গড়ে প্রতিটি বিদ্যালয়ের সংস্কারের জন্য ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দেয়া হয়। তবে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মেরামত ও সংস্কার খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ নিয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়গুলো সংস্কার ও মেরামতের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেয়া হলেও বাস্তবে অধিকাংশ বিদ্যালয়ে নামমাত্র এবং কোনো কোনো বিদ্যালয়ে কোনো কাজই হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ধাপে সারা দেশের ১২ হাজার ৫৩১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য ৪১ কোটি ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। দ্বিতীয় ধাপে একই বিদ্যালয়গুলোয় বরাদ্দ বাড়িয়ে ৮২ কোটি ২৩ লাখ ৫২ হাজার ৬৪২ টাকা দেয়া হয়। এর অংশ হিসেবে লক্ষ্মীপুরের ৩১১টি বিদ্যালয় মেরামতের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়।
বরাদ্দের শর্ত অনুযায়ী, বিদ্যালয় ভবনের ক্ষতিগ্রস্ত কক্ষ, দরজা-জানালা, বেঞ্চ-ডেস্ক, স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ ও পানির লাইনের জরুরি সংস্কার করার কথা থাকলেও অনুসন্ধানে এর বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক বিদ্যালয়ে সংস্কার প্রয়োজন না হলেও ভুয়া বিল-ভাউচার করে শিক্ষা কর্মকর্তার অনুমোদন নেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিভিন্ন বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের কেনাকাটার মধ্যে এলইডি বাল্ব, সিটকিনি, হ্যাজবোল্ট, হারপিক, বালতি, ইলেক্ট্রনিক ফিটিংস, বৈদ্যুতিক তার, ইট, বালি, সিমেন্ট ও মাটিসহ বিভিন্ন জিনিস ক্রয়, দরজা-জানালা মেরামত, টয়লেট পরিষ্কারের কথা উল্লেখ করেছে। তবে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে কয়েকজন শিক্ষক জানিয়েছেন, গত স্লিপ ফান্ড থেকে তারা এগুলো ক্রয় করেছিলেন।
কেনাকাটার বিল-ভাউচার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২৫০ টাকার এনার্জি বাল্ব হাজার টাকা দেখিয়ে বিল করা হয়েছে। নলকূপ ও বৈদ্যুতিক মোটর মেরামতে ৮-১০ হাজার ব্যয় দেখানো হয়েছে। কয়েকটি বিদ্যালয়ে অর্ধশত জানালা মেরামতের কথা শোনা গেলেও সরজমিনে গিয়ে সংস্কারকাজের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
রায়পুর উপজেলার সাতটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ১ থেকে দেড় লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। সেই টাকায় টয়লেট পরিষ্কার, বৈদ্যুতিক মোটর মেরামত, আলমারির লক, সিটকিনি, হ্যাজবোল্ট, তালা ও আলমারির লক স্থাপনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু টয়লেট পরিষ্কারের বিষয়টি দৃশ্যমান থাকলেও মোটর মেরামতের যেসব জিনিস ক্রয় করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তা বাস্তবে দেখাতে পারেনি প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ।
রায়পুরের কাজিরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘আমরা দেড় লাখ টাকা দিয়ে টয়লেট পরিষ্কার ও রঙ করিয়েছি। সিটকিনি, হ্যাজবোল্টসহ অন্যান্য জিনিসও ক্রয় করেছি।’
রায়পুরের কেরোয়া রোকেয়া মেমোরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জোবেদা নাহার বলেন, ‘বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে শুধু টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে।
গাইয়ার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনোজ কুমার বলেন, ‘ভোট কেন্দ্রে চারটি বুথ করা হয়। ১ লাখ টাকার মধ্যে আমাদের ২০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে।’
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে একাধিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলেন, সংস্কারের নামে যেসব মালপত্র ক্রয় দেখানো হয়েছে, তার বেশির ভাগই কাগজে-কলমে। বেশির ভাগ কাজ বাস্তবে হয়নি, হবেও না। তারা অভিযোগ করেন, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বরাদ্দকৃত অর্থের অর্ধেক টাকা তার জন্য রেখে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। না দিলে বিল অনুমোদন আটকে দেয়ার হুমকিও দিয়েছেন।
এ বিষয়ে রায়পুর, রামগঞ্জ ও সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা জানান, সংসদ নির্বাচনের আগে স্কুলের সংস্কারকাজ করা হয়েছে। তবে কী কী কাজ করা হয়েছে তা তারা দেখাতে পারেননি। কমলনগর ও রামগতি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা একই কথা বলেন।
তবে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাজ্জাদ বলেন, ‘বরাদ্দগুলো উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের নামে ভিন্ন ভিন্ন খাতে এসেছে। খাত অনুযায়ী এ অর্থ ব্যয় করবে প্রতিষ্ঠানগুলো। ভোট কেন্দ্র মেরামতের জন্য যে বরাদ্দ এসেছে, তা নির্বাচনের আগেই ব্যয় করার কথা। কেন্দ্রগুলোয় সিসি ক্যামেরা লাগিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা। অনিয়মের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’