জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে থানার স্বাভাবিক কার্যক্রম ও পুলিশি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার সুযোগ নেয় দুর্বৃত্তরা। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে উৎকণ্ঠা দেখা দেয়। কিন্তু সরকারের এক বছর পূরণ হলেও অপরাধের যে চিত্র, তা উদ্বেগজনক বলছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে এ সময়ে মব সহিংসতা, হত্যা, ছিনতাই, অপহরণ ও লুটপাটের ঘটনাগুলো অপরাধ সূচককে এগিয়ে নিচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার মব সামাল দিতে ব্যর্থ বলে অভিযোগ উঠেছে অনেক পক্ষ থেকে। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ সব রাজনৈতিক দলই বিভিন্ন ঘটনার পর মবের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান জানিয়েছে। তবে এতকিছুর পরও গণপিটুনির নামে বিচার-বহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন ও হামলার ঘটনা থামছে না। দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আসন্ন নির্বাচনে তার প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
দেশে চলমান অপরাধের তথ্য বিশ্লেষণ করে থাকে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন। তাদের হিসাবে গত জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ১৪১টি মব সহিংসতার ঘটনায় ২৮৯ জন আহত হয়েছেন। এ সময় নিহত হয়েছেন ৫২ জন। এ পাঁচ মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মব হামলার ঘটনা ঘটেছে মার্চে। মৃত্যুও এ মাসে বেশি ছিল। মার্চে ৩৯টি ঘটনায় ‘উচ্ছৃঙ্খল জনতা’র হাতে ১৩ জন নিহত ও ৯৬ জন আহত হন। মাস অনুযায়ী বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারিতে ২১টি মবের ঘটনায় ১২ জন নিহত ও ৩৮ জন আহত হয়েছেন। ফেব্রুয়ারিতে নিহত ৮ ও আহত ৩৪ জন। এপ্রিলে ২৭টি মবের ঘটনায় ১০ জন নিহত ও আহত ৫৩। আর মে মাসে মবের বিশৃঙ্খলার ঘটনা ৩৬টি এবং নিহত ৯, আহত ৬৮ জন।
অবশ্য পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে সারা দেশে মব সন্ত্রাসের সংখ্যা ১২০-১৩০-এর মধ্যে, এর বেশি নয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, মব সহিংসতার ঘটনা কম-বেশি যেটাই হোক এটা কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়। এ ধরনের অপরাধ মানুষকে সংক্রমিত করে তোলে। একটি ঘটনা থেকে আরো অনেক ঘটনার সূত্রপাত হয়। অপরাধের কারণ মাথায় রেখে প্রতিকারের উপায় খুঁজতে হবে। বিশেষ করে আইনি কাঠামোর বাইরে প্রভাব বিস্তার করে বা হুমকি-ধমকি দিয়ে যেন কোনো তদন্ত বা মামলা নিষ্পত্তি করা না হয়, সেদিকে নজর রাখা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা তৈরি করতে হবে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের এগিয়ে আসতে হবে। সবার সমন্বয়ে এ ধরনের মব সহিংসতাসহ সার্বিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
শুধু মব সহিংসতাই নয়, অপরাধ সূচককে ঊর্ধ্বমুখী করে তুলেছে খুন, ছিনতাই, অপহরণ, লুটপাটের মতো ঘটনাও। সারা দেশের সব ধরনের অপরাধের তথ্য নথিভুক্ত করে পুলিশ সদর দপ্তর। তাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সারা দেশে ১ হাজার ৯৩০ জন খুন হয়েছেন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে খুন হন ২৯৪ জন। ফেব্রুয়ারিতে খুনের সংখ্যা বেড়ে হয় ৩০০। পরের মাসে খুনের সংখ্যা আরো বেড়ে যায়। মার্চে সারা দেশে ৩১৬ জন খুন হয়েছেন। এপ্রিলে ৩৩৬ জন, মে মাসে ৩৪১ জন খুন হন। জুনে চলতি বছরের সর্বোচ্চ খুনের ঘটনা ঘটেছে। এ মাসে সারা দেশে মোট ৩৪৩ জন খুন হয়েছেন। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, এ বছরে প্রতি মাসেই খুনের ঘটনা বাড়ছে। বেশি খুন হচ্ছে ঢাকা মেট্রোপলিটন, ঢাকা রেঞ্জ ও চট্টগ্রাম রেঞ্জে। অনেক খুনের পেছনে চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের মতো ঘটনা কাজ করেছে বলে জানা যাচ্ছে, যার সর্বশেষ উদাহরণ পুরান ঢাকায় ভাঙারি ব্যবসায়ী সোহাগ হত্যাকাণ্ড। বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন এ খুনের ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে মিছিল-সমাবেশ করেছে।
