ দশমিক ৮ ও সর্বশেষ ২০২৩ সালে ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ অর্থ গুলশান অঞ্চলে ফ্ল্যাট কেনায় ব্যয় হয়েছে।

ডিবিএইচ ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নাসিমুল বাতেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এককভাবে মূল গুলশান এলাকায় এত বেশি টাকার ফ্ল্যাট বিক্রি হয় না। তবে এর সংলগ্ন এলাকাগুলোকেও এ অঞ্চলের মধ্যে বিবেচনা করা হলে সেক্ষেত্রে ৩০ শতাংশের মতো অর্থ ব্যয় হতে পারে।’

মিরপুরের পাশাপাশি পল্লবী, কাফরুল, শাহআলী, দারুস সালাম এলাকাকে নিয়ে মিরপুর অঞ্চল। ২০০৯ সালে এ অঞ্চলে ১৪ দশমিক ৮ ও ২০১০ সালে ১২ দশমিক ৯ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে ফ্ল্যাট কেনায়। মিরপুর এলাকায় ফ্ল্যাট কেনায় সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছিল ২০১৮ সালে, ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ। আর ২০২২ সালে ১৮ ও সর্বশেষ ২০২৩ সালে ১২ দশমিক ৬ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে এ অঞ্চলে।

উত্তরা, উত্তরখান, দক্ষিণখান, খিলক্ষেত, ক্যান্টনমেন্ট, বিমানবন্দর ও তুরাগ এলাকা নিয়ে উত্তরা অঞ্চল হিসেবে ভাগ করা হয়েছে আইএমএফের প্রতিবেদনে। এ অঞ্চলে ২০০৯ সালে ১৭ দশমিক ৫ ও ২০১০ সালে ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে ফ্ল্যাট কেনায়। ২০১৯ সালে উত্তরা অঞ্চলে ফ্ল্যাট কেনায় সবচেয়ে বেশি ২০ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছিল। ২০২২ সালে ১৬ দশমিক ১ ও সর্বশেষ ২০২৩ সালে ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয় উত্তরা অঞ্চলে ফ্ল্যাট কেনায়।

দক্ষিণ-পূর্ব ঢাকা অঞ্চলে পড়েছে রামপুরা, খিলগাঁও, সবুজবাগ, পল্টন, মতিঝিল, সবুজবাগ, সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়া, শ্যামপুর, কদমতলী, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, কোতোয়ালী, বংশাল, চকবাজার, লালবাগ ও কামরাঙ্গীরচর এলাকা। এ অঞ্চলে ফ্ল্যাট কেনায় ২০০৯ সালে ৭ দশমিক ৮ ও ২০১০ সালে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে রাজধানীবাসীর। দক্ষিণ-পূর্ব ঢাকা অঞ্চলে ফ্ল্যাট কেনায় অর্থ ব্যয়ের পরিমাণ এর পরের বছরগুলোয় ক্রমান্বয়ে বেড়েছে এবং ২০২২ সালে তা সর্বোচ্চ ১৪ দশমিক ১ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। সর্বশেষ ২০২৩ সালে অবশ্য এ অঞ্চলে ফ্ল্যাট কেনায় ক্রেতারা ব্যয় করেছেন ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ অর্থ।

দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় আবাসন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মোহাম্মদপুর এলাকায় পর্যাপ্ত প্লট না থাকার কারণে এখন সেখানে ফ্ল্যাট নির্মাণ ও বিক্রির পরিমাণ কমে গেছে। বাড্ডা, বনশ্রী, আফতাবনগর, বসুন্ধরা ও মিরপুরের মতো এলাকায় ফ্ল্যাটের চাহিদা ও সরবরাহ বেড়েছে। ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, বারিধারার মতো অভিজাত এলাকাগুলোয় গত কয়েক বছরে বেশকিছু ফ্ল্যাট উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়েছে। তবে সংখ্যার হিসাবে সেটি খুব বেশি হবে না।’

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গুলশানের মতো অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট বিক্রি একেবারেই কমে গেছে। সেখানে বরং বিক্রির প্রবণতাই বেশি দেখা যাচ্ছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনেক সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিক, ব্যবসায়ীসহ প্রভাবশালী ব্যক্তি অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে গুলশান এলাকায় সম্পত্তি কিনেছিলেন। ৫ আগস্ট-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে তাদের বেশির ভাগই এখন আত্মগোপনে। অনেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছেন। আওয়ামী সুবিধাভোগীরাই এখন সম্পত্তি বিক্রির চেষ্টায় রয়েছেন, যা গুলশান এলাকায় সম্পত্তি বিক্রেতার সংখ্যা বাড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

আরও