পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটে গবেষণায় বরাদ্দ থাকে মাত্র দেড় শতাংশ

বিশ্বজুড়ে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্যতম ভূমিকা ও দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয় গবেষণাকে। তবে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বৈশ্বিক জ্ঞানচর্চার এ সংস্কৃতিতে বহু দিন ধরেই পিছিয়ে রয়েছে।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রতি অর্থবছরে পরিচালন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যে বাজেট দেয়া হয়, তার মধ্যে মাত্র দেড় শতাংশ বরাদ্দ থাকে গবেষণা খাতে। ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গবেষণায় বরাদ্দের পরিমাণ সামান্য হলেও প্রতি বছর অনেক বিশ্ববিদ্যালয় সেটাও পুরো ব্যয় করতে পারে না। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এক বছরে গবেষণায় অর্ধকোটি টাকাও ব্যয় করতে পারেনি।

দেশের ৫৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউজিসির অনুমোদিত বাজেট ছিল প্রায় ১৩ হাজার ২২২ কোটি টাকা। আর গবেষণা খাতে বরাদ্দ ছিল ১৯০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের মাত্র ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অনুমোদিত বাজেট ছিল ১১ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা এবং গবেষণা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ১৮৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। সে অর্থবছরে মোট বাজেটের ১ দশমিক ৬১ শতাংশ বরাদ্দ ছিল গবেষণায়। এছাড়া ২০২৩-২৪, ২০২২-২৩ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে গবেষণা খাতে বরাদ্দ ছিল যথাক্রমে মোট বাজেটের ১ দশমিক ৪১, ১ দশমিক ৪৩ ও ১ শতাংশ।

পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি বাজেট পায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)। গবেষণা খাতেও ঢাবিকে সর্বাধিক বরাদ্দ দেয়া হয়। গত কয়েক অর্থবছরের বাজেটের তথ্য অনুযায়ী, এ বিশ্ববিদ্যালয়েও গবেষণা খাতে বরাদ্দ ছিল ২ শতাংশের আশপাশে। চলতি অর্থবছরে ঢাবির জন্য বাজেট অনুমোদন করা হয় ১ হাজার ৩৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এ বাজেটে গবেষণায় বরাদ্দ ছিল ২১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের মাত্র ২ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইউজিসি থেকে ঢাবিকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল ৮০৪ কোটি ৪১ লাখ টাকা, যার মধ্যে গবেষণায় ছিল ২০ কোটি টাকা। সে অর্থবছরে বাজেটের ২ দশমিক ৪৮ শতাংশ গবেষণায় বরাদ্দ ছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয়টির সিন্ডিকেট ৯১৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকার বাজেট অনুমোদন দিয়েছিল। এ বাজেটে গবেষণা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল মাত্র ১৫ কোটি ৫ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

গবেষণায় বরাদ্দ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সম্ভাবনার তুলনায় বর্তমান বাজেট অত্যন্ত অপ্রতুল। মেধাবী শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও নানা গবেষণার ধারণা থাকলেও সেগুলো অর্থসংকটে বাস্তবায়ন করা যায় না। এ সংকট দূর করার জন্য গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে এ অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণও প্রয়োজন।’

গবেষণার সুযোগ ও বাজেট বৃদ্ধিতে তাদের পরিকল্পনা বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করতে কাজ চলছে। পরিবেশ, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনীতিসংশ্লিষ্ট বিষয়ে গবেষণাকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। তবে গবেষণার অগ্রগতির জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন, শিল্প-একাডেমিয়ার শক্তিশালী সহযোগিতা এবং একটি স্থায়ী গবেষণা তহবিল গঠন জরুরি। আমাদের দক্ষ-মেধাবী গবেষক আছেন কিন্তু যদি পর্যাপ্ত অর্থায়ন না থাকে তবে গবেষণা খাতে উন্নয়ন সম্ভব হবে না।’

এদিকে প্রতি বছর গবেষণা খাতে যে বরাদ্দ দেয়া হয় তা অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই ব্যয় করতে পারে না। ইউজিসির সর্বশেষ প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে বিভিন্ন খাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ২০২২-২৩ অর্থবছরের ব্যয়ের তথ্য পাওয়া যায়। এতে দেখা যায়, গবেষণা ব্যয়ে তুলনামূলক পিছিয়ে ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। এ অর্থবছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল ১০ কোটি ২ লাখ টাকা। এর বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়টি ব্যয় করতে সক্ষম হয়েছিল ৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ গবেষণা বরাদ্দের প্রায় ৩৫ দশমিক ২৩ শতাংশই অব্যয়িত ছিল।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান গবেষণাগারের পরিচালক অধ্যাপক ড. এবিএম হামিদুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকৃত গবেষণা এগিয়ে নিতে গবেষণা খাতে বাজেট বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রয়োজনীয় গবেষণা সরঞ্জাম কেনার পর সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায় না। বাজেট বাড়লে গবেষণা সরঞ্জাম ক্রয়, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা আরো আধুনিক ও কার্যকর করা সম্ভব হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘গবেষণায় বাজেট স্বল্পতার কারণে দেশ থেকে মেধা পাচার হয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের আরো বেশি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি গবেষকদেরও সমসাময়িক ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গবেষণায় মনোযোগী হওয়া উচিত।’

