দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন আইল্যান্ডের অবস্থান কক্সবাজার-টেকনাফ উপদ্বীপের কিনারা থেকে নয় কিলোমিটার দক্ষিণে। উত্তরে ও দক্ষিণে কিছুটা প্রশস্ত থাকলেও মাঝামাঝি এসে একেবারে সরু হয়ে এসেছে দ্বীপটি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ক্ষুদ্র দ্বীপটির উচ্চতাও খুব বেশি নয়।
প্রতিবেশগতভাবে ঝুঁকিতে থাকা দ্বীপটিতে বসবাস সময়ে সময়ে খোদ স্থানীয়দের জন্যই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে বঙ্গোপসাগরের আবহাওয়া উত্তাল হয়ে ওঠায় বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে এক প্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন তারা। এ সময় তাদের জীবনযাপনও হয়ে ওঠে অত্যন্ত কঠিন।
বঙ্গোপসাগরেরই উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারত নিয়ন্ত্রিত আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের একেবারেই কোলঘেঁষে অবস্থান কোকো আইল্যান্ডস বা কোকো দ্বীপপুঞ্জের। সাতটি দ্বীপের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা দ্বীপপুঞ্জটির বৃহত্তম গ্রেট কোকো আইল্যান্ডের আয়তন ১৪ দশমিক ৫৭ বর্গকিলোমিটার।
বঙ্গোপসাগরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এসব দ্বীপের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে পর্যবেক্ষক মহলে এখন আলোচনা চলছে অনেক। ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্বের দিক থেকে মিয়ানমারের কোকো আইল্যান্ডকেই এগিয়ে রাখছেন তারা। এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য হলো কৌশলগত বিষয়গুলো বিবেচনা করলে সেন্ট মার্টিন এমনিতেই অনেক নিচু একটি দ্বীপ। প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন দ্বীপটির ওপর জলোচ্ছ্বাসসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাত-অভিঘাতও তুলনামূলক অনেক বেশি। স্থায়ী ও বৃহদায়তনের সামরিক স্থাপনা এখানে গড়ে তোলা অনেক কঠিন। আবার বিভিন্ন সময়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে অদূর ভবিষ্যতে দ্বীপটি ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা।
সে তুলনায় বর্তমানে ভূরাজনৈতিক কৌশলগত দিক থেকে কোকো আইল্যান্ডকেই অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন পর্যবেক্ষকরা। দ্বীপগুলো গড়ে উঠেছে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরের মিলনস্থলে। সামরিক দিক থেকেও মালাক্কা প্রণালির সঙ্গে এ অঞ্চলের বাণিজ্যিক নৌপথে নজরদারির জন্য দ্বীপগুলোকে আদর্শ স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আবার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথেরও সেন্ট মার্টিনের চেয়ে কোকো দ্বীপপুঞ্জের অবস্থান কাছাকাছি।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপপুঞ্জে প্রথম জনবসতি গড়ে ওঠে প্রায় ২৫০ বছর আগে অষ্টাদশ শতাব্দীতে। দ্বীপটির স্থানীয় নাম ‘নারিকেল জিনজিরা’। ব্রিটিশ আমলে চট্টগ্রামের ডেপুটি কমিশনার মি. মার্টিনের নামে দ্বীপটির নামকরণ করা হয় ‘সেন্ট মার্টিন’। পর্যটকদের কাছে অনেক আকর্ষণের জায়গা হলেও দ্বীপটি এখন পর্যটন কেন্দ্রের হৈহল্লা-দূষণের চাপও নিতে পারছে না।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামানও মনে করছেন, ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের দিক থেকে তুলনামূলকভাবে অনেক পিছিয়ে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সেন্ট মার্টিনকে দ্বীপ না বলে ওশেন মাউন্ড (সাগরের মাঝে মাথাচাড়া দেয়া ঢিবি) বলাই ভালো। এখানে জাহাজ ভেড়ানো অনেক কঠিন। আবহাওয়াও অনেক বৈরী। দ্বীপটির যতটুকু ভূকৌশলগত গুরুত্ব আছে, সেটুকু আছে শুধু বিকল্প না থাকার কারণে।’
