ইউনিসেফের চিলড্রেন’স ক্লাইমেট রিস্ক রিপোর্ট-২০২৬

তীব্র জলবায়ু ঝুঁকিতে বাংলাদেশের শিশুরা

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশের শিশুরা। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ, খরা ও বায়ুদূষণের মতো দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের।

জলবায়ু পরিবর্তনের অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে আছে যেসব দেশের শিশুরা, তাদের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। জাতিসংঘের শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য। বাংলাদেশ ছাড়াও উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মধ্যে আছে ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও মিয়ানমার।

সম্প্রতি ইউনিসেফ প্রকাশিত ‘চিলড্রেন’স ক্লাইমেট রিস্ক রিপোর্ট ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নদীপ্লাবিত ও সমুদ্র-উপকূলবর্তী বন্যা, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ, খরা, বায়ুদূষণ—জলবায়ু পরিবর্তনজনিত এসব বহুমাত্রিক ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশের শিশুরা।

নদীতীরবর্তী বন্যায় বিশ্বে বাংলাদেশের শিশুদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এক্ষেত্রে ইউনিসেফের ঝুঁকির স্কোর দশে বাংলাদেশের স্কোর দশ। দেশের ৫০ শতাংশের বেশি শিশু এমন এলাকায় বসবাস করে, যেখানে নদীপ্লাবিত বন্যার আশঙ্কা প্রবল। ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি, নিরাপদ পানি ও সুরক্ষাসহ শিশুদের মৌলিক অধিকার হুমকির মুখে পড়ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ১৮০ কোটি শিশু খরা এবং ১২০ কোটির বেশি শিশু চরম তাপপ্রবাহের ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া ৬৬ কোটি ২০ লাখ শিশু গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়, ৩৩ কোটি ৭০ লাখ শিশু নদীপ্লাবিত বন্যা এবং ৩ কোটি ৩০ লাখ শিশু উপকূলীয় বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। এ শিশুদের প্রায় ৮০ শতাংশ মাত্র ১০টি দেশে বাস করে, যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।

বাংলাদেশে প্রায় ছয় কোটি শিশু অন্তত একটি জলবায়ুজনিত ঝুঁকিতে রয়েছে। বন্যা, খরা ও ঘূর্ণিঝড়—এ তিনটি দুর্যোগের সম্মিলিত প্রভাবে দেশের ২ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি শিশু সরাসরি উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছে ইউনিসেফ। সবচেয়ে বেশিসংখ্যক, ছয় কোটি শিশু খরা ও বায়ুদূষণের ঝুঁকিতে রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকিতে রয়েছে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ শিশু। একইভাবে নদীসংলগ্ন বন্যার কারণে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ শিশু সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে।

ইউনিসেফ তাদের প্রতিবেদনে জলবায়ু ঝুঁকির মুখোমুখি ১৬০টি দেশের শিশুদের জন্য ঝুঁকি স্কোর দিয়েছে। দেখা গেছে, সামগ্রিক ঝুঁকিপ্রবণতায় বাংলাদেশের স্কোর ১০-এ ৯ দশমিক ৩৮, যা বিশ্বের মধ্যে চতুর্থ সর্বোচ্চ। এ তালিকায় বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে যুদ্ধকবলিত মিয়ানমার, দেশটির স্কোর ১০-এ ১০। এছাড়া পাকিস্তানের স্কোর ৯ দশমিক ৪৯ এবং ভিয়েতনামের ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ। অন্যদিকে ভারতের স্কোর ৯ দশমিক ২১, কম্বোডিয়ার ৮ দশমিক ৮৮, চীনের ৮ দশমিক ২৪।

আবার ভিন্ন দুর্যোগের ক্ষেত্রে নদীপ্লাবিত বন্যায় সবচেয়ে ঝুঁকিতে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে স্কোর ১০-এ ১০। এছাড়া উপকূলীয় বন্যায় ৮ দশমিক ১৩, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ে স্কোর ৯ দশমিক ৭, খরায় ৯ দশমিক ৬৫, চরম তাপপ্রবাহে ৯ দশমিক ২৪, বায়ুদূষণে ৯ দশমিক ৭। তবে শিশুদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, দরিদ্রতা ও মাতৃমৃত্যু হারে বাংলাদেশের শিশুরা তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সম্পর্কে ইউনিসেফ বলছে, বাংলাদেশের মতো বেশিসংখ্যক শিশু থাকা দেশগুলোয় একই সঙ্গে একাধিক জলবায়ু ঝুঁকির মুখে থাকা শিশুর সংখ্যা অনেক বেশি। ফলে দেশের শিশুদের জন্য ঝুঁকির মাত্রা শুধু একটি দুর্যোগ নয়, বরং একাধিক দুর্যোগের সম্মিলিত প্রভাব। কারণ একটি দুর্যোগ শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি দুর্যোগ আঘাত হানে। শিশুরা একই সঙ্গে বন্যা, তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, বায়ুদূষণ এবং অন্যান্য জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মুখে পড়ে। এ ধরনের বহুমাত্রিক ঝুঁকি তাদের জীবন ও ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে।

বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নাইজেরিয়া ও পাকিস্তানের মতো বড় জনসংখ্যার দেশগুলোতে শতাংশের হিসাবে ঝুঁকি মাঝারি মনে হলেও বাস্তবে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা অনেক বেশি। তাই এসব দেশকে জলবায়ু ঝুঁকির ‘হাই-ইমপ্যাক্ট জোন’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে নদীপ্লাবিত বন্যার ঝুঁকির বড় অংশ মাত্র কয়েকটি দেশে কেন্দ্রীভূত, যার মধ্যে বাংলাদেশই প্রধান। একইভাবে তীব্র তাপপ্রবাহের ঝুঁকিতে আছে দেশের বিপুলসংখ্যক শিশু।

বাংলাদেশের মতো জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোতে শিশুদের জাতীয় পরিকল্পনার অংশ করতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বাংলাদেশে এখন জলবায়ু অভিযোজনের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে শিশুদের। কারণ বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ ও বায়ুদূষণের মতো একাধিক ঝুঁকি একসঙ্গে শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পুষ্টিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, শিশুবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, নিরাপদ পানি, সামাজিক সুরক্ষা এবং জলবায়ু অর্থায়নে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।

শিশুদের অধিকার রক্ষা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করে আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন। সংস্থাটির বাংলাদেশের সিনিয়র ম্যানেজার (হিউম্যানিটারিয়ান) সায়মন রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে যেকোনো জলবায়ুজনিত ঝুঁকি বা দুর্যোগ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে শিশু, বয়স্ক মানুষ ও প্রতিবন্ধীরা। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই তাদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান থাকে না, প্রস্তুতির অভাব বা শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকে। যদি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কথা বলি, তাহলে সেটা শিশুরা।’

শিশুদের ঝুঁকির দিকগুলো সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘দুর্যোগ শিশুদের জীবনে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে। প্রথমত, স্বাস্থ্যগত দিক থেকে তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার তাদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটে। পড়াশোনা বন্ধ করে ছেলে শিশুদের শিশুশ্রম বা মেয়ে শিশুদের অল্প বয়সে বিয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটে। আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থানকালে শিশুরা নানা ধরনের শোষণ ও নির্যাতনের ঝুঁকিতে থাকে। বিশেষ করে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় এ ধরনের চিত্র আমরা প্রায়ই দেখি।’

এমন পরিস্থিতি থেকে শিশুদের সুরক্ষার জন্য তাদেরকে পরিকল্পনার অংশ করা উচিত বলে মনে করেন সায়মন রহমান। সরকার ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমান শিক্ষাক্রমে জলবায়ুজনিত ঝুঁকির বিভিন্ন বিষয় আরো বিশদভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

ইউনিসেফ প্রতিবেদনে বলছে, শিশুদের সুরক্ষায় এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া জরুরি। এজন্য জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় শিশুদের অগ্রাধিকার দিতে হবে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপদ পানি ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে জলবায়ু-সহনশীল করতে হবে। বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে দুর্যোগ প্রস্তুতি ও জলবায়ু অর্থায়নে শিশুদের প্রয়োজনকে। পাশাপাশি জলবায়ু নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে শিশু ও তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করারও আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী হলেও বাংলাদেশের শিশুরাই এর জন্য বেশি মূল্য দিচ্ছে। কার্যকর অভিযোজন, দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং শিশুকেন্দ্রিক বিনিয়োগ দ্রুত জোরদার না হলে আগামী বছরগুলোতে এ ঝুঁকি আরো বাড়বে।

এক্ষেত্রে অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা করার কথা বলছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক মো. মনিরুজ্জামান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে জলবায়ুজনিত দুর্যোগ আর শিশুর সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে ঝুঁকিতে থাকে অনেক এলাকা। বিশেষ করে হাওর, উপকূল, পার্বত্য ও নদীভাঙন অঞ্চল। এ চারটি জোনে শিশুরা দুর্যোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আমাদেরকে শিশুদের কেন্দ্র করে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। যেমন পাহাড়ে আবাসিক স্কুল, হাওরে ভাসমান স্কুল, উপকূলে পর্যাপ্ত আশ্রয় কেন্দ্র তৈরি করা যেতে পারে। এতে একই সঙ্গে তারা দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাবে এবং তাদের পড়াশোনা বাধাগ্রস্ত হবে না। আবার নগরায়ণের ফলে ঢাকার মতো শহরে তীব্র তাপপ্রবাহ, খরার মতো দুর্যোগের সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে এখানে শিশুদের সুরক্ষা আছে এমন স্কুলের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পুরো দেশে একই ধরনের পরিকল্পনা করলে হবে না, অঞ্চলভেদে পরিকল্পনা নিতে হবে।’

প্রতিবেদনে ইউনিসেফ বিভিন্ন দেশের সরকার ও উন্নয়ন অংশীদারদের জন্য তিনটি সুপারিশ করেছে। গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমাতে দ্রুত ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী পদক্ষেপ নিতে হবে, জলবায়ু অভিযোজনের মাধ্যমে শিশুদের সুরক্ষা জোরদার করতে হবে এবং শিশু ও তরুণদের জলবায়ু কর্মকাণ্ডে অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

নারী ও শিশুদের ওপর জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব ধাপে ধাপে কমিয়ে আনতে সরকারের নানা পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক) ড. মো. সাইমুম পারভেজ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য শিশু ও বয়স্ক জনগোষ্ঠীকে পরিবেশজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেয়া। বিশেষ করে নারী ও শিশুকে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করছি। তাই শিশুদের ওপর পরিবেশের বিরূপ প্রভাব কমিয়ে আনার জন্য আমাদের বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে। আমাদের লক্ষ্য দূষণ কমিয়ে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা।’

ড. মো. সাইমুম পারভেজ আরো বলেন, ‘পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলা বিএনপি সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকারের একটি। এটি শুধু পরিবেশগত ইস্যু নয়, আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কৌশলেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাধারণত অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশকে আলাদা একটি উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। কিন্তু আমরা পরিবেশকে উন্নয়ন কৌশলের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখছি।’

আরও