রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতাল

জনবল সংকটে চালু হয়নি নতুন ভবন, রোগী থাকছে করিডোরে

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা প্রসারে রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালে অত্যাধুনিক ভবন নির্মাণ করেছে সরকার।

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা প্রসারে রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালে অত্যাধুনিক ভবন নির্মাণ করেছে সরকার। ১১ তলাবিশিষ্ট ভবনে রয়েছে লিফটসহ আধুনিক অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ ও আইসোলেশন ইউনিট। এরই মধ্যে ছয়তলা নির্মাণ শেষ করে স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে ভবনটি হস্তান্তর করেছে গণপূর্ত বিভাগ (পিডব্লিউডি)। তবে জনবল সংকটে নতুন ভবনে কার্যক্রম স্থানান্তর বা শুরুই করতে পারেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

হাসপাতালসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে শতাধিক রোগী ভর্তি থাকছে। বিভিন্ন সময়ে বাড়তি সিট বরাদ্দ না পেয়ে অনেক রোগীকে থাকতে হচ্ছে হাসপাতালের মেঝে ও করিডোরে। সেখানে গাদাগাদি করে থাকা রোগীদের জন্য স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিও রয়েছে। নতুন ভবনে কিছু বিভাগ ও রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত ওয়ার্ড, কেবিন স্থানান্তর করা হলে এ সংকট নিরসন হবে।

পিডব্লিউডি রাঙ্গামাটি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ‘চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির (চতুর্থ এইচপিএনএসপি)’ আওতায় অত্যাধুনিক হাসপাতাল ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। নতুন ভবনটি ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হলেও এখনো অনুমোদন পাওয়া যায়নি। ভবনটি ১১তলা ভিতবিশিষ্ট হলেও প্রাথমিক পর্যায়ে ছয়তলা পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে সাড়ে ৪৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভৌত খাতে ৩৪ কোটি এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি খাতে ব্যয় হয়েছে সাড়ে ১৪ কোটি টাকা। ভবনটিতে ১ হাজার ৬০০ কেজি ধারণসক্ষমতা সম্পন্ন দুটি লিফট, এক হাজার কেজি ওজন সক্ষমতাসম্পন্ন আরো দুটিসহ মোট চারটি লিফট রয়েছে। এছাড়া সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহের জন্য পাইপ লাইন রয়েছে। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয় ২০২৪ সালের জুনে। তবে রাঙ্গামাটি স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে এটি হস্তান্তর করা হয় ২০২৫ সালের নভেম্বরে। নির্দিষ্ট সময়ে ভবনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলেও এক বছরের অধিক সময় পর ভবন বুঝে নেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পিডব্লিউডি রাঙ্গামাটির নির্বাহী প্রকৌশলী শর্মি চাকমা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভবনটি স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ ভবন বুঝে নিলেও এখনো সেবা কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি বলে শুনেছি। নতুন নির্মিত ভবন হলেও সেটি যদি অব্যবহৃত থাকে, সেক্ষেত্রে লিফটসহ অন্যান্য ইলেকট্রিক্যাল সামগ্রী নষ্ট হয়ে যেতে পারে।’

রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ছয়তলা ভবনটির নিচতলায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, ফার্মেসি, স্টোর, টিকেট কাউন্টারসহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালিত হবে। দ্বিতীয় তলায় ২০ শয্যার আইসিইউ ও আইসোলেশন কক্ষ রয়েছে। তৃতীয় তলায় বিশেষত পরীক্ষা-নিরীক্ষা-সংক্রান্ত প্যাথোলজিক্যাল ল্যাব, এক্স-রে, এমআরআই ও কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিট হবে। চতুর্থ তলাজুড়ে অপারেশন থিয়েটার (ওটি), পঞ্চম তলায় পোস্ট-অপারেটিভ ইউনিট (অপারেশনের পর রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা কক্ষ) এবং ষষ্ঠ তলায় রোগীদের জন্য ওয়ার্ড ও কেবিন থাকবে।

চিকিৎসকরা বলছেন, পাহাড়ি জেলা রাঙ্গামাটি অন্যান্য জেলার চেয়ে চিকিৎসাসেবায় অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। তবে এ জেলায় মেডিকেল কলেজ স্থাপন, উপজেলাকেন্দ্রিক আধুনিক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ এবং একমাত্র জেনারেল হাসপাতাল আধুনিকায়নের ফলে স্বাস্থ্যসেবায় কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। উপজেলাগুলো দুর্গম হওয়ায় প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অনেকটাই ‘শেষ ভরসা’ রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতাল।

সার্বিক বিষয়ে রাঙ্গামাটির সিভিল সার্জন ও জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. নূয়েন খীসা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গণপূর্ত বিভাগ আমাদের গত বছরের শেষ দিকে ভবনটি হস্তান্তর করে। নতুন ভবনটিতে রোগীদের সেবা দেয়ার জন্য অত্যাধুনিক ব্যবস্থাপনা থাকলেও জনবল সংকটে কার্যক্রম শুরু করতে পারছি না। ১০০ শয্যার হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত করতে অনুমোদন নিতে হবে। আমরা যদি ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের প্রশাসনিক অনুমোদন পেতাম, সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জনবলের জন্য চাহিদাপত্র দিতে পারতাম। দাপ্তরিক কাজ হলে একই ব্যক্তি দুটি উপজেলায়ও একই সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। কিন্তু এখানে দুটি আউটলেট একই জনবল দিতে চালানো সম্ভব নয়। সে কারণে আমাদের সেবাদানে হিমশিম খেতে হলেও পুরনো ভবনেই কার্যক্রম চলছে।’

ভবনের বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে, এমন কথা স্বীকার করে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায় বলেন, ‘যেকোনো কিছুই অব্যবহৃত থাকলে ভালো থাকে না। স্বল্প জনবল নিয়েও কিছুদিনের মধ্যে আমরা সীমিত আকারে নতুন ভবনটি চালু করার চেষ্টা করব। আগামী মাসের মধ্যেই নতুন ভবনে চোখের অপারেশনগুলো করা যায় কিনা সে বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছি।’

আরও