আর ইউনেস্কোর প্রতিবেদন বলছে, এ দেশগুলোর ওপর ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা দেশগুলোর শিক্ষা ব্যবস্থার সংকটকে আরো ঘনীভূত করতে পারে।
সম্প্রতি প্রকাশিত ইউনেস্কোর ‘ব্রেকিং দ্য ডেট ট্র্যাপ: পলিসি পেপার অন রিস্টোরিং ফিসক্যাল স্পেস টু সেভ এডুকেশন’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ঋণ পরিশোধ এখন সরকারি ব্যয়ের একটি বড় অংশ গ্রাস করছে। বিশেষত নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে শিক্ষাব্যয়ের ৩ দশমিক ৩ গুণ ব্যয় হচ্ছে ঋণ পরিশোধে। বর্তমানে গ্লোবাল সাউথের ১১৩টি দেশে ঋণ পরিশোধের ব্যয় শিক্ষার পেছনে মোট সরকারি বরাদ্দকে ছাড়িয়ে গেছে। এসব দেশে বিশ্বের প্রায় ৬১০ কোটি মানুষ বসবাস করে। ফলে বিশ্বের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী এখন মানসম্মত শিক্ষা পাওয়ার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ এসব দেশের সরকারগুলো সামাজিক উন্নয়নে বিনিয়োগের চেয়ে ঋণের কিস্তি শোধ করাকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য হচ্ছে।
২০১৫ সালে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ। আর এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের মাধ্যমে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উন্নীত হওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন তিন বছর পিছিয়ে দেয়ার আবেদন করা হয়েছে। বাংলাদেশের চলতি অর্থবছরের শিক্ষার বাজেট এবং সম্ভাব্য ঋণ পরিশোধের অর্থের পরিমাণের তুলনা করে দেখা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষায় যে পরিমাণ বরাদ্দ রাখা হয়েছে তার তিন গুণের বেশি অর্থ ব্যয় হবে ঋণ পরিশোধে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। অপরদিকে সরকারি তথ্য ও প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে নতুন করে কোনো ঋণ না নিলেও কেবল আগের নেয়া ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ বাবদ প্রায় ৪ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে সরকারকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘সরকার যখন একটি বড় অংকের অর্থ ঋণ পরিশোধে ব্যয় করে তখন স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য খাতে প্রভাব পড়ে। দক্ষিণ
এশিয়ার দেশগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রভাব বেশি পড়ে। কিন্তু বিষয়টা এমন নয় যে এ প্রভাবটা শিক্ষা খাতেই ফেলতে হবে। সরকার চাইলে শিক্ষার বাজেট ঠিক রেখে অন্যান্য ব্যয় কমিয়েও এটা সমন্বয় করতে পারে। কারণ শিক্ষা খাতের ব্যয়টি হলো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। এর মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে রাষ্ট্র তার অর্থনৈতিক অবস্থানের সহজে উন্নয়ন ঘটাতে পারে।’ বর্তমানে সরকার শিক্ষাকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবেই বিবেচনা করছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘সরকার যদি রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে ভবিষ্যতেও এ অগ্রাধিকার অব্যাহত রাখতে হবে। ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে যদি কোনো খাতে ব্যয় কমাতেই হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে শিক্ষা খাতকে এ ধরনের বিবেচনার বাইরে রাখতে হবে।’
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের পর থেকে গড়ে ঋণ পরিশোধের জন্য অতিরিক্ত ১ ডলার বরাদ্দের বিপরীতে প্রকৃত শিক্ষা ব্যয় দশমিক ২৮ ডলার করে হ্রাস পেয়েছে। এ নেতিবাচক প্রভাবের কারণে ২০১৫ সালের পর থেকে বিশ্বের অধিকাংশ দেশই তাদের শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়াতে ব্যর্থ হয়েছে। ইউনেস্কোর প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বের ১৩৭টি দেশ আন্তর্জাতিকভাবে সম্মত শিক্ষা অর্থায়নের ন্যূনতম মানদণ্ড অর্জন করতে পারছে না। ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি-৪ অর্জনের জন্য নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো বর্তমানে বার্ষিক ৯৭ বিলিয়ন ডলারের স্থায়ী অর্থায়ন ঘাটতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
ইউনেস্কোর মতে, এ সংকটের পেছনে আরেকটি বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে অভ্যন্তরীণ ঋণ। ঐতিহাসিকভাবে কেবল বৈদেশিক ঋণ নিয়ে আলোচনা হলেও বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ঋণ শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য আরো বেশি ক্ষতিকর হয়ে উঠেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অভ্যন্তরীণ ঋণের মেয়াদ সাধারণত কম হয় এবং সুদের হার থাকে অত্যন্ত চড়া। বর্তমানে মোট ঋণ পরিশোধের প্রায় ৬২ শতাংশই হলো অভ্যন্তরীণ ঋণ এবং ১০১টি দেশ তাদের মোট ঋণ পরিশোধের অর্ধেকেরও বেশি অর্থ ব্যয় করছে দেশের ভেতরের বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ঋণদাতাদের পেছনে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতার সবচেয়ে বড় অংশটি যাবে অভ্যন্তরীণ খাতের ট্রেজারি বন্ড ও বিলের মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ পরিশোধে। এর পরিমাণ ১ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে একক অর্থবছরে সর্বোচ্চ। এ সময় প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র ম্যাচিউর বা মেয়াদোত্তীর্ণ হবে। এর বাইরে কেবল ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ আগামী অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণের কিস্তি (আসল) বাবদ পরিশোধ করতে হবে ৩৭৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে সামনের অর্থবছরে সরকারের ঋণ পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৪ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকায়।
এ বিষয়ে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের মোট রাজস্ব ব্যয়ের প্রায় ১৩ শতাংশই চলে যাচ্ছে ঋণের সুদে, যা অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি করছে। ভবিষ্যতে দেশী-বিদেশী ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের এ চাপ আরো বাড়বে। তবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে এর প্রভাব কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে সরকারের অগ্রাধিকারের ওপর। সরকার চাইলে অন্যান্য খাতের ব্যয় কমিয়েও এ ধরনের মৌলিক সেবা খাতের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ যথাক্রমে জিডিপির ১% ও ২% করার যে প্রয়াস, তা ইতিবাচক।’ ঋণের একটি অংশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন প্রকল্পেও ব্যবহৃত হয়, তাই ঋণকে কেবল ‘দায়’ হিসেবে না দেখে এর উন্নয়নমূলক ভূমিকাও বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করেন তিনি। অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা যেহেতু উন্নয়নশীল দেশ, আমাদের ঋণ নিতেই হবে। তবে গুরুত্ব দিতে হবে ঋণের বোঝা যেন ঝুঁকিপূর্ণ না হয়। আমরা যেন কম সুদে, সহজ শর্তে, দীর্ঘমেয়াদি শর্তে ঋণ নিতে এবং ঋণের অর্থ স্বচ্ছতার সঙ্গে যথাযথ ব্যবহার করতে পারি।’