তথ্য চুরির শঙ্কায় বিশ্বজুড়ে আর্থিক খাতে কড়াকড়ি, দেশেও বিভিন্ন ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সাইবার ঝুঁকি দ্রুত বদলাচ্ছে এবং নতুন দুর্বলতা শনাক্ত হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানানোর সময়ও কমে আসছে।

বহুল ব্যবহৃত ওয়েব প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর সাইবার হামলা ও তথ্য চুরির আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করছে। কোথাও অনলাইন ব্যাংকিং, অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের কিছু সেবা সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে, কোথাও ঝুঁকিপূর্ণ সিস্টেম ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিরাপত্তা হালনাগাদ করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সরকারি-বেসরকারি অন্তত ১০টি ব্যাংক তাদের ওয়েবসাইট সাময়িক বন্ধ রেখেছে। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের সাইবার হামলা, তথ্য চুরি বা আর্থিক ক্ষতির তথ্য না মিললেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ব্যাংকগুলোর জরুরি নিরাপত্তা অডিট, নিয়মিত পেনিট্রেশন টেস্ট এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক বৃহস্পতিবার থেকে নিজস্ব ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ পদক্ষেপের পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেশের আরো কয়েকটি ব্যাংকও নিজেদের ওয়েবসাইট বন্ধ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক, এসবিএসি ব্যাংক ও বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো জানিয়েছে, সম্ভাব্য সাইবার ঝুঁকি এড়াতে এবং প্রযুক্তি অবকাঠামোর নিরাপত্তা যাচাই করতেই এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ঝুঁকি কেটে গেলে ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা যাচাই শেষ হলে ওয়েবসাইটগুলো আবার চালু করা হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কোনো দুর্ঘটনার কথা আমরা শুনিনি। দেশের ব্যাংকগুলোকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। তাদের তথ্যপ্রযুক্তি টিমের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট দলের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী সতর্কতা জারির পর আমরাও সতর্ক হই। এর মধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেয়। সে খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের ওয়েবসাইটও বন্ধ করা হয়। যতক্ষণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওয়েবসাইট বন্ধ রাখবে, ততক্ষণ আমরাও বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তাসহ তথ্যপ্রযুক্তি দল সতর্ক রয়েছে।’ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপ অনুসরণ করে ওয়েবসাইট বন্ধ রেখেছে মার্কেন্টাইল ব্যাংকও। বিষয়টি নিশ্চিত করে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিউল হাসান বণিক বার্তাকে জানান, ঝুঁকি কেটে গেলে আবার ওয়েবসাইট সচল করা হবে।

পিএইচপিভিত্তিক কিছু টুল ব্যবহারের কারণে সতর্কবার্তা পাওয়ার পর শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক তাদের ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহউদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা সতর্কবার্তা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওয়েবসাইট বন্ধ করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করার উদ্যোগ নিয়েছি। আমাদের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সাইবার ঝুঁকি দ্রুত বদলাচ্ছে এবং নতুন দুর্বলতা শনাক্ত হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানানোর সময়ও কমে আসছে। এ অবস্থায় ব্যাংকগুলোর মূল লেনদেন নেটওয়ার্ক ও গ্রাহকসেবা অক্ষত রেখে তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো দ্রুত নিরাপদ করা, আন্তর্জাতিক সতর্কতা নিয়মিত অনুসরণ করা এবং সম্ভাব্য অনুপ্রবেশের লক্ষণ শনাক্তে সার্বক্ষণিক নজরদারি জোরদার করাই এখন ব্যাংকগুলোর প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। পাশাপাশি তৃতীয় পক্ষের প্রযুক্তি সেবা, ওয়েব সার্ভার ও এপিআই সংযোগগুলোর নিরাপত্তাও নিয়মিত যাচাই করতে হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান আলম বলেন, ‘আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় উচ্চ মাত্রার ঝুঁকি রয়েছে। তবে ঝুঁকি থাকা, হামলার চেষ্টা হওয়া এবং নিশ্চিতভাবে তথ্য ফাঁস হওয়া—এ তিনটি বিষয় এক নয়। সব ব্যাংকও সমান ঝুঁকিতে নেই। কোনো ওয়েবসাইট পিএইচপিতে তৈরি হলেই সেটি আক্রান্ত হবে, এমনও নয়। ঝুঁকির মাত্রা নির্ভর করে ব্যবহৃত পিএইচপির সংস্করণ, দুর্বলতা, সার্ভারের কনফিগারেশন, নিরাপত্তা হালনাগাদ এবং সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটের সঙ্গে অন্যান্য সিস্টেমের সংযোগের ওপর। যেসব আর্থিক বা সরকারি প্রতিষ্ঠান এখনো পিএইচপির পুরনো সংস্করণ ব্যবহার করছে এবং নতুন নিরাপত্তা হালনাগাদ দ্রুত প্রয়োগ করতে পারছে না, তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।’

