বিআরটিএর তথ্য বিশ্লেষণ

এক বছরের ব্যবধানে ঈদুল আজহায় সড়কে মৃত্যু বেড়েছে ৩০%

দেশে গত বছরের ঈদুল আজহার আগে-পরে ১১ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় ১৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল। আর এবারের ঈদুল আজহার একই সময়ে প্রাণ হারিয়েছেন ২১৯ জন।

এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে দীর্ঘ এ ছুটিতে সড়ক দুর্ঘটনা প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে এ পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর হিসাবে চলতি বছরের ঈদুল আজহায় হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সাধারণত ঈদুল ফিতরের তুলনায় ঈদুল আজহায় সড়ক দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। এ সময় মহাসড়কে যাত্রীবাহী যানবাহনের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক পশুবাহী ট্রাক ও পণ্যবাহী যান চলাচল করাকে অধিক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করেন বিশেষজ্ঞরা। সেই সঙ্গে সড়কের পাশে পশুর হাটকে ঘিরে সৃষ্ট যানজটও ঈদুল আজহায় দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খলা বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া ঈদের সময় চালকদের অতিরিক্ত কর্মঘণ্টাজনিত ক্লান্তি এবং ফিটনেসবিহীন বা অনুপযুক্ত যানবাহনের ব্যবহারের কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বেশি হয়। সদ্যসমাপ্ত ঈদুল আজহায় দুর্ঘটনা বেশি হওয়ার জন্য বর্ষাকেও দায়ী করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

২০২৫ সালে ঈদুল আজহা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ৭ জুন। বিআরটিএর প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, গত বছর ৪ থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে ১৫০টি। এসব দুর্ঘটনায় ১৬৯ জন নিহতের পাশাপাশি আহত হন আরো ২৯৮ জন।

অন্যদিকে গত ২৩ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত বিআরটিএর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ সময় সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৮৬টি। ২১৯ জন নিহতের পাশাপাশি আহত হয়েছেন আরো ৩৭৭ জন। এক বছরের ব্যবধানে ঈদুল আজহায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ছাড়াও দুর্ঘটনার পরিমাণ ও আহতের সংখ্যাও বেড়েছে।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, এবারের ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানী ঢাকা থেকে এক কোটির বেশি মানুষ নিজ নিজ গন্তব্যে যাত্রা করেছেন। একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরে প্রায় চার কোটি মানুষের যাতায়াত হয়েছে। এ সময় (২১ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত) দেশে ২৯২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৮১ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে ১৫ জন প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষ নিহত হন। এছাড়া এক্সপ্রেসওয়ে ও বিভিন্ন মহাসড়কে বিকল হয়ে থেমে থাকা যানবাহনের পেছনে অন্য যানবাহনের ধাক্কায় অন্তত ১৩টি দুর্ঘটনা ঘটে, যাতে উল্লেখযোগ্য প্রাণহানি হয়।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের গত বৃহস্পতিবারের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঈদ উদযাপনকালে মাত্র চার-পাঁচদিনে বিপুলসংখ্যক মানুষকে পরিবহন করার মতো মানসম্পন্ন নিরাপদ গণপরিবহন আমাদের নেই। ফলে মানুষ অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনে যাত্রা করে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হন। আসলে একটি সুস্থ-স্বাভাবিক ও নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে হলে কমপক্ষে তিন বছর মেয়াদি টেকসই ও সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা নেয়া প্রয়োজন।

ঈদের সময় দুর্ঘটনা, বিশৃঙ্খলা ও জনদুর্ভোগ এড়াতে একই ধরনের পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. হাদিউজ্জামান। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌ঈদের সময়টা একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়। তাই স্বাভাবিক সময়ে যেখানে আমরা সড়ক ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় চর্চা ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারছি না, সেখানে অস্বাভাবিক এ সময়ে রাতারাতি সবকিছু বিজ্ঞানসম্মত ও সুশৃঙ্খল হয়ে যাবে এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। শুধু সরকারের হুঁশিয়ারি বা নির্দেশনায়ও পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন সম্ভব নয়।’

তিনি বলেন, ‘‌সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এটি ২৪ ঘণ্টা, বছরের ৩৬৫ দিন ধরে নিয়মিত চর্চা করতে হবে। স্বাভাবিক সময়েই যদি ফিটনেসবিহীন, রুট পারমিটবিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন সড়ক থেকে সরিয়ে রাখা যায় এবং আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে ঈদের মতো বিশেষ সময়ে এত বেশি চাপ সামলাতে হবে না।’

আরও