এসব শিশু নয় মাসের কম বয়সী। এতে দেশে টিকাদান প্রক্রিয়া নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে চমেক হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ৪৩ শিশু চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে চারজনের নমুনা পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে। বাকিদের নমুনা পাঠানো হলেও এখনো রিপোর্ট আসেনি। আক্রান্তদের বড় অংশই টিকার আওতার বাইরে ছিল। আবার অনেকের নির্ধারিত বয়সসীমা পার হলেও টিকার দ্বিতীয় ডোজ সম্পন্ন করেনি। চিকিৎসকরা বলছেন, টিকাদানে অনিয়ম, সচেতনতার ঘাটতি এবং দেরিতে স্বাস্থ্যসেবা নেয়ার প্রবণতাই বর্তমান পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে হামের টিকা প্রদানের সময়সীমা এবং দেশের হাম রোগের প্রাদুর্ভাব-সংক্রান্ত বিষয়ে চিকিৎসা বিভাগের অদূরদর্শিতাও দায়ী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চমেক হাসপাতালের তথ্যমতে, রিপোর্টের অপেক্ষায় থাকা ৩৯ শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি থাকলেও আক্রান্ত চারজনকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে। ভর্তি শিশুর মধ্যে ২৭ জন এখনো হামের টিক নেয়নি। অন্যদিকে নয় শিশু মাত্র এক ডোজ করে টিকা নিয়েছে। আর বাকি ছয়জন দুই ডোজ টিকা নিলেও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে।
তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঢাকায় নমুনা পাঠানোর পরে পরীক্ষায় হামে আক্রান্ত নিশ্চিত হওয়া দুই শিশুর একজনের বয়স ১১ মাস এবং অন্যজনের বয়স ১৪ বছরের মধ্যে। এ দুই শিশু আগে কখনো টিক নেয়নি। অন্যদিকে আক্রান্ত অন্য দুই শিশু দুই ডোজ টিকা নেয়ার পরও আক্রান্ত হয়েছে।
অন্যদিকে উপসর্গ নিয়ে ভর্তি থাকা ২৫ শিশুর মধ্যে ১০ মাস থেকে ১২ বছর বয়সসীমার নয় শিশু টিকা নেয়ার বয়স পার হলেও ভ্যাকসিন নেয়নি। বাকি ১৬ শিশুর বয়স সর্বনিম্ন চার-নয় মাস পর্যন্ত। অর্থাৎ হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুদের বেশির ভাগেরই বয়স নয় মাসের কম। চিকিৎসকরা বলছেন, নয় মাস বয়সী শিশুরা টিকার আওতায় আসে। কিন্তু হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি বেশির ভাগ শিশুর বয়স নয় মাসের কম। এজন্য নমুনার ফল এলেই উপসর্গ নিয়ে ভর্তি শিশুদের হামে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হবে বলে জানিয়েছেন তারা।
চিকিৎসকরা জানান, বাংলাদেশে হামের টিকা মূলত কোনো শিশুর বয়স নয় মাস হলে দেয়া হয়। কিন্তু অনেকে নয় মাস বয়স পার হলেও টিকা দেয়। সম্প্রতি দেশব্যাপী যেসব শিশু উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে কিংবা যাদের নমুনা পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে, তাদের বেশির ভাগেরই বয়স নয় মাস বা তার কম। তবে নয় মাসের বেশি কিংবা সাত বছর এমনকি ১২-১৪ বছরের শিশুদেরও হামের উপসর্গ দেখা যাচ্ছে।
দেশে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচির নিয়মমাফিক নয় মাস বয়সী শিশুদের হামের টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫-১৬ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেয়ার নিয়ম রয়েছে। পরিণত বয়সী শিশুদের নির্দিষ্ট সময়ে না দেয়ায় টিকা দেয়ার বয়স পেরিয়ে যাওয়ার পরও হাম আক্রান্তের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এজন্য সম্প্রতি শিশুদের প্রথম ডোজের টিকা দেয়ার বয়সসীমা কমিয়ে ছয় মাসে নিয়ে আসা যায় কিনা সে বিষয়ে গত ৩০ মার্চ সুপারিশ করেছে ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি গ্রুপ (এনআইটিএজি)। এ সুপারিশের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টিকা দ্রুত দেয়ার কাজ শুরু করবে স্বাস্থ্য বিভাগ।
চমেকের শিশু ওয়ার্ডে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুদের অভিভাবকরা জানান, বাচ্চাদের নিউমোনিয়ার মতো লক্ষণের পাশাপাশি গায়ে সামান্য ফুসকুড়ির মতো দেখা গেছে। আবার অনেক শিশুর গায়ে জ্বর আছে কয়েক দিন ধরে। নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট পেলে বুঝতে পারব। তাছাড়া আবহাওয়া পরিবর্তন এবং ঠাণ্ডা-গরমের কারণে শিশুদের নানাবিধ সমস্যা আছে। তবে তারা হাম ও নিউমোনিয়ার নিয়েই বেশি শঙ্কিত বলে জানান।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চমেকে ৩৯ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি আছে, চারজন হামে আক্রান্ত। তাদের মধ্যে দুইজন হামের একডোজ টিকাও নেয়নি। গত সোমবারেও ৬৫টি নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। নতুন করে একজন শিশু আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। বুধবার শিশুটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে চমেকের আইসিইউতে নিয়ে আসা হয়। পরে রাতে শিশুটি মারা যায়। শিশুটির হামের নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট পেলে হামে আক্রান্ত হয়েছে কিনা বলা যাবে।’
