এর মধ্যে ছয়টি ট্রিপল মার্ডার ও চারটি ডাবল মার্ডার। ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এ সময়ে মাসে গড়ে প্রায় ৩০০টি করে হত্যা মামলা হয়েছে। এর মধ্যে মার্চ, মে ও জুনে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। সামগ্রিকভাবে চলতি বছর হত্যাকাণ্ডের প্রবণতাও আগের বছরের তুলনায় ঊর্ধ্বমুখী। গত বছরের প্রথম ছয় মাসে সারা দেশে ১ হাজার ৫৮৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সারা দেশে ২৫০টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। মার্চে এক লাফে তা বেড়ে হয় ৩১৭টি। এপ্রিলে ২৮৮ ও মে মাসে ৩১০টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়। জুনে হত্যা মামলা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২৬টিতে। আর সর্বশেষ জুলাইয়ে আরো ২৯৮টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়। ফলে ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে মামলা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭৮৯টি। আর এ সময়ে সারা দেশে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে ১ হাজার ৮০৫টি। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩০০টিরও বেশি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু মামলার সংখ্যা নয়, হত্যাকাণ্ডের ধরন নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, দখলদারত্ব, চাঁদাবাজি, পূর্বশত্রুতা, পারিবারিক বিরোধ, জমিজমা নিয়ে সংঘাত, মাদক ব্যবসা ও অপরাধী চক্রের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
হত্যাকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য অংশ রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল থেকে ঘটছে বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে এখনো জাতীয় ঐক্যের সূচনা ঘটেনি। ফলে অপরাধীরা নানা ধরনের দুষ্কর্ম করার সাহস পাচ্ছে। সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য অংশ রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল থেকে ঘটছে। পাশাপাশি মব সন্ত্রাসে আক্রান্ত হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, এমনকি নারীরাও রেহাই পাচ্ছেন না। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশকে সন্ত্রাসপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। মব সন্ত্রাসীরা শুধু সমাজ ও রাজনীতিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে না, অশালীন ভাষার ব্যবহার ও অসহিষ্ণু আচরণের মাধ্যমে দেশের সংস্কৃতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা জরুরি।’
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হিসাবে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে ঢাকায় সর্বোচ্চ ৪৩৫টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগে হত্যা মামলা হয়েছে ৩৯০টি। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরীতেই ২৭টি মামলা হয়েছে। এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে চাঁদাবাজি, জমি নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক কলহ, মাদক, আধিপত্য বিস্তার, গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব, পূর্বশত্রুতা, কিশোর গ্যাং ও রাজনৈতিক বিরোধের মতো কারণের কথা উঠে এসেছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হওয়ায় অপরাধ বিশ্লেষকদের দৃষ্টিও এখন এ দুই অঞ্চলের দিকে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ছয় মাসে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি হত্যা মামলা হওয়ার তথ্য দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় সতর্কসংকেত। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের উচ্চসংখ্যক হত্যা, রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সন্ত্রাস ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ—সবকিছু মিলিয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। হত্যাকাণ্ড কমাতে শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান নয়, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংঘাত নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মব সন্ত্রাস বন্ধ ও স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধীদের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ করাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এখন পূর্ব-সতর্কতামূলক পুলিশিংয়ের ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সারা দেশেই নানা ধরনের অপরাধ, বিশেষ করে মারামারি, মব তৈরি করে হামলা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার চিত্র আমরা লক্ষ করছি। মূলত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল ফিরে না আসার সুযোগ নিয়েই অপরাধীরা আরো বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। একশ্রেণীর অপরাধী আছে যারা সবসময় অপরাধ করার জন্য বসে থাকে। পুলিশ, কোর্ট ও সংশোধনাগারগুলো যদি সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে তাহলেই এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।’
তবে হত্যাসহ সব ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খুনের ঘটনা বিভিন্ন সামাজিক, পারিবারিক, ব্যক্তিগত, অর্থনৈতিক ও অপরাধমূলক বিরোধের কারণে কমবেশি হয়ে থাকে। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ উদ্ঘাটন করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছে। খুনসহ সব ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধ দমনে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে।’