সিএনএন বিশ্লেষণ

গাজায় যুদ্ধ ও মানবিক সংকটে ক্রমশ একঘরে হয়ে পড়ছে ইসরায়েল

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের চলতি অধিবেশনেও ইসরায়েলের কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা প্রকট হয়ে উঠেছে। কানাডা, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, যেসব দেশ এতদিন ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল, তারাও এখন দূরে সরে যাচ্ছে।

গাজায় চলমান যুদ্ধ ও মানবিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমেই একঘরে হয়ে পড়ছে ইসরায়েল। এর প্রভাব শুধু কূটনীতিতেই নয়, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও খেলাধুলার মঞ্চেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

জাতিসংঘের এক স্বাধীন অনুসন্ধানী কমিশন সম্প্রতি প্রথমবারের মতো সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েছে ইসরায়েল। দেশটির সরকার অভিযোগটি প্রত্যাখ্যান করলেও এর পর থেকেই আন্তর্জাতিক নিন্দার ঢল নামছে।

ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার ইউরোপীয় ইউনিয়নও গত সপ্তাহে দেশটির সঙ্গে আংশিক বাণিজ্য চুক্তি স্থগিতের প্রস্তাব করেছে। এরই মধ্যে কিছু পশ্চিমা দেশ ইসরায়েলি ব্যক্তি, বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠী ও পশ্চিম তীরে সহিংসতা উসকে দেয়া সংগঠনের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এ ছাড়া আগস্টে নরওয়ের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল ইসরায়েলে বিনিয়োগের কিছু অংশ তুলে নেয়। পাশাপাশি ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, স্পেন ও যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ তাদের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্বীকার করেছেন, ইসরায়েল এক ধরনের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি হয়েছে, যা কয়েক বছর স্থায়ী হতে পারে। তিনি বলেন, ইসরায়েলকে নিজস্ব অস্ত্রশিল্প বাড়াতে হবে এবং অর্থনীতিকে বহির্ভরশীলতা থেকে সরিয়ে আনতে হবে। যদিও পরে তিনি মন্তব্যটি প্রতিরক্ষা খাতের প্রেক্ষাপটে বলেছেন বলে ব্যাখ্যা দেন।

সংস্কৃতি ও বিনোদনেও প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে। আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও স্পেনের জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ইউরোভিশন গানে ইসরায়েল অংশ নিলে তারা বর্জন করবে। একইভাবে বেলজিয়ামের ঘেন্টে এক সঙ্গীত উৎসবে ইসরায়েলি কন্ডাক্টর ও পিয়ানোবাদক লাহাভ শানির অংশগ্রহণ বাতিল করা হয়েছে।

হলিউডে এক হাজারের বেশি চলচ্চিত্রকর্মী, অভিনেতা ও পরিচালক ইসরায়েলি চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সইকারীদের মধ্যে রয়েছেন অস্কারজয়ী অভিনেত্রী অলিভিয়া কোলম্যান ও এমা স্টোন।

খেলাধুলায়ও ইসরায়েলকে ঘিরে বয়কটের ঢেউ উঠছে। স্পেনে এক আন্তর্জাতিক দাবা প্রতিযোগিতায় ইসরায়েলি খেলোয়াড়দের জাতীয় পতাকার অধীনে খেলতে না দেয়ায় তারা সরে দাঁড়িয়েছেন। ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা (ইউইএফএ) থেকেও দেশটিকে বহিষ্কারের আশঙ্কা করছে ইসরায়েলি গণমাধ্যম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পরিস্থিতি অনেকটা দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য আমলের মতো, যখন অর্থনীতি থেকে শুরু করে খেলাধুলা—সবক্ষেত্রে দেশটি একঘরে হয়ে পড়েছিল। ইসরায়েলের সাবেক কূটনীতিক ইলান বারুখ বলেছেন, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া অঙ্গনে এই চাপ নীতিনির্ধারণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের চলতি অধিবেশনেও ইসরায়েলের কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা প্রকট হয়ে উঠেছে। কানাডা, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, যেসব দেশ এতদিন ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল, তারাও এখন দূরে সরে যাচ্ছে।

এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। ফলে তার বিদেশ সফরও সীমিত হয়ে পড়েছে। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে গিয়েও ফ্রান্স ও স্পেনের আকাশপথ এড়িয়ে যেতে হয়েছে তাকে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সমর্থক। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি বলেছেন, ‘আমাদের সম্পর্ক ইসরায়েলের সঙ্গে দৃঢ় থাকবে।’

আরও