তিনি আরো জানান, চমেকে হামের চিকিৎসার জন্য আলাদা কর্নারের পাশাপাশি আইসিইউতে আলাদা কর্নার করা হয়েছে। তবে হামের উপসর্গ কিংবা হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলে আমাদের ৮ নম্বর ওয়ার্ড সম্পূর্ণ খালি করে আলাদা বিশেষায়িত ওয়ার্ড করে দেয়া হবে। হামের টিকার কোনো সংকট নেই। চমেকের বাইরে বেশকিছু হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হলেও তার সংখ্যা কম। বিশেষায়িত হাসপাতাল বিআইটিআইডিতে কোনো রোগী এখনো পর্যন্ত যায়নি। কারণ চমেকের মতো আইসিইউসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সেখানে নেই। আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ভর্তি শিশুদের চিকিৎসায় কাজ করছি।’
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের বৃহস্পতিবারের তথ্য বলছে, চট্টগ্রাম মেডিকেলসহ নগরী ও উপজেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ৮০ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। এদিকে নতুন করে ১২টি নমুনাসহ মোট ১২৩টি নমুনা ঢাকাতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। যার মধ্যে নগরীর ৬০টি ও উপজেলার ৬৩টি। সব নমুনার ফলাফল হাতে পাওয়া না গেলেও এখন পর্যন্ত চট্টগ্রামে আটজনের হাম শনাক্ত হয়েছে। যার মধ্যে নগরীর ছয়জন ও উপজেলার দুইজন। এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে দুই শিশু চমেক হাসপাতালে মারা গেছে। এর মধ্যে এক শিশু কক্সবাজার থেকে চিকিৎসা নিতে এসেছিল।
চট্টগ্রামে হাম আক্রান্ত শিশুদের বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে জানান, ২০টি নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় একমাত্র হামের নমুনা পরীক্ষাগার এনপিএমএল, আইপিএইচে পাঠানো হয়েছে। একজন হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি আছে। জেলা ও উপজেলার হাসপাতালগুলোকে হাম কিংবা এ-সংক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার বিষয়ে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেয়া হয়ছে।
দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে একদিনে চারজনের মৃত্যু—স্বাস্থ্য অধিদপ্তর: হামের উপসর্গ নিয়ে একদিনে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৬৮৫ জন। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। আর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ৬৮৫ জন। এ সময় হামের সংক্রমণ মোকাবেলায় সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলেও জানায় সংস্থাটি।
অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান বলেন, ‘আটটি বিভাগীয় শহরের মেডিকেল কলেজ ছাড়াও ঢাকার মুগদা, সোহরাওয়ার্দী, ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কভিড-১৯ হাসপাতাল, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, মাতুয়াইলের আইসিএমএইচ এবং মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আলাদা ওয়ার্ড খোলা হয়েছে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ মার্চ পর্যন্ত দেশে হামে আক্রান্ত হয়েছেন ৬৭৮ জন। তবে হাসপাতালগুলোর তথ্য অনুযায়ী এই সংখ্যা আরো কয়েক গুণ।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া নয়/দশ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মারা যাওয়া শিশুটির নাম সাফওয়ান। তার বাড়ি কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়ায়। গত বুধবার রাতে তার মৃত্যু হয়। চমেকের তথ্য অনুযায়ী, শিশুটি হামের কোনো টিকা নেয়নি।
মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘রাতে চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিলে প্রথমে তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হওয়ায় সকালে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে শিশুটি পিআইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল।’
এদিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে গতকালও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া হাম সন্দেহে রামেকে ভর্তি রয়েছে মোট ১৩২ শিশু। রামেকের মিডিয়া মুখপাত্র ও ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার (ইএমও) ডা. শঙ্কর কে বিশ্বাস এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ‘বুধবার সকাল ৯টা থেকে গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় রামেক হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে নতুন করে ২০ শিশু ভর্তি হয়েছে। হাম থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে চারজন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত রামেক হাসপাতালে হাম সন্দেহে চিকিৎসা নিয়েছে ৩৪০ শিশু।
এছাড়া দিনাজপুরের হিলিতে একজন সন্দেহভাজন হামের রোগীর নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। হাকিমপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইফতেখার জাহান বলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত হামের টিকা মজুদ রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, কোনো সমস্যা হবে না।’
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন রাজশাহী ও দিনাজপুর প্রতিনিধি