অন্যদিকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা খাতে বরাদ্দের ৫০ শতাংশের বেশি অর্থ ব্যবহার করা যায়নি। আলোচ্য অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষণা খাতে বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা আর ব্যয় করেছিল ৭০ লাখ টাকা। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও ২০২২-২৩ অর্থবছরে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) প্রায় ৭০ শতাংশ গবেষণা বরাদ্দ অব্যয়িত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট গবেষণা বরাদ্দ ছিল ২ কোটি ২২ লাখ টাকা আর ব্যয় করতে পেরেছিল মাত্র ৭০ লাখ টাকা।

২০২২-২৩ অর্থবছরে গবেষণা খাতে সবচেয়ে অব্যয়িত অর্থ ছিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। গবেষণা খাতে ৫ কোটি ২ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি ব্যয় করতে পেরেছে মাত্র ৫৮ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের মাত্র ১১ দশমিক ৬ শতাংশ। একই চিত্র ছিল উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে। গবেষণা খাতে ২ কোটি ৫২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও তারা ব্যয় করেছিল মাত্র ৩২ লাখ টাকা। এছাড়া এ অর্থবছরে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও ২৫ শতাংশের বেশি অর্থ অব্যয়িত ছিল।

দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ফসলের নতুন জাত উদ্ভাবনসহ বিভিন্ন গবেষণায় সাফল্যের দেখা পেয়েছে। তবে এ গবেষণা ও বরাদ্দ যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেমের (বাউরেস) পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাম্মাদুর রহমান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় বরাদ্দ ২ শতাংশেরও কম, যা দিয়ে সুষ্ঠুভাবে গবেষণা কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না। এ বরাদ্দে আমি মাত্র ১৬০ জন শিক্ষককে অর্থ দিতে পারি। কিন্তু গবেষণায় ৩৫০ জনের মতো শিক্ষককে বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন। অনেক স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ের শিক্ষার্থী নিজেদের অর্থায়নে বা শিক্ষকদের সহায়তায় গবেষণা করছে। সেজন্য গবেষণার বরাদ্দ অন্তত সর্বনিম্ন পর্যায়ের করা উচিত যাতে মানসম্মত গবেষণা নিশ্চিত হয়।’

​গবেষণার মানোন্নয়ন ও মানসম্মত গবেষণা নিশ্চিতে বরাদ্দের পরিমাণ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সর্বনিম্ন পর্যায়ের গবেষণা বরাদ্দ দিতেও ৫ শতাংশের মতো প্রয়োজন। যদি আমরা গবেষণায় পর্যাপ্ত পরিমাণে বরাদ্দ দিতে চাই, সে ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ লাগবে।’

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা খাতে পিছিয়ে থাকার প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়েও। যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং তৈরি হয় তার মধ্যে অন্যতম হলো গবেষণা। টাইমস হায়ার এডুকেশন ও কিউএসের সর্বশেষ প্রকাশিত র‍্যাংকিংয়ে সেরা ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পায়নি। কিউএস র‍্যাংকিংয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শীর্ষে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান ৫৮৫তম আর টাইমস হায়ার এডুকেশনে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যৌথভাবে শীর্ষে আছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৮০১ থেকে ১০০০-এর মধ্যে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আলী জিন্নাহ বলেন, ‘আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা খাতের বাজেট যেমন অপ্রতুল, তেমনি গবেষণার জন্য উপযুক্ত পরিবেশেরও ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া গবেষণা খাতে যে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়, সেই অর্থসংশ্লিষ্ট নিয়ম-নীতি গবেষণাবান্ধব নয়। অর্থ ছাড়ের নিয়ম ও গবেষণার মাঠপর্যায়ের কাজের ভিত্তিতে অর্থের প্রয়োজনীয়তায় বড় পার্থক্য আছে। যদি প্রকৃতপক্ষেই পরিস্থিতির উন্নয়ন করতে হয়, তাহলে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি গবেষণাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।’

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অপর্যাপ্ত গবেষণা বরাদ্দের বিষয়ে মতামত জানতে গত রাতে ইউজিসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার মন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

আরও