রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের রাজবাড়ী পৌরসভা অংশের উভয় পাশে ড্রেন নির্মাণের কাজ বন্ধ রয়েছে প্রায় দেড় বছর। আবার যতটুকু ড্রেনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে, সেই অংশটুকুর সঙ্গে খাল বা বিলের সংযোগ দেয়া হয়নি। এ প্রকল্পের মেয়াদ পাঁচবার বাড়িয়ে সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ৩০ শতাংশ কাজ। অথচ এরই মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তুলে নিয়েছে ৪৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা প্রকল্প ব্যয়ের ৭৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
এদিকে অসমাপ্ত এ ড্রেনের নানা অংশে বের হয়ে আছে রড। ভোগান্তির শিকার হচ্ছে সড়কের দুই পাশের কয়েকশ ব্যবসায়ী ও পথচারীকে। অসম্পূর্ণ খোলা ড্রেন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নির্মাণাধীন ড্রেনের ওপর দিয়ে বাঁশ-কাঠের মাচার মাধ্যমে সড়কের পাশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের পথ তৈরি করা হয়েছে। এ মাচার ওপর ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে ক্রেতা-বিক্রেতাকে। দীর্ঘ দেড় বছর নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে স্থানীয়রা। তাদের দাবি, এ প্রকল্পকাজ দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণেই পাঁচ দফা মেয়াদ বাড়ানোর পরও নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৭৭ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থ তুলে নিয়ে চলে গেছে।
রাজবাড়ী সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মহাসড়ক যথাযথ মানে উন্নত ও প্রশস্তকরণ প্রকল্পের (গোপালগঞ্জ অঞ্চল) আওতায় ২০১৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর এ প্রকল্পের কার্যাদেশ দেয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৬ জুন কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। সড়কের উত্তর পাশে চার কিলোমিটার ও দক্ষিণে পৌনে পাঁচ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণকাজ যৌথভাবে দায়িত্ব পায় স্পেকটা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড ও ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন এবং ওয়েস্টার কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড শিপিং ও রানা বিল্ডার্স। সড়কসহ পুরো কাজের ব্যয় ধরা হয় ৬০ কোটি ২০ লাখ টাকা। তবে মেয়াদ পাঁচবার বাড়ানোর পর সড়কের কাজ সম্পন্ন হলেও ড্রেনের কাজ বাকি রয়েছে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মূল টাকার ৪৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা বিল উত্তোলন করে নিয়েছে।
সরজমিন দেখা যায়, রাজবাড়ী শহরের ফায়ার সার্ভিস স্টেশন এলাকা থেকে আহম্মদ আলী মৃধা কলেজ পর্যন্ত ড্রেনের কাজ বন্ধ রয়েছে। মাঝেমধ্যে কিছু স্থানে ড্রেনের কাজ হলেও দেয়া হয়নি ঢাকনা বা স্লাব। বের হয়ে আছে রড। আবার অনেক অংশে এখনো মাটি খোঁড়াই হয়নি। ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় চলাচলের জন্য বাঁশ-কাঠ দিয়ে মাচা তৈরি করা হয়েছে। দেড় বছর ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্ট কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমনকি প্রকল্প এলাকায় তাদের কোনো নির্মাণসামগ্রীও দেখা যায়নি।
জেলা শহরের ভবানীপুরের বাসিন্দা হাসান হাবিব বলেন, ‘দীর্ঘ সময় কাজটি চললেও এখনো পুরোপুরি সম্পন্ন করা হয়নি। ড্রেনের মুখ মাঝেমধ্যে বন্ধ। কোথাও ড্রেনের ওপর স্লাব দেয়া হয়নি। আবার কোথাও একেবারেই কাজ করা হয়নি। কর্তৃপক্ষের সঠিক তদারকি ও গাফিলতির কারণে এমন হয়েছে। ড্রেনের ওপর খোলা ও রড বেরিয়ে থাকায় মাঝেমধ্যেই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে।’
রাজবাড়ীর পুলিশ লাইনস এলাকার বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, ‘ড্রেনের কাজ বন্ধ থাকায় বাড়িতে আসা-যাওয়ায় সমস্যা হচ্ছে। তাছাড়া ড্রেন খোলা থাকায় ময়লা-আবর্জনায় ভরে যাচ্ছে। ফলে ড্রেন নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। উন্মুক্ত ড্রেনের কারণে দুর্ঘটনার শঙ্কা রয়েছে।’
ব্যবসায়ী মজিবর রহমান বলেন, ‘মাচা ভেঙে কয়েকবার কর্মচারীরা নিচে পড়ে আহত হয়েছেন। সড়কের দুই পাশে ড্রেন নির্মাণের কথা থাকলেও এক পাশে এখনো কাজই শুরু হয়নি। এছাড়া সারা দেশের মতো রাজবাড়ীতেও বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী। ড্রেনে পানি ও ময়লা জমে মশামাছি জন্ম নিচ্ছে। অসম্পূর্ণ ড্রেন থেকে রোগ-জীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে। তাই দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাচ্ছি।’
যৌথভাবে ড্রেন নির্মাণকাজ করা চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সবই জেলার বাইরের। এর মধ্যে স্পেকটা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড ও ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন ফরিদপুরের প্রতিষ্ঠান। এছাড়া ওয়েস্টার কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড শিপিং ও রানা বিল্ডার্স ময়মনসিংহের প্রতিষ্ঠান। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার বা তাদের কোনো প্রতিনিধির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাজবাড়ী সওজ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নওয়াজিস রহমান বিশ্বাস বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ে ও সঠিক নিয়মে কাজ শেষ না করায় ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৩ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এখনো ওই প্রকল্পের কাজ ৭০ শতাংশ বাকি। ওই কাজের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। নতুন করে একটি প্রকল্প নিয়ে কাজ সম্পন্ন করার ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো হয়েছে, যা প্রক্রিয়াধীন।’