তিনি আরো বলেন, ‘ব্যাংকগুলোর মূল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, সুইফট এবং লেনদেনের প্রধান অবকাঠামো পিএইচপির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল নয়। এগুলো আলাদা ও নিয়ন্ত্রিত নেটওয়ার্কে পরিচালিত হয়। এ কারণেই সাধারণ গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট লেনদেন, ইন্টারনেট ও অ্যাপ ব্যাংকিং এবং মোবাইল আর্থিক সেবা এখনো সচল।’

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে সফটওয়্যারের দুর্বলতা শনাক্ত ও তা হামলার উপযোগী করে তোলার সময় দ্রুত কমে আসছে। আগে কোনো দুর্বলতা কাজে লাগানোর উপযোগী করতে দক্ষ হামলাকারীর সপ্তাহ বা মাস লেগে যেত, এখন এআইয়ের সহায়তায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা সম্ভব হচ্ছে। গত এক বছরে শনাক্ত সফটওয়্যার দুর্বলতার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ক্লাউডফ্লেয়ার জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ আরো কয়েকটি সফটওয়্যারে গুরুতর দুর্বলতা পাওয়া গেছে এবং সেগুলোর নিরাপত্তা হালনাগাদ তৈরির কাজ চলছে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এ ধরনের ঝুঁকি একেবারে নতুন নয়। পিএইচপি ব্যবহারের শুরু থেকেই বিভিন্ন ধরনের দুর্বলতা ছিল। সময়ের সঙ্গে সেগুলো শনাক্ত করে বন্ধ বা হালনাগাদ করা হয়েছে। বর্তমান সমস্যাটি মূলত পুরনো একটি ঝুঁকির নতুনভাবে উন্মোচিত রূপ। যেসব প্রতিষ্ঠান আগে থেকেই যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে, তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক কম। তবে শুধু পিএইচপির ওপর নির্ভর না করে অতিরিক্ত নিরাপত্তা স্তর বা অন্য অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে সুরক্ষা বাড়ানো ভালো।’

তার মতে, শুধু নতুন প্যাচের জন্য অপেক্ষা করা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের প্রযুক্তি অবকাঠামো, প্রবেশাধিকার, তৃতীয় পক্ষের নির্ভরতা এবং সার্ভারের নিরাপত্তা কাঠামো বুঝে নিয়মিতভাবে দুর্বলতা যাচাই ও সুরক্ষা ব্যবস্থা হালনাগাদ করতে হবে।

পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটি ঘিরে আর্থিক খাতে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপগুলোর একটি এসেছে জাপান থেকে। দেশটির বৃহৎ ব্যাংক মিতসুবিশি ইউএফজে ব্যাংক অনলাইন ব্যাংকিংয়ের কিছু লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে। মিজুহো ব্যাংক ও দাইওয়া সিকিউরিটিজ জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ করছে। আওমোরি মিচিনোকু ব্যাংক গ্রাহকদের অ্যাপে ব্যালান্স দেখাসহ কিছু সেবা বন্ধ রেখেছে। শিজুওকা ব্যাংক অনলাইন ব্যাংকিং অ্যাপ সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে। ইয়ামানাশি চুও ব্যাংক ও সান-ইন গদো ব্যাংকও কিছু সেবা স্থগিত করেছে। তবে আন্তঃব্যাংক অর্থ নিষ্পত্তি ব্যবস্থায় কোনো প্রভাব পড়েনি।

নেপালের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পেমেন্ট ব্যবস্থা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী এবং রেমিট্যান্স কোম্পানিগুলোকে সাইবার সুরক্ষা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। প্রয়োজন হলে ঝুঁকিপূর্ণ ওয়েবসাইট সাময়িক বন্ধ রেখে নিরাপত্তা হালনাগাদ করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। দেশটির বেশকিছু ব্যাংক ও সরকারি সংস্থা ওয়েবসাইট বন্ধ রেখেছে। তবে মোবাইল ব্যাংকিং ও কিউআর পেমেন্ট সচল রয়েছে।

ইউরোপেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ইউরোপীয় ব্যাংকিং কর্তৃপক্ষ নিজেদের ওয়েবসাইট বন্ধ করে নিরাপত্তা হালনাগাদ করে। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পন্ন হওয়ার পর ওয়েবসাইটটি আবার চালু করা হয়। ইউরোপে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পিএইচপিভিত্তিক ঝুঁকিপূর্ণ সিস্টেম দ্রুত শনাক্ত করে নিরাপত্তা হালনাগাদ করতে বলা হয়েছে। যেসব সিস্টেম তাৎক্ষণিকভাবে হালনাগাদ করা সম্ভব নয়, সেগুলো ইন্টারনেট থেকে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন রাখা, নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোকে ব্যবহৃত পিএইচপির ঝুঁকিপূর্ণ সংস্করণ দ্রুত শনাক্ত করে নিরাপদ সংস্করণে হালনাগাদের নির্দেশ দিয়েছে চীনও। ইন্টারনেটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত সার্ভার ও ওয়েবসেবায় নজরদারি বাড়ানো, সন্দেহজনক লগইন ও অস্বাভাবিক বহির্মুখী সংযোগ পরীক্ষা এবং কোনো অনুপ্রবেশের ইঙ্গিত মিললে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট, পাসওয়ার্ড ও সিকিউরিটি কি পরিবর্তনের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

পিএইচপি ত্রুটির পর দক্ষিণ কোরিয়ায় বেসরকারি খাতে সাইবার সতর্কতার মাত্রা বাড়িয়ে জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ পিএইচপি ব্যবস্থা দ্রুত শনাক্ত ও হালনাগাদ করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি সার্ভার, ওয়েবসেবা ও নেটওয়ার্কে অস্বাভাবিক কার্যক্রম শনাক্তে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

ভারতে পিএইচপি ত্রুটি সামনে আসার পর ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অ্যাপ, ওয়েবসাইট ও অন্যান্য ওয়েবভিত্তিক সেবার নিরাপত্তা যাচাই জোরদার করেছে। যেসব সেবায় ঝুঁকি পাওয়া যাচ্ছে বা তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপত্তা হালনাগাদ সম্ভব হচ্ছে না, সেগুলো সীমিত রাখার পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থায় সেবা সচল রাখার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এর মধ্যেই দেশটির বৃহত্তম ব্যাংক স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার গ্রাহকসংক্রান্ত তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। ফাঁস হওয়া তথ্যের মধ্যে ৩ হাজার ৮৯৭ গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে এবং ঘটনার উৎস ও পরিধি জানতে তদন্ত শুরু হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বড় কয়েকটি ব্যাংক অননুমোদিত তৃতীয় পক্ষের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক এজেন্টকে গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে প্রবেশ থেকে বাধা দিচ্ছে। গ্রাহক নিজের লগইন তথ্য এ ধরনের এজেন্টকে দিলে সেটি ব্যবহারকারীর নির্দেশনার বাইরে কোনো আর্থিক কার্যক্রম চালাতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে এ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ব্যাংক ও আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান মরগান স্ট্যানলি তৃতীয় পক্ষের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক এজেন্টের গ্রাহক অ্যাকাউন্টে প্রবেশ বন্ধ করেছে। দেশটির বৃহৎ ব্যাংক জেপি মরগান চেজও এ ধরনের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করছে। আর্থিক সেবা ও ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান চার্লস শোয়াবও অননুমোদিত এজেন্টের প্রবেশ ঠেকাতে পদক্ষেপ নিয়েছে।

ব্যাংক খাতের সাইবার ঝুঁকি শুধু পিএইচপির দুর্বলতায় সীমাবদ্ধ নয়; তৃতীয় পক্ষের প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটমুখী সেবাও নতুন ঝুঁকির উৎস হয়ে উঠছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট, গ্রাহকসেবা পোর্টাল, অনলাইন আবেদন ব্যবস্থা বা অন্যান্য ওয়েবভিত্তিক সেবায় ঝুঁকিপূর্ণ পিএইচপি সংস্করণ ব্যবহার হচ্ছে কিনা। সব পিএইচপিভিত্তিক ওয়েবসাইট ঝুঁকিতে নয়; ঝুঁকি নির্ভর করছে কোন সংস্করণ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং সার্ভারের নিরাপত্তা বিন্যাস কেমন তার ওপর। তবে ইন্টারনেটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কোনো ঝুঁকিপূর্ণ সার্ভার হালনাগাদ না থাকলে হামলাকারীর জন্য সেটি প্রবেশপথ হয়ে উঠতে পারে।

সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক সংগঠন সাইবার ৭১-এর পরিচালক আব্দুল্লাহ আল জাবের বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে হঠাৎ সাইবার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে সতর্ক হয়েছে। তবে শুধু ঝুঁকি দেখা দেয়ার পর ব্যবস্থা নিলে হবে না। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ছয় মাস বা অন্তত বছরে একবার নিয়মিত পেনিট্রেশন টেস্টের মাধ্যমে নিজেদের সিস্টেমের দুর্বলতা শনাক্ত করে তা সমাধান করা উচিত। দেশে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এ ধরনের পরীক্ষা করে না; সাধারণত কোনো ঝুঁকি বা বিপদের পরই তৎপরতা দেখা যায়। নিয়মিত পেনিট্রেশন টেস্ট চালু থাকলে পরিবর্তিত সাইবার ঝুঁকির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করা সম্ভব।’

পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটি ঘিরে বিভিন্ন দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিলেও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের সাইবার হামলা, তথ্য চুরি বা আর্থিক ক্ষতির নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। মূলত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে ওয়েবসাইট বন্ধ, সিস্টেম বিচ্ছিন্ন, নিরাপত্তা হালনাগাদ ও নজরদারি জোরদারের মতো প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে ব্যাংকের নিজস্ব মূল ব্যবস্থা নিরাপদ থাকলেও তৃতীয় পক্ষের প্রযুক্তি অবকাঠামো থেকে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে হোস্টিং সেবা, পেমেন্ট গেটওয়ে, এপিআই সংযোগ ও বাইরের প্রযুক্তি সেবাদাতার কোনো দুর্বলতা থাকলে তা ব্যাংকের ওয়েবসেবা বা গ্রাহকসেবার জন্য প্রবেশপথ হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে ব্যাংকের নিজস্ব সিস্টেমের পাশাপাশি তৃতীয় পক্ষের প্রযুক্তি সেবা ও সংযোগগুলোর নিরাপত্তা নিয়মিত অডিট করা জরুরি।

বেসরকারি সাইবার নিরাপত্তা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এরিনা ওয়েব সিকিউরিটির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক তানজিম আল ফাহিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ফিনটেক কোম্পানিগুলোর জরুরি নিরাপত্তা অডিট করা উচিত। বিশেষ করে যেসব সার্ভার পাবলিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত, যেসব ব্যবস্থায় এপিআই সংযোগ রয়েছে বা পিএইচপি ব্যবহার হচ্ছে সেগুলো দ্রুত পরীক্ষা করে দুর্বল সংস্করণ শনাক্ত ও হালনাগাদ করতে হবে।’

ভবিষ্যতে এ ধরনের ঝুঁকি আরো বাড়বে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে প্রতিটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জরুরি সাইবার প্রতিক্রিয়া ইউনিট থাকা প্রয়োজন। আগাম প্রস্তুতি থাকলে বড় ক্ষতি হওয়ার আগেই অনেক হুমকি মোকাবেলা করা সম্ভব।’

আরও