সে তুলনায় গ্রেট কোকো আইল্যান্ডের কাঠামো বৃহৎ অবকাঠামো গড়ে তোলার বেশ উপযোগী। এমনকি এখানে চীনের বিরুদ্ধে গোপন নজরদারির ঘাঁটি ও আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ আয়তনের এয়ারস্ট্রিপ নির্মাণের অভিযোগ তুলেছে ভারত। দেশটির সামরিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকদের দাবি, গত শতকের শেষ দশকে অনেকটা গোপনেই চীনের কাছে দ্বীপপুঞ্জটি ইজারা দিয়েছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগে রয়েছে ভারত।
তবে বর্তমানে এ উদ্বেগ আরো বাড়ছে বলে দাবি করছে ভারতীয় পর্যবেক্ষক সংস্থা ও গণমাধ্যম। তাদের ভাষ্যমতে, কোকো আইল্যান্ডসে সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলার পাশাপাশি গোয়েন্দা প্রযুক্তি স্থাপন করছে চীন। সেখানে বেইজিংয়ের উপস্থিতির কথা সরাসরি স্বীকার না করলেও বিষয়টি নিয়ে বেশ ভালোভাবেই সচেতন রয়েছে নয়াদিল্লি।
তবে ভারতীয় ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গণমাধ্যমের জন্য আরো উদ্বেগের জায়গা হলো পাশেই আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে প্রথম ত্রিমাত্রিক সামরিক কমান্ড (নৌ, বিমান ও স্থলবাহিনীকে যুক্ত করে) গড়ে তুলেছে ভারত। গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌঘাঁটির পাশাপাশি সেখানে মিসাইল উৎক্ষেপণ কেন্দ্রও স্থাপন করা হয়েছে। কোকো আইল্যান্ডস থেকে আন্দামান ও নিকোবরে ভারতের সামরিক কার্যকলাপের ওপর খুব সহজেই একেবারে কাছ থেকে নজরদারি চালাতে পারে চীন।
ইন্দোপ্যাসিফিকে চীনকে মোকাবেলায় বদ্ধপরিকর প্রতিটি পরাশক্তিই এখন কোকো আইল্যান্ডসকে নিয়ে বেশ উদ্বেগে রয়েছে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া—এ চার দেশের জোট কোয়াড বিভিন্ন সময়ে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যৌথ মহড়ার পাশাপাশি নানা সামরিক তৎপরতার উদ্যোগ নিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশগুলোর যাবতীয় তৎপরতায় একিলিস হিল (ব্যাপক শক্তিমত্তা সত্ত্বেও চূড়ান্ত বিপর্যয়ের কারণ হয়ে ওঠার মতো দুর্বল স্থান) হয়ে উঠতে পারে কোকো দ্বীপপুঞ্জের সর্ববৃহৎ দ্বীপ গ্রেট কোকো আইল্যান্ড।
দ্বীপপুঞ্জটিতে চীনের উপস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর দাবি, সেখান থেকে অনেকদিন ধরেই আন্দামানে ভারতীয় সামরিক কার্যকলাপের ওপর নজর রাখছে চীন। এজন্য ১৯৯২ সালে সেখানে সিগইন্ট (সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স বা সামরিক সিগন্যালে আড়ি পাতার মাধ্যমে নজরদারি কার্যকলাপ) ফ্যাসিলিটি স্থাপন শুরু করে চীন। ১৯৯৩ সালের মাঝামাঝি এজন্য নতুন রাডার স্থাপন করা হয়। ১৯৯৪ সালের মধ্যেই সেখান থেকে পুরো মাত্রায় নজরদারি কার্যকলাপ শুরু করে চীন। এছাড়া ১৯৯৪ সালে সেখানকার পাঁচটি দ্বীপের মধ্যে দুটি চীনকে ইজারা দিয়েছে মিয়ানমার।
তবে চীন ও মিয়ানমার শুরু থেকেই এ দাবি অস্বীকার করে এসেছে। এমনকি নয়াদিল্লি বা যুক্তরাষ্ট্রও বিষয়টি সরাসরি স্বীকার করেনি এখনো। ২০০৫ সালে ভারতের তৎকালীন নৌপ্রধান বলেছিলেন, ভারতের কাছে নিশ্চিত তথ্য রয়েছে কোকো আইল্যান্ডসে চীনের কোনো লিসেনিং পোস্ট, রাডার বা সার্ভিল্যান্স স্টেশন নেই। ২০১৪ সালে আন্দামান ও নিকোবর কমান্ডের প্রধান এয়ার মার্শাল পিকে রায় বলেছিলেন, চীন সেখানে একটি রানওয়ে বানাচ্ছে, তবে তা বেসামরিক প্রয়োজনে। সেখানে চীনের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতিকে মোটেও উদ্বেগজনক বলা যায় না।
কয়েক বছর আগে ওপইন্ডিয়ায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে দাবি করা হয়, কোকো আইল্যান্ডসে চীনের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি সম্পর্কে ভারতীয় সামরিক মহল বেশ ভালোভাবেই ওয়াকিবহাল রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ভালোমতোই জানেন, সেখানে চীনের শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। সেখানে সিগইন্ট ফ্যাসিলিটির পাশাপাশি নৌঘাঁটি ও রাডার সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর ওপর নজরদারি করছে বেইজিং।
অন্যদিকে এয়ার মার্শাল পিকে রায় উল্লিখিত বিমানবন্দরের রানওয়েটি সম্পর্কে ওপইন্ডিয়ায় বলা হয়, গ্রেট কোকো আইল্যান্ডে (কোকো দ্বীপপুঞ্জের বৃহত্তম দ্বীপ) আগে বেসামরিক উড়োজাহাজ চলাচলের কাজটি দীর্ঘদিন একটি এক হাজার মিটার দৈর্ঘ্যের ছোট এয়ারস্ট্রিপ দিয়েই চলেছে। কিন্তু চীনারা বর্তমানে এটিকে আড়াই হাজার মিটার দৈর্ঘ্যের রানওয়ে বানিয়ে তুলেছে। এত বিশাল রানওয়ে শুধু সামরিক উড়োজাহাজের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়। উপরন্তু সেখানে এখন আর কোনো বেসামরিক উড়োজাহাজ অবতরণ করে না।
একই কথা বলেছেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা বিনায়ক ভাটও। কয়েক বছর আগে তার একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে দিল্লিভিত্তিক ওআরএফ ফাউন্ডেশন। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, গত এক দশকে কয়েক দফায় সম্প্রসারণের মাধ্যমে কোকো আইল্যান্ডের এয়ারস্ট্রিপের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে আড়াই হাজার মিটার করা হয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ দিকের এক হাজার মিটার বানানো হয়েছে পাহাড় কেটে। সেখান থেকে সরিয়ে নেয়া মাটি সম্ভবত দ্বীপের কিনারে সাগর ভরাটের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।
তিনি জানিয়েছিলেন, স্যাটেলাইট থেকে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেও সেখানে একটি রাডার স্টেশনের উপস্থিতি দেখা গেছে। রাডার স্টেশনে অন্তত তিনটি শোরাড (স্বল্পপাল্লার বিমানবিধ্বংসী প্রতিরক্ষা) গান মোতায়েনকৃত অবস্থায় ছিল। এছাড়া রাডার স্টেশনের নির্মাণশৈলী বলছে, এটি চীনাদেরই বানানো অথবা তাদের সহায়তা নিয়ে নির্মিত।
ওই সময়ে কোকো আইল্যান্ডসে চলমান নির্মাণকাজ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, বড় এয়ারস্ট্রিপটি সামরিক উড়োজাহাজ উড্ডয়ন-অবতরণের উপযুক্ত। এছাড়া রাডার স্টেশনটি শ্রীলংকা থেকে মালাক্কা প্রণালি পর্যন্ত ভারতের প্রতিটি কার্যকলাপের ওপর নজরদারি করতে সক্ষম। সেক্ষেত্রে এ নতুন হুমকির বিষয়টিকে সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে ভারতের।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, কোকো আইল্যান্ডসের গুরুত্বের বড় একটি জায়গা হলো মালাক্কা প্রণালির কাছাকাছি এর অবস্থান। প্রণালিটিতে এখন মার্কিন নৌ-তৎপরতা অনেক বেশি। চূড়ান্ত সংঘাতের মুহূর্তে নিজ ভূখণ্ডের কাছাকাছি আন্তর্জাতিক নৌরুটটি কোনোভাবেই হাতছাড়া হতে দিতে নারাজ চীন। রুটটি নিয়ে বেইজিংয়ের মধ্যে এক ধরনের ভীতি রয়েছে।
সে তুলনায় সেন্ট মার্টিনের গুরুত্ব অনেক কম বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। এজন্য উচ্চতা অনেক কম হওয়ার পাশাপাশি দ্বীপের বৈরী আবহাওয়া ও ভূগঠনকেও অনেকাংশেই দায়ী করছেন তারা।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপের ভূকৌশলগত গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আসলে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতেই কথা বলা সমীচীন হবে। তবে ব্যক্তিগতভাবে এমন কোনো নথি আমি দেখিনি, যেখানে সেন্ট মার্টিনকে ভূকৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি করা হয়েছে।’