মাঠ নেই, শিক্ষক সংকট, স্যাঁতসেঁতে কক্ষে পাঠদান

সন্তানকে রাজধানীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠাতে আগ্রহ হারাচ্ছেন অভিভাবকরা

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সূত্রাপুরের ৩৯টি, মিরপুরের ২১ ও গুলশানের ১৮টি বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন ১০ জনেরও কম। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংখ্যা এতটাই কম যে অল্প কয়েকজন শিক্ষককেই একাধিক শ্রেণীর পাঠদানের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে।

রাজধানীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর বেশির ভাগেরই নেই খেলার মাঠ। কোথাও শিক্ষক সংকট ও শ্রেণীকক্ষের স্বল্পতা, কোথাও আবার স্যাঁতসেঁতে ভবনেই চলছে পাঠদান। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত টয়লেট, নিরাপদ পানি ও সূর্যের আলো প্রবেশের সুযোগও সীমিত। ফলে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত পাঠদানের পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক বিকাশের প্রয়োজনীয় পরিবেশ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। এসব কারণে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সন্তানকে পাঠানোর বিষয়ে আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেক অভিভাবক। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার একাধিক বিদ্যালয় ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, রাজধানীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৩৪২টি। এর মধ্যে মাত্র ৯০টি বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ রয়েছে। সে হিসাবে ২৫২টি বিদ্যালয়, অর্থাৎ প্রায় ৭৩ দশমিক ৭ শতাংশ বিদ্যালয়েই মাঠ নেই। জায়গাস্বল্পতা, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ভবনসহ অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হয়নি।

অবকাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি শিক্ষকস্বল্পতাও রাজধানীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর বড় সমস্যা। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সূত্রাপুরের ৩৯টি, মিরপুরের ২১ ও গুলশানের ১৮টি বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন ১০ জনেরও কম। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংখ্যা এতটাই কম যে অল্প কয়েকজন শিক্ষককেই একাধিক শ্রেণীর পাঠদানের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সন্তানকে ভর্তি করানোর পরিকল্পনা থাকলেও পরিবেশ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন বেসরকারি চাকরিজীবী আতিয়া সুলতানা। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাসার কাছে সরকারি বিদ্যালয় থাকলেও এর পরিবেশ উপযুক্ত মনে হয়নি। সেখানে মাঠ ছিল না। সন্তানের পর্যাপ্ত বিকাশের জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ।’ অভিভাবক অর্ণব মাহমুদও সন্তানকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেয়ার বিষয়ে আগ্রহী নন। তিনি বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও পরিবেশগত সুযোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচন করতে চাই।’

তবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে অভিভাবকদের নেতিবাচক ধারণার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খায়রুন নাহার লিপি। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনেক অবস্থাসম্পন্ন অভিভাবক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করেন। এ কারণে তারা সন্তানদের কিন্ডারগার্টেন বা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে দিতে আগ্রহী। অথচ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়াশোনা ও ফলাফলও ভালো।’

শিক্ষক সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কিছু বিদ্যালয়ে সংকট রয়েছে। কোনো কোনো শিক্ষক দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকেন কিংবা চাকরিরত অবস্থায় অন্য শহর বা বিদেশে পাড়ি জমান। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য কার্যকর প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ প্রয়োজন।’

আজিমপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র মো. তুহিনের পিতা মো. রিপন বলেন, ‘আমার সামর্থ্য নেই বলে ছেলেকে ভালো কোনো বেসরকারি স্কুলে পড়াতে পারি না। সবাই বলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়াশোনার মান খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কারো যদি পড়াশোনায় ভালো করার ইচ্ছা থাকে, তাহলে সে যেকোনো স্কুল থেকে ভালো করতে পারবে।’

রাজধানীর পলাশী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে দেখা যায়, সেখানে কোনো খেলার মাঠ নেই। আশপাশে উঁচু ভবন থাকায় বিদ্যালয়টিতে পর্যাপ্ত সূর্যের আলোও প্রবেশ করতে পারে না। ফলে ভবনের ভেতরে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

রাজধানীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকটের চিত্রও উদ্বেগজনক। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র একজন এবং আ. মান্নান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রয়েছেন পাঁচজন। মিরপুরের নয়ানগর রফিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩০৬ শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন ছয়জন। সে হিসাবে প্রত্যেক শিক্ষকের বিপরীতে গড়ে ৫১ শিক্ষার্থী। অথচ জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ প্রাথমিক স্তরে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৩০-এ নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।

শিক্ষকস্বল্পতার কারণে পাঠদানের পাশাপাশি প্রশাসনিক ও পরীক্ষাসংক্রান্ত দায়িত্বও অল্পসংখ্যক শিক্ষককে সামলাতে হচ্ছে। এতে প্রতিটি শ্রেণীতে পর্যাপ্ত সময় দেয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে খেলার মাঠ ও অন্যান্য অবকাঠামোর ঘাটতি যুক্ত হয়ে শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা ও সামগ্রিক বিকাশের সুযোগ আরো সীমিত হয়ে পড়ছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকা মহানগরীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর সংকট দীর্ঘদিনের। মাঠ না থাকায় শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শুধু শ্রেণীকক্ষের পাঠদান দিয়ে শিশুর পূর্ণাঙ্গ বিকাশ সম্ভব নয়। শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চাও প্রয়োজন।’

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এমন দশায় নিম্ন আয়ের ও শ্রমজীবী পরিবারের শিশুরা এ সংকটে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিদ্যালয়ের বাইরে নিরাপদ খেলাধুলার জায়গা না থাকলে তাদের সুস্থ বিনোদন ও বিকাশের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাঠ্যক্রমে খেলাধুলা অন্তর্ভুক্ত করাই যথেষ্ট নয়; এর বাস্তব চর্চার সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে। যেসব বিদ্যালয়ে নিজস্ব মাঠ নেই, সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছাকাছি সরকারি মাঠ বা উন্মুক্ত জায়গা ব্যবহারের সুযোগ দেয়া যেতে পারে। এজন্য স্থানীয় শিক্ষা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয় প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নতুন করে বিদ্যালয়ের জন্য জমি পাওয়া কঠিন। তাই বিদ্যমান বিদ্যালয়ের জায়গা সংরক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সংস্কার, শিক্ষক সংকট নিরসন ও মাঠবিহীন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিকল্প খেলাধুলার ব্যবস্থা করা জরুরি। এসব সংকটের সমাধান না হলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়ন ও অভিভাবকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।

সরকারের শিক্ষা খাতের বিনিয়োগও অবহেলার শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. মোস্তাফিজুর রহমান শাহিন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সচেতন অভিভাবকরা সন্তানের পড়াশোনার পাশাপাশি সার্বিক বিকাশের জন্য খেলার মাঠ, সুন্দর পরিবেশ, মানসম্মত ভবন ও আধুনিক শিক্ষাপ্রযুক্তির সুবিধা চান। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ঢাকা শহরের অনেক বিদ্যালয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এসব সুবিধা দিতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি।’

আরও