পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, নাম পরিবর্তন, মূলধন জোগান দেয়া থেকে শুরু করে নজিরবিহীন সব নীতিসহায়তা দিয়ে ব্যাংকটিকে বাঁচিয়ে রাখার সব ধরনের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু কোনো উদ্যোগই সাফল্যের মুখ দেখেনি। বরং গত আট বছরে ৬ হাজার ৯৯ কোটি টাকা নিট লোকসান দিয়েছে। অথচ ব্যর্থ এ ব্যাংকটির সম্পদ ও দায়ের আকারও এত বড় নয়। আওয়ামী লীগের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের উদ্যোগে গড়ে ওঠা ব্যাংকটি এখন সরকার ও রাষ্ট্রের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দ্য ফারমার্স ব্যাংকের নাম পরিবর্তন করে ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি রাখা হয় ‘পদ্মা ব্যাংক’। অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, অনিয়ম-দুর্নীতিতে বিধ্বস্ত এ ব্যাংকটিকে বাঁচিয়ে রাখাটাই ছিল বড় ভুল। ওই সময় ব্যাংকটিকে অবসায়ন কিংবা একীভূত করে দিলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সরকারের এত বড় ক্ষতি হতো না। এখন বিলুপ্ত করতে গেলে পদ্মা ব্যাংকের বিপুল লোকসান ও মূলধন ঘাটতির বোঝা সরকারের ঘাড়ে পড়বে। আর জনগণের দেয়া করের অর্থেই সেটির জোগান দিতে হবে। তবে সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত এ ব্যাংকটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। অন্যথায় ক্ষতি ও দায়ের পরিমাণ আরো বাড়বে।
পদ্মা ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর শেষে তাদের আমানতের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকটির ঋণ স্থিতি ৫ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা ছিল। বিতরণকৃত এ ঋণের মধ্যে ৫ হাজার ২০০ কোটি টাকাই ওঠে খেলাপির খাতায়। সে হিসাবে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ৯৩ শতাংশ।
গত এক দশক ধরে ধারাবাহিক লোকসান গুনছে পদ্মা ব্যাংক। গত বছর শেষে পুঞ্জীভূত এ লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৯৯ কোটি টাকায়। একই সময়ে ব্যাংকটি ৪ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতিতেও ছিল।
আওয়ামী লীগ নেতা ও ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা পদ্মা ব্যাংককে টেনে তুলতে ২০১৯ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক এবং ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) থেকে ৭১৫ কোটি টাকার মূলধন জোগান দেয়া হয়েছিল। এর বাইরে ব্যাংকটিতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রধান চার ব্যাংকের মেয়াদি আমানত রয়েছে ৮৫০ কোটি টাকা। কলমানি হিসেবে বিনিয়োগ রয়েছে আরো ৫০ কোটি টাকা। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে করা বিপুল এ বিনিয়োগ থেকে গত সাত বছরে ১ টাকাও মুনাফা পায়নি ব্যাংকগুলো। এর পাশাপাশি পদ্মা ব্যাংকে আরো প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার আমানত জমা রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর। আমানতের এ টাকাও ফেরত দিতে পারছে না ব্যাংকটি।
ব্যাংকের লাইসেন্স পাওয়ার আগেই ২০১৩ সালে ফারমার্স ব্যাংকে কর্মী নিয়োগ শুরু করেছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর। ঘুসের বিনিময়ে সে সময় কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়েছিল বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে উঠে এসেছিল। সে কর্মীদের অনেকে এখনো পদ্মা ব্যাংকে কাজ করছে। ব্যাংকটির ৬০টি শাখা ও ১৪টি উপশাখায় কর্মরত রয়েছে প্রায় ১ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। অথচ এ কর্মীদের বেশির ভাগেরই তেমন কোনো কাজ নেই। ২০১৭ সাল থেকেই ব্যাংকটির ঋণ বিতরণ ও আমানত সংগ্রহ প্রায় বন্ধ। বছরের পর বছর ধরে কেবল বসিয়ে রেখেই অনেক কর্মীকে বেতন-ভাতা দিয়ে যাচ্ছে পদ্মা ব্যাংক। অফিস ভাড়া, কর্মীদের বেতন-ভাতা ও পরিচালন খাতেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের জোগান দেয়া আমানত ব্যয় করে ফেলা হয়েছে। তবে এখন আর কর্মীদের বেতন-ভাতাও পরিশোধ করতে পারছে না ব্যাংকটি। আবার অনেক শাখার ভবন ভাড়াও বকেয়া পড়েছে বলে জানা গেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পদ্মা ব্যাংকের কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া একেবারেই উচিত নয় বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘পদ্মা ব্যাংকসহ কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যাংকগুলোর বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য আমরা দুই-তিন বছর আগে থেকেই দাবি জানিয়ে আসছি। সরকারের জোগান দেয়া টাকায় কোনো ব্যাংক টিকিয়ে রাখার কোনো অর্থ হয় না। অর্থনীতি কিংবা আর্থিক খাতে বহু বছর ধরে পদ্মা ব্যাংকের কোনো ভূমিকা নেই। তাহলে কেন জনগণের অর্থে এ ব্যাংক বাঁচিয়ে রাখা হবে। সময় হয়েছে, পদ্মা ব্যাংকসহ অনিয়ম-দুর্নীতিতে নিমজ্জিত ব্যাংকগুলোর বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়ার।’
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদেও রয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পদ্মা ব্যাংকের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হলো না কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘পদ্মা ব্যাংকের মতো পরিস্থিতিতে থাকা সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বিষয়ে পর্ষদে আলোচনা হয়েছিল। তবে প্রাথমিকভাবে শরিয়াহ্ভিত্তিক পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করা হয়। এতগুলো ব্যাংকে একসঙ্গে হাত দেয়ার মতো অর্থ ও সামর্থ্য সরকারের নেই। আমি বলব, অতীতে হয়নি বলে বসে থাকলে হবে না। বরং নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব হবে, আর্থিক খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে দুর্বল ব্যাংকগুলোর বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়া।’
শুরুতে ফারমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন মহীউদ্দীন খান আলমগীর। ব্যাংকটির বাকি উদ্যোক্তা ও পরিচালকরাও ছিলেন আওয়ামী ঘনিষ্ঠ। ২০১৩ সালে কার্যক্রম শুরুর আগে থেকেই নানা বিতর্কে জড়ায় ব্যাংকটির নাম। পরবর্তী সময়ে গ্রাহকদের আমানতের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০১৭ সালে ব্যাংকটিতে হস্তক্ষেপ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। পুনর্গঠন করা হয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। ওই সময় মহীউদ্দীন খান আলমগীর ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের পদ ছাড়তে বাধ্য হন। একই সময় অপসারণ করা হয় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম প্রভাবশালী চৌধুরী নাফিজ সরাফাত ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। তবে কার্যক্রম শুরুর সময়েও তিনি ব্যাংকটির পরিচালক ছিলেন।
ব্যাংকটির নাম পরিবর্তন করে ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি পদ্মা ব্যাংকে রূপান্তর করা হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে পদ্মা ব্যাংকের ৬৮ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা নিয়েছিল রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক এবং আইসিবি। বিনিময়ে এসব প্রতিষ্ঠানকে জোগান দিতে হয়েছে ৭১৫ কোটি টাকার পুঁজি। তবে তা সত্ত্বেও ব্যাংকটি এক মুহূর্তের জন্যও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। সরকারি পুঁজি ছাড়াও ব্যাংকটিকে রক্ষায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বেশকিছু উদ্যোগ সামনে আনা হয়েছিল। এক্ষেত্রে বিদেশী বিনিয়োগের মাধ্যমে তারল্য সরবরাহ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকে প্রেফারেন্স শেয়ারে রূপান্তরের প্রস্তাব উঠলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকি আব্দুর রউফ তালুকদার গভর্নর থাকাকালীন ২০২৪ সালের মার্চে পদ্মা ব্যাংককে বেসরকারি খাতের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর এক্সিম ব্যাংকের পর্ষদ এ একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। পরবর্তী সময়ে এক্সিম ব্যাংকই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে একীভূত হয়।
পদ্মা ব্যাংককে বাঁচানোর কথা বলে গত বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আরো ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার তারল্য সহায়তা চাওয়া হয়। কিন্তু ব্যাংকটির পর্ষদের সে দাবির প্রতি কর্ণপাত করেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পদাধিকারবলে বর্তমানে পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী খান। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে তিনি দায়িত্বরত। পদ্মা ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে শওকত আলী খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যাংকটির তেমন কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই। আমানতের পাশাপাশি মূলধনও শেষ হয়ে গেছে। পদ্মা ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসান দায় ও সম্পদের চেয়েও বেশি হয়ে গেছে। এখন ঋণ আদায় ছাড়া কর্মকর্তাদের তেমন কোনো কাজ নেই। অনেক আগেই ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে ব্যয় কমানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সে ব্যয় প্রত্যাশা অনুযায়ী কমিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। সরকারি সিদ্ধান্তেই আমরা পদ্মা ব্যাংকে বিনিয়োগ করেছিলাম। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারকেই এ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে।’
রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শুরু থেকেই পদ্মা ব্যাংকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত জমা রাখতে বাধ্য করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে সে আমানত আর ফেরত দেয়া সম্ভব হয়নি। এ ব্যাংকটিতে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টেরই আমানত রয়েছে ৮৯৯ কোটি টাকা। এছাড়া ব্যাংকটিতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), জীবন বীমা করপোরেশন, সাধারণ বীমা করপোরেশন, তিতাস গ্যাস, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেড (বিআইএফএফএল), ইসলামিক ফাউন্ডেশন, নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসহ সরকারি আরো বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের আমানতের অর্থ আটকে আছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে পদ্মা ব্যাংকে ৪৩টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের গচ্ছিত আমানতের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। গত আট বছর ধরে নানা উদ্যোগ ও চেষ্টায় এসব সরকারি আমানতের কোনো অর্থই পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি।
পদ্মা ব্যাংককে অবলুপ্ত করা ছাড়া তেমন কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংকও। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে পদ্মা ব্যাংককে কেউ নিতে চাইবে না। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ, লোকসান ও মূলধন ঘাটতি অনেক বেশি। আর খেলাপি হওয়া ঋণের বড় অংশ বেনামি বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে নেয়া হয়েছে। অস্তিত্বহীন কোম্পানিগুলোর প্রকৃত সুবিধাভোগীদের খুঁজেও পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাংকের কর্মীদেরও তেমন কোনো কাজ নেই। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকটিকে অবসায়ন বা অবলুপ্ত করা ছাড়া বিকল্প কোনো কিছু আমাদের হাতে নেই। নির্বাচিত সরকার ও নতুন গভর্নর দায়িত্ব নিয়েছেন। আশা করছি, পদ্মা ব্যাংকের বিষয়ে আমরা একটি সিদ্ধান্তে আসতে পারব।’