খুনের পাশাপাশি সারা দেশে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ডাকাতি, ছিনতাই, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং অপহরণের মতো অপরাধও সংঘটিত হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সারা দেশে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে ৩৬৬টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৭৪টি ডাকাতি হয়েছে ফেব্রুয়ারিতে। এছাড়া এ ছয় মাসে ১১ হাজার ৮টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে।
মানবাধিকারকর্মী এবং পুলিশ সংস্কার কমিশনের সদস্য এএসএম নাসির উদ্দিন এলান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মব সহিংসতা থেকে শুরু করে বর্তমানে নানা ধরনের চলমান অপরাধ দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে চরম অবনতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এখান থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন। প্রধান উপদেষ্টা সম্প্রতি যে জুলাই সনদ ঘোষণা করেছেন তার মধ্য দিয়ে একটা জাতীয় ঐক্য তৈরি হয়েছে বলে মনে করি। দেশের নির্বাচনের আগে ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এখানে জাতীয় ঐক্য দরকার। আশাবাদী যে সব দলের অংশগ্রহণে একটি ইনক্লুসিভ নির্বাচন হবে। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।’
এদিকে পতিত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের মতো অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও দেশে নির্বিচারে গ্রেফতার, হেফাজতে মৃত্যু ও বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে বলে মনে করে বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। সংস্থাটি মনে করে, গত বছর দেশ একটি যুগান্তকারী গণজাগরণের সাক্ষী হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকার মানুষের প্রত্যাশা পূরণে হতাশ করেছে। এখনো নির্বিচারে গ্রেফতার চলছে; হেফাজতে মৃত্যু ও বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটছে, যা আগের সরকারের দমনমূলক আচরণের পুনরাবৃত্তির মতোই মনে হচ্ছে। এছাড়া আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমাবনতির কারণে নাগরিকের নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠা রয়ে গেছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন নাজুক অবস্থা নিয়ন্ত্রণে না এলে আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘৫ আগস্টের পর আইন-শৃঙ্খলার উন্নতির যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা পর্যাপ্ত নয়। গত বছরের ৫ আগস্টের আগে-পরে যেসব পুলিশ হত্যার শিকার হয়েছেন সেটার বিচারিক প্রক্রিয়াও দেখা যাচ্ছে না। এতে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন অপরাধে জড়িয়েছেন শীর্ষ কর্মকর্তারা কিন্তু জনরোষের শিকার হচ্ছেন মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্যতম শর্ত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা। সেটা করতে না পারলে কিন্তু নির্বাচনের শিষ্টাচার নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে জোরালোভাবে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।’
যেকোনো দেশেই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যে ঘাটতি তৈরি হয় সেটা মোকাবেলা করতে কঠোরভাবে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা ও জবাবদিহি জরুরি মন্তব্য করে তিনি আরো বলেন, ‘আইন প্রয়োগে ঘাটতি থাকলে জবাবদিহি ও দায়িত্বশীলতা তৈরি হয় না। এর ফলেই কিন্তু মব সহিংসতা বা পুলিশ নিজেরা আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে সংকটের মধ্যে পড়ছেন। পুলিশের মনোবল বৃদ্ধির বিষয়গুলো নিয়ে খুব একটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখছি না। যারা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী তাদের কথা না শুনলে পুলিশের ওপর বা ওই থানার ওপর হামলা করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে পুলিশ নিজেই সংকটে পড়ে যাচ্ছে। মবের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিবৃতি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু তারপরও এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আসছে না। এখানে বিবৃতি দিয়ে কিছু হবে না, ব্যবস্থা নিতে হবে। বিবৃতি নাগরিক সমাজ দিতে পারে, কিন্তু সরকারের কাছ থেকে জনসাধারণ বিবৃতি আশা করে না।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আরো বেশকিছু কারণে মব সহিংসতা বাড়ছে। দীর্ঘদিনের অগণতান্ত্রিক পরিবেশ, দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, প্রশাসনে অস্থিতিশীলতা ও ভীতি, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করা এবং সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার বা গুজবের কারণে এ-জাতীয় সহিংসতা বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমন অপরাধে জড়িতদের কঠোর আইনগত ব্যবস্থার মুখোমুখি করতে হবে। মবের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স দরকার। নইলে মব ভায়োলেন্স কমবে না।
সার্বিক বিষয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বাহারুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পুলিশ ফোর্সের মোরাল বুস্টআপ আমরা এখনো করতে পারিনি। যার ফলে অনেক অপরাধই চোখের সামনে সংঘটিত হলেও কার্যকর ভূমিকা নিতে দেখা যাচ্ছে না। যেমন ধরেন ৫০-৬০টা ছেলে শাহবাগে বসে যানচলাচল বন্ধ করে দিল। আমরা কিন্তু তাদের সরাতে পারলাম না। চেয়ে চেয়ে দেখতে হলো। তখন জনগণের কাছে বার্তা গেল যে পুলিশ কার্যকর নেই। আবার পুলিশের দিকটাও বিবেচনা করতে হবে। জুলাই অভ্যুত্থানে ৪৪ জন পুলিশ মারা গেলেন। এ বিষয়ে তদন্ত বা বিচারের উদ্যোগ নেয়া হলো না। বাহিনীর সদস্যরা এখান থেকে কী শিক্ষা নেবেন? তাদের কিছু হলেও বিচার হবে না এমনই তো। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর একটাই পথ। সেটা হচ্ছে আগামীতে যারা সড়ক আটকে আন্দোলন করবে, তাদের মুহূর্তের মধ্যে সরিয়ে দেয়া। এ ধরনের ভূমিকা পুলিশ যতদিন না রাখতে পারবে, ততদিন অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না। অপরাধীরাও সতর্ক হবে না।’
পুলিশের নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক ও অঞ্চলভিত্তিক বিবেচনা থেকে সরে আসতে হবে বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মী ও গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে পতিত ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য পুলিশকে সাধারণ মানুষের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। এর ফলে জনগণের মধ্যে পুলিশের প্রতি ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে জনরোষের মাধ্যমে। তবে আমি মনে করি অবশ্যই প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের একটি সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচার পাওয়া তাদের পরিবারের অধিকার। এ অধিকার নিশ্চিত করা না গেলে পুলিশ ফোর্সকে মোরালি বুস্টআপ করা সম্ভব হবে না। এজন্য আমি মনে করি পুলিশকে কার্যকর করতে গেলে সবার আগে হত্যার বিচার করতে হবে। বাহিনীর যেসব সদস্যের অপরাধসংশ্লিষ্টতা রয়েছে, তাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি পতিত ফ্যাসিস্ট সরকার যেভাবে নিয়ম না মেনে পুলিশের রিক্রুটমেন্ট এবং পদোন্নতি দিয়েছে, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে সৎ ও সাহসীদের মূল্যায়ন করতে হবে।’