ইরানি রাষ্ট্রদূতের প্রেস ব্রিফিং

হরমুজে বাংলাদেশী জাহাজ চলাচলে ইরানের দুটি শর্ত

বাংলাদেশের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি জানান, বাংলাদেশের মানুষ ইরানের মুসলিম ভাই ও বোন। পারস্য উপসাগরে কিংবা আরব ও মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে ইরান যুদ্ধ চায় না।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশী জাহাজ চলাচলে দুটি শর্তের কথা জানিয়েছে ইরান। শর্ত দুটি হলো জাহাজ চলাচলের বিষয়ে ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করা এবং দেশটির নির্ধারিত নিরাপদ নৌপথ ব্যবহার করা। এ দুটি শর্ত মেনে চললে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া জাহাজ চলাচলে কোনো সমস্যা হবে না বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত ডা. জলিল রহিমি জাহানাবাদি।

গতকাল ঢাকায় ইরান দূতাবাসে মধ্যপ্রাচ্যের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু ও জাহাজ চলাচলের বিষয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘এ নিয়ে ইরান, ওমান ও কাতারের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত প্রণালিটিতে স্বাভাবিক চলাচল সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দেয়া প্রস্তাবে অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের ওপর পুনরায় হামলা না করার অঙ্গীকারের শর্তে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।’

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং প্রণালি বন্ধ থাকলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য ইরান কী করতে পারে—এমন প্রশ্নে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘পারস্য উপসাগরে যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো দেশের জন্যই কিছু নিশ্চিত করা কঠিন। তবে বাংলাদেশ থেকে আসা জাহাজগুলো ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ধারিত নিরাপদ নৌপথ ব্যবহার করলে চলাচলে সমস্যা হবে না। বর্তমানে যেসব জাহাজ আক্রান্ত হচ্ছে, সেগুলো ইরানের নির্ধারিত নৌপথের বাইরে দিয়ে চলাচল করছে।’

বাংলাদেশের কোনো জ্বালানিবাহী জাহাজ এ পর্যন্ত ইরানের নির্ধারিত পথ ব্যবহার করেছে কিনা জানতে চাইলে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও ইরান—দুই দেশের সরকারের কাছেই তথ্য রয়েছে।’

বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়ে রাষ্ট্রদূত জানান, জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে ভালো বৈঠক হয়েছে। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়েও বৈঠক হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে তার নিজের বৈঠকের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

রাষ্ট্রদূতের মূল্যায়ন, বাংলাদেশের সরকার ইরানকে বস্তুগত ও রাজনৈতিক সমর্থন দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও আরব দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং নতুন সরকারের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ঢাকার কূটনৈতিক অবস্থানকে বিচক্ষণ ও গ্রহণযোগ্য মনে করে তেহরান। তবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ইরানের প্রতি ভ্রাতৃত্ববোধ ও সমর্থন সরকারের তুলনায় বেশি বলে মনে করেন তিনি। এ মূল্যায়নের পক্ষে কোনো জরিপ বা পরিসংখ্যান তুলে ধরেননি রাষ্ট্রদূত।

বাংলাদেশের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি জানান, বাংলাদেশের মানুষ ইরানের মুসলিম ভাই ও বোন। পারস্য উপসাগরে কিংবা আরব ও মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে ইরান যুদ্ধ চায় না। আরব দেশগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি না থাকলে সেসব দেশে ইরান হামলা চালাত না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। মক্কা, মদিনা ও বায়তুল মুকাদ্দাসকে ইরানের ‘রেড লাইন’ হিসেবে উল্লেখ করে পবিত্র স্থানগুলোর অবমাননা না করার অবস্থান জানান রাষ্ট্রদূত।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা করছে ইরান। যেকোনো মুহূর্তে দেশ দুটির হামলার শিকার হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে তেহরান। এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা হালনাগাদ, নতুন লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ এবং নতুন ড্রোন উৎপাদনের কথা জানিয়েছেন রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, ‘ইরান যুদ্ধ চায় না, তবে আত্মরক্ষার জন্য নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে রাষ্ট্রদূত জানান, অতীতে ইরান দেশটির সঙ্গে একাধিকবার আলোচনায় বসেছে এবং পরমাণু চুক্তিতেও পৌঁছেছিল। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় আলোচনার ওপর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধের সময়ও আলোচনা চলার মধ্যেই ইরানের ওপর হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তবু মধ্যস্থতাকারীদের সহায়তায় কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান। তবে তার পূর্বাভাস, যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে এবং আলোচনার ফল খুব একটা আশাব্যঞ্জক নাও হতে পারে